রোববার,

০৭ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৩ ১৪৩৩

XFilesBd

কলকাঠি নাড়ছেন কে?

গরিবের হাসপাতালে মরণকামড়!! আদ্-দ্বীন ধ্বংসের চক্রান্তে কার লাভ, কার ক্ষতি?

ড. অখিল পোদ্দার

প্রকাশিত: ০১:৫৫, ৭ জুন ২০২৬

আপডেট: ০২:০৯, ৭ জুন ২০২৬

গরিবের হাসপাতালে মরণকামড়!! আদ্-দ্বীন ধ্বংসের চক্রান্তে কার লাভ, কার ক্ষতি?

গরিবের হাসপাতালে মরণকামড়! আদ্-দ্বীন ধ্বংসের চক্রান্তে কার লাভ, কার ক্ষতি?

    - ড. অখিল পোদ্দার 

 

একটি উন্নয়নশীল দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় যখন কোনো হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর শুধু রোগীর শারীরিক সুস্থতাই নির্ভর করে না, বরং জড়িয়ে থাকে লাখো মানুষের বেঁচে থাকার ভরসা। বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য বাস্তবতায় সুচিকিৎসা পাওয়া যেখানে এক মস্ত বড় ভাগ্য আর মানসম্মত হাসপাতালের যেখানে বড্ড অভাব, সেখানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো ৭০০ বেডের একটি সুখ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঝড় বইছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। বিশেষ করে, সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এবং তার পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে পুরো হাসপাতালটিকেই 'শাটডাউন' বা বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক সমাধান হতে পারে না। যেকোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক, আর শিশুর অকাল প্রয়াণ তো আরও বেশি পীড়াদায়ক। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জেরে দেশের অন্যতম বৃহৎ সেবামূলক একটি হাসপাতালকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি আসলেই দেশের চিকিৎসা সংকটের সমাধান করবে, নাকি সাধারণ মানুষকে এক চরম অনিশ্চয়তা বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে, তা আজ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা প্রয়োজন।

এই সংকটের মাঝেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে কর্মরত ঝাড়ুদার বা ক্লিনারদের দ্বারা সাংবাদিকদের ওপর হামলার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সত্য প্রকাশের স্বার্থে সাংবাদিকদের ভূমিকা অনন্য, তাই তাদের ওপর যেকোনো ধরণের চড়াও হওয়া অত্যন্ত অপরাধমূলক কাজ। কিন্তু এই ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকাটি লক্ষ্য করা অত্যন্ত জরুরি। আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ এই বিশৃঙ্খল আচরণকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেয়নি। ঘটনার পরপরই তারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং অপরাধী ক্লিনারদের চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে। পাশাপাশি, অন্যান্য স্টাফদের কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে যেন ভবিষ্যতে ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা আর না ঘটে। এখন প্রশ্ন হলো, একজন নিম্নপদস্থ ঝাড়ুদার বা ক্লিনারের ব্যক্তিগত বা দলগত অপরাধের দায় কি হাসপাতালের মালিক বা এর মূল উদ্দেশ্য সেবার ওপর চাপানো সমীচীন? একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানে হাজারো মানুষ কাজ করে, তাদের সবার তাৎক্ষণিক আবেগ বা উগ্র আচরণের নিয়ন্ত্রণ সবসময় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে না। কিন্তু অপরাধ ঘটার পর কর্তৃপক্ষ যখন তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়, তখন প্রমাণিত হয় যে তারা বিশৃঙ্খলার পক্ষে নয়। সুতরাং, নিচের স্তরের কর্মচারীদের ভুলের খেসারত হিসেবে ৭০০ বেডের একটি লাইফলাইন হাসপাতালকে বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা কোনো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের শীর্ষ নেতৃত্ব বা মালিকপক্ষ কিন্তু এই পুরো সংকটে কোনো ধরণের অহংকার বা এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখাননি। তারা নিজেদের ভুলত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছেন, যা বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতির যুগে অত্যন্ত বিরল। ছয় শিশুর মৃত্যুর পর তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সস্তা অজুহাত না খুঁজে, বরং মানবিক দিকটিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন। ভুল স্বীকার করার পাশাপাশি তারা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আর্থিক মানসিকভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত করেছেন। একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানের কাছ থেকে এর চেয়ে ইতিবাচক এবং মানবিক সাড়া আর কী হতে পারে? তারা তো নিজেদের ভুল শুধরে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এবং সেবার মানকে আরও নিখুঁত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তাহলে কেন তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হবে না? কেন শুধুই শাস্তির চাবুক মেরে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে?

