সিন্ডিকেটের আগুন বনাম লাখো মায়ের ভরসা: আদ্-দ্বীনকে স্তব্ধ করার এই জেদ কেন?
-তারিকুল ইসলাম মুকুল
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সকালের সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয়ে যায় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। প্রতিদিন ভোর না হতেই দেশের নানা প্রান্ত—টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, প্রত্যন্ত গ্রাম কিংবা মফস্বল শহর থেকে অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটে আসেন শত শত উদ্বিগ্ন অভিভাবক। সকাল গড়ালেই যেখানে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। এটি কোনো কৃত্রিম ভিড় নয়; এটি আসলে এ দেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি আর একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের জীবন্ত প্রতিফলন। বাংলাদেশে সুচিকিৎসা যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য এক মস্ত বড় বৈষম্যের ক্ষেত্র, সেখানে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল গত কয়েক দশক ধরে লাখো বাবা-মায়ের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু নামেই নয়, কাজেও বিশেষ করে শিশু রোগের চিকিৎসায় এই হাসপাতালটি বহুদিন ধরেই অনন্য এবং অনবদ্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে এই ৭০০ বেডের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার বা এর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার এক ধরণের অপচেষ্টা চলছে, তা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য এক অশনিসংকেত।
একটি হাসপাতাল কীভাবে বাণিজ্যকে একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল মানুষের সেবাকেই পরম ব্রত করে তুলতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ আদ্-দ্বীন। এই শহরের বুকে পাঁচ তারকা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চোখ ধাঁধানো আলো আর আকাশচুম্বী বিলের কাউন্টার যখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এক আতঙ্কের নাম, ঠিক তখনই ডা. শেখ মহিউদ্দিনের নিরলস পরিশ্রমে ও দূরদর্শী নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সাধারণ মানুষের জন্য পরম স্বস্তি এনে দিয়েছে। এখানে আসা রোগীরা কেবল কম খরচে চিকিৎসাই পান না, বরং পান মানবিক মর্যাদা। ডা. শেখ মহিউদ্দিন নিজে একজন অত্যন্ত নিপাট, সজ্জন এবং প্রচারবিমুখ মানুষ, যিনি কোনো ধরনের সস্তা রাজনীতি বা ক্ষমতার লোভের সাথে কখনো নিজেকে জড়াননি। তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে টাকার অভাবে কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয়। যাদের সামর্থ্য একেবারে নেই, তাদের নিজ তহবিল থেকে আরও বড় অংকের আর্থিক সাহায্য দিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তিনি। এই নিভৃতচারী সমাজসেবকের তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটিকে দমাতে যখন চারপাশ থেকে নানামুখী তৎপরতা দেখা যায়, তখন প্রশ্ন জাগে—জনস্বার্থ রক্ষা নাকি অন্য কোনো অদৃশ্য মহলের বাণিজ্যিক স্বার্থ চরিতার্থ করাই এর মূল উদ্দেশ্য?
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মূল শক্তি লুকিয়ে আছে এর চিকিৎসার মান এবং সেবার আন্তরিকতায়। এখানকার দক্ষ চিকিৎসক আর বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত নার্সদের মমতাময়ী সেবা প্রতিটি অসুস্থ শিশুর পরিবারকে এক মানসিক শক্তি জোগায়। একজন মা যখন তার মুমূর্ষু সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের চৌকাঠে পা রাখেন, তখন চিকিৎসকদের একটুখানি সান্ত্বনা আর নার্সদের যত্নশীল হাতই তার অর্ধেক রোগ নিরাময় করে দেয়। আদ্-দ্বীন সেই পরিবেশটি তৈরি করতে পেরেছে। শিশুরোগের সাধারণ সর্দি-কাশি বা পেটের অসুখের নিরাময় থেকে শুরু করে নবজাতকদের অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল আইসিইউ কিংবা এনআইসিইউ (NICU) সেবা—সবকিছুই এখানে মিলছে এক ছাদের নিচে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে এখানকার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা ২৪ ঘণ্টাই সমান পারদর্শী। এই রোগী বান্ধব পরিবেশ, নির্ভুল রোগ নির্ণয় আর সেবার মানসিকতাই আদ্-দ্বীনকে দেশের স্বাস্থ্য মানচিত্রে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতায় আমাদের একটি বিষয় অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় অনুধাবন করতে হবে—হাসপাতাল কোনো অলৌকিক স্থান নয়, এটি মানুষের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার জায়গা। অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু অবস্থায় যেসব শিশুকে এনআইসিইউ বা আইসিইউ-তে আনা হয়, চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও অনেক সময় তাদের বাঁচানো সম্ভব হয় না। যেকোনো প্রাণহানিই চরম বেদনার এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পর বিন্দুমাত্র অহংকার বা এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখায়নি। মালিক হিসেবে ডা. শেখ মহিউদ্দিন নিজে ভুলত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং তাদের বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। এমনকি ভেতরের বা বাইরের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা বিশৃঙ্খল আচরণের দায়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেখানে মালিকপক্ষ নিজেদের সর্বোচ্চ সংশোধনের মানসিকতা দেখাচ্ছেন, সেখানে অন্য সব হাসপাতালের স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে আড়াল করে কেবল আদ্-দ্বীনের বেলাতেই কেন এত কঠোর ও ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তোড়জোড় করা হচ্ছে?
