গত এক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে চলা টানা বর্ষণ এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার কারণে ভেঙে পড়েছে জাতীয় সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন)। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজার পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের প্রতিটি ধাপে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। পাইকারি বাজারে পণ্যের মজুত আপাতত সন্তোষজনক থাকলেও, সরবরাহব্যবস্থার এই বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
থমকে গেছে চট্টগ্রাম বন্দর, খালাসের অপেক্ষায় ৪০০ জাহাজ: দেশের নিত্যপণ্যের চাহিদার সিংহভাগই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। চিনি, ভোজ্যতেল ও গমের মতো আমদানিকৃত পণ্য বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে ছোট জাহাজে (লাইটার ভেসেল) খালাস করে অভ্যন্তরীণ নৌপথে দেশজুড়ে পাঠানো হয়। কিন্তু সাগর উত্তাল থাকা এবং টানা বৃষ্টির কারণে গত এক সপ্তাহে পণ্য স্থানান্তরের এই কাজ প্রায় বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গাজী বেলায়েত হোসেন জানান, সাধারণত প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি লাইটার জাহাজ পণ্য বোঝাই করলেও গত সপ্তাহে এই সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ৫ থেকে ১০টিতে। গতকাল সোমবার সকালে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় পণ্য ওঠানো-নামানো শুরু হলেও, এখনো ৪০০টিরও বেশি লাইটার জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় জটলা পাকিয়ে আছে। এই জট কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে বলে জানান তিনি।
বিপর্যস্ত পাইকারি বাজার: খাতুনগঞ্জে ধস, কারওয়ান বাজারে সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী: দেশের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আসাদগঞ্জের ব্যবসা এখন প্রায় স্থবির। আশপাশের জেলাগুলো বন্যা ও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হওয়ায় পাইকারি ক্রেতারা আসতে পারছেন না। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আমিনুল হক জানান, ক্রেতা সংকটে তাঁদের দৈনিক বেচাকেনা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। মৌসুমি বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় এবং ফসল সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় ঢাকার বাজারে সবজির সরবরাহ কমেছে। কারওয়ান বাজারের সবজি পাইকারি বিক্রেতা মোস্তফা কামাল জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে পাইকারি বাজারে সবজির দাম স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
বন্যার্তদের সহায়তায় শুকনা খাবারের বাজারে বাড়তি চাপ: বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রম চলায় বাজারে হুট করেই চিড়া, মুড়ি, সেমাই, বিস্কুট, নুডলস ও খেজুরের মতো শুকনা খাবারের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। চাহিদার এই আকস্মিক চাপে পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার ঘুরে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ২৫ কেজির এক বস্তা সাধারণ মানের চিড়া এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। প্রতি কেজি মুড়ির দাম ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায় ঠেকেছে। এছাড়া ৩০ কেজির এক ঝুড়ি খোলা সেমাইয়ের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫০ টাকা হয়েছে এবং খেজুরের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সরবরাহ তলানিতে, পরিবহনসংকট চরমে: দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো (করপোরেট জায়ান্ট) জানিয়েছে, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বড় অংশজুড়ে তাদের পণ্য সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়েছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাব বিভাগের প্রধান এস এম মুজিবুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত প্রতিদিন ২৮০ থেকে ৩০০ টন পণ্য সরবরাহ করলেও গত এক সপ্তাহে বন্যা কবলিত এলাকায় প্রতিদিন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টন পণ্য পাঠাতে পেরেছে। চট্টগ্রামের ডিপোতে বৃষ্টির পানির কারণে পণ্য খালাস করতে না পারা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। টিকে গ্রুপের অর্থ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. শফিউল আথার তাসলিম জানান, গত কয়েক দিন ধরে তাঁরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মেলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। গাড়ি পাওয়া গেলেও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও সিলেটের কিছু এলাকায় পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না।
ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও আগামীর শঙ্কা: চট্টগ্রাম বিভাগের ৪০৮টি ইউনিয়ন এখন বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির প্রায় ৭৩ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৫০ শতাংশ এবং কক্সবাজারের ৪৯ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ও সড়কের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় চার পার্বত্য জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের মুদি ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক জানান, বিগত চার-পাঁচ দিন ধরে কোম্পানিগুলো চাহিদার অর্ধেক পণ্যও সরবরাহ করতে পারছে না। পাইকারি পর্যায়ে দাম এখনো খুব বেশি না বাড়লেও, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সংকটের কারণে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ডিলার ও পাইকারি বাজারে চাল, ডাল, চিনি ও তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় বড় কোনো সংকট তৈরি হয়নি। তবে টানা বৃষ্টি ও বন্যা যদি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তবে দেশের খুচরা বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।