আমাদের শহরের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, মানসম্মত এবং সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো হাসপাতালের বড্ড অভাব। সরকারি হাসপাতালগুলোর করুণ দশা সবার জানা; সেখানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না, একজন রোগীকে সিট পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদিকে, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নামী-দামী বেসরকারি হাসপাতালগুলোর খরচ এত বেশি যে, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের কেউ সেখানে গেলে জমি-জমা বা ঘটিবাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে ফিরতে হয়। এই দুই চরম বাস্তবতার মাঝে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল গত কয়েক দশক ধরে একটি মজবুত সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে মা শিশু স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক মানের এনআইসিইউ (NICU) সেবা এবং জটিল সব অস্ত্রোপচার তারা যেভাবে নামমাত্র সাশ্রয়ী মূল্যে দিয়ে এসেছে, তা দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক বিপ্লব। এই ৭০০ বেডের হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিদিন যে হাজার হাজার অসহায় মা শিশু এখান থেকে শূন্য হাতে ফিরে যাবে, তাদের দায়িত্ব কে নেবে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি পারবে সেইসব বিপন্ন মানুষকে তাৎক্ষণিক বিকল্প মানসম্মত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতে?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বোঝা উচিত যে, শাটডাউন বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো শাসন বা সংস্কারের ভাষা হতে পারে না। কোনো একটি চিকিৎসা ইউনিটে ত্রুটি থাকলে বা জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী সেই নির্দিষ্ট অংশটিকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে জীবাণুমুক্ত বা সংস্কার করা হয়, যাকে টেকনিক্যাল ভাষায় প্রোটোকল সংস্কার বলা হয়। কিন্তু পুরো হাসপাতালটি, যার সাথে হাজারো ইনডোর এবং আউটডোর রোগীর জীবন-মরণ জড়িয়ে আছে, তা এক কলমের খোঁচায় বন্ধ করে দেওয়া এক ধরণের প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা। এটি সমাধান তো নয়ই, বরং দেশের বিদ্যমান ডাক্তার সংকট শয্যা সংকটকে এক লাফে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আদ্-দ্বীনের প্রতিদিনের কয়েক হাজার রোগীর চাপ যখন ঢাকা মেডিকেল বা সলিমুল্লাহ মেডিকেলের মতো ইতিমধ্যেই উপচে পড়া সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর গিয়ে পড়বে, তখন পুরো শহরের চিকিৎসা ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এতে করে আরও কত শত নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে, সেই হিসাব কি নীতিনির্ধারকদের কাছে আছে?

একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বছরের পর বছর মেধা, শ্রম, অর্থ ত্যাগের প্রয়োজন হয়; কিন্তু তা ধ্বংস করতে মাত্র একটা সরকারি নির্দেশই যথেষ্ট। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, এটি দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রের একটি অনন্য মডেল, যা প্রমাণ করেছে যে মুনাফা ছাড়াও মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব। এর সাথে জড়িয়ে আছে শত শত চিকিৎসা শিক্ষার্থী নার্সদের শিক্ষাজীবন ভবিষ্যৎ। এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হলে কেবল চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে না, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্য শিক্ষায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে। মালিকপক্ষ যখন নিজেরা ভুল স্বীকার করে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং নিজেদের সংশোধন করার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তখন তাদের ওপর শাটডাউনের মতো চরম খড়্গহস্ত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

জনস্বার্থের খাতিরে এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত তাদের এই 'শাটডাউন' করার কঠোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখে, তাদের সেবার মান ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ত্রুটিমুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তিবিশেষের অবহেলা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, তবে আইনের প্রচলিত ধারায় তার বিচার হোক। কিন্তু কর্মচারীদের উগ্রতা বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার দায় পুরো হাসপাতালের ওপর চাপিয়ে লাখো মানুষের চিকিৎসার অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। এই মুহূর্তে শহরের চিকিৎসা সংকট আরও ঘনীভূত না করে, আদ্-দ্বীনের মতো একটি বৃহৎ সুখ্যাত হাসপাতালকে তার ভুলত্রুটি পরিমার্জন করে পুনরায় পূর্ণোদ্যমে মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়াটাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত, মানবিক এবং দূরদর্শী সমাধান।

[ড. অখিল পোদ্দার, বিশিষ্ট সম্প্রচার সাংবাদিক ও সাবেক প্রধান বার্তা সম্পাদক, একুশে টেলিভিশন]