ভেবে দেখা দরকার, আদ্-দ্বীনের মতো একটি ৭০০ বেডের সুখ্যাতিসম্পন্ন হাসপাতাল যদি সাময়িকভাবেও শাটডাউন বা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে কার লাভ হবে? এই শহরে এবং দেশে এমনিতেই ডাক্তারের মারাত্মক সংকট, তার ওপর সুচিকিৎসার জন্য মানসম্মত হাসপাতালের বড্ড অভাব। এই চরম বাস্তবতায় আদ্-দ্বীন বন্ধ হলে প্রতিদিন যে হাজার হাজার অসহায় মা ও শিশু চিকিৎসার জন্য মগবাজারে এসে ফিরে যাবে, তাদের দায়িত্ব কে নেবে? সরকারি হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যেই ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে ধুঁকছে, সেখানে মেঝেতেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আদ্-দ্বীনের এই বিশাল রোগীর চাপ সরকারি হাসপাতালগুলো কোনোভাবেই সামাল দিতে পারবে না। ফলে চিকিৎসা সংকট আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে আরও কত শত শিশুর প্রাণহানি ঘটবে, সেই দায় কি নীতিনির্ধারকেরা নেবেন?
প্রকৃতপক্ষে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের কোনো বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কারণ এর মূল ভিত্তিই হলো গরিব ও মধ্যবিত্তের কল্যাণ। আর এই সাশ্রয়ী কিন্তু বিশ্বমানের সেবাই হয়তো কোনো কোনো অতি-মুনাফালোভী কর্পোরেট মহলের একচেটিয়া ব্যবসার পথে মস্ত বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেইসব স্বার্থান্বেষী গ্রুপগুলো যে এই দুঃখজনক ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ডা. শেখ মহিউদ্দিনের মতো একজন সজ্জন মানুষকে সমাজসেবা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে এবং আদ্-দ্বীনের এই বিশাল সাম্রাজ্যকে ধূলিসাৎ করতে পারলে প্রকারান্তরে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার পথই সুগম হবে।
একটি অনন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বছরের পর বছর মেধা, শ্রম, চোখের জল আর সততার প্রয়োজন হয়; কিন্তু প্রশাসনের একটি কলমের খোঁচায় তা ধ্বংস করে দেওয়া যায়। আদ্-দ্বীন বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না, এটি হবে একটি আত্মঘাতী ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত। দেশের সংবাদপত্র ও সচেতন নাগরিক সমাজের আজ সময় এসেছে এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত কোনো অদৃশ্য মহলের ইশারায় পুতুল না সেজে, বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে তার ত্রুটিগুলো পরিমার্জন ও সংস্কার করার সুযোগ দিয়ে, কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখে পুনরায় পূর্ণ শক্তিতে সচল রাখা হোক। লাখো বাবা-মায়ের চোখের জল আর আস্থার শেষ আশ্রয়স্থলটিকে বাঁচিয়ে রাখাই হোক এই মুহূর্তের একমাত্র সময়োপযোগী ও মানবিক সিদ্ধান্ত। কারণ আদ্-দ্বীন বাঁচলেই বাঁচবে এ দেশের হাজারো অসহায় শিশুর প্রাণ।
[তারিকুল ইসলাম মুকুল, বিশিষ্ট কলামিস্ট, চিন্তক ও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ]
