রোববার,

১২ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ২৭ ১৪৩৩

XFilesBd

তরিকাপন্থিদের ওপর হামলা বন্ধ করতেই হবে

তাসাউফতত্ত্ব সুফি সাইকলজি ও সুফি মেডিটেশনবিষয়ক দিনব্যাপী কর্মশালা। চিরায়ত সম্প্রীতি ফেরাতে খাজা ওসমানের ডাক

বিশ্বজিৎ রায়, ঢাকা

প্রকাশিত: ০২:২৫, ১২ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০২:৫৮, ১২ জুলাই ২০২৬

তাসাউফতত্ত্ব সুফি সাইকলজি ও সুফি মেডিটেশনবিষয়ক দিনব্যাপী কর্মশালা। চিরায়ত সম্প্রীতি ফেরাতে খাজা ওসমানের ডাক

রাজধানীর এশিয়া হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তাসাউফতত্ত্ব, সুফি সাইকলজি সুফি মেডিটেশনবিষয়ক দিনব্যাপী অভিজ্ঞতামূলক কর্মশালা। আধ্যাত্মিকতা, মনোবিজ্ঞান সমাজবাস্তবতার মেলবন্ধনে সাজানো এই আয়োজনে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। একইসঙ্গে তাসাউফের দর্শন তার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গভীর আলোচনা করেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিশিষ্টজনেরা।

সুফি সেন্টারের পরিচালক বিশিষ্ট সুফিচিন্তক খাজা ওসমান ফারুকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রখ্যাত দার্শনিক, ইমেরিটাস অধ্যাপক . আনিসুজ্জামান। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে একাডেমিক গাম্ভীর্য দার্শনিক গভীরতা এনে দেয়। মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক . কে. এম. সাইফুল ইসলাম খান, যিনি ফারসি সাহিত্য সুফি ঐতিহ্যের যোগসূত্র নিয়ে তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচক হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক . আব্দুস সবুর খান এবং ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন। তাঁদের আলোচনায় সুফিবাদের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ফুটে ওঠে। কিভাবে বাধা উতরে সামনের দিকে ধাবমান হওয়া যায় সে বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক এবং শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর--মুর্শেদ স্বাগত বক্তব্য প্রদান করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পুষ্টি খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুজ যাহের, বিচারক মো. সালাউদ্দিন, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব . অখিল পোদ্দার এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মুরাদ আনসারীসহ আরও অনেকে। বিভিন্ন পেশা ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনদের সম্মিলিত উপস্থিতি কর্মশালাটিকে বহুমাত্রিক তাৎপর্য দান করে।

বক্তারা সুফিবাদের নানা অন্তরায় তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে মহৎ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। আলোচনায় উঠে আসে সুফিবাদীদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা, মিথ্যা মামলায় জড়ানোর অভিযোগ, অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান এবং মব সৃষ্টি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার প্রবণতা। বক্তারা এসব ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন এবং বিষয়টি নিয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জ্ঞানচর্চা, আত্মসচেতনতা নৈতিক বিকাশের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি মানবিক, সুষম পরিপূর্ণ সমাজ গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ব্যক্তি সমাজজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে আধ্যাত্মিক চর্চার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি ক্ষেত্রে সুফি সেন্টারের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকার প্রশংসা করেন।

সভাপতির বক্তব্যে খাজা ওসমান ফারুকী খাজাজী বলেন, তাসাউফ মানুষের অন্তর্জগৎকে পরিশুদ্ধ করে তাকে তার প্রকৃত সত্তা স্রষ্টার সঙ্গে গভীরতর সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সুফি সাইকলজি সুফি মেডিটেশন ব্যক্তিজীবনে মানসিক ভারসাম্য, আত্মউপলব্ধি, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ

অর্জনের একটি বিজ্ঞানসম্মত অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রক্রিয়া।

তাঁর অভিমত,মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা অন্তর্গত শান্তির চর্চা ছাড়া একটি সুস্থ ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সুফি সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, প্রশিক্ষণ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে তিনি জানান। আগামী মাসে কোথায় কিভাবে নতুন সেশান শুরু হবে তাও বলে দেন।

সাধু-সন্ন্যাসী, মাজারপন্থি, পীর-মুরশিদ, অলি-আউলিয়া, বৈষ্ণব-সুফি, শিল্পী-মুক্তমনাসহ বিভিন্ন তরিকাপন্থিদের ওপর সাম্প্রতিক যে জুলুম ও অত্যাচার চলছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র তুলে ধরেন একুশে টেলিভিশনের বিদায়ী প্রধান বার্তা সম্পাদক ড. অখিল পোদ্দার। তিনি বলেন, বাংলায় এখনও অসাম্প্রদায়িক আবহ বিরাজমান। একে অন্যের সঙ্গে মিলিতভাবে ধর্ম পালনে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে মডেল। অথচ কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির আস্ফালনের কারণে চিরায়ত সেই সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাজার খানকা রক্ষার জন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই সমাজবিবর্তনের সঙ্গে মিশে আছে একাত্মবাদের ইতিহাস। যেখানে মানুষ শধুই মানুষের জন্য। ধর্মীয় বিভেদ এখন এমন এক স্থানে গিয়ে পৌঁছেছে যে, বিপরীত চিন্তার কেউ হত্যা হলেও মানুষ হাততালি দিচ্ছে। উস্কানি দিচ্ছে মব কালচারে।  

দিনব্যাপী এই কর্মশালা আধ্যাত্মিকতা, মনোবিজ্ঞান সামাজিক দায়বদ্ধতার এক ব্যতিক্রমী মিশ্রণ হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বক্তাদের আলোচনায় বারবার উঠে আসে সুফিবাদের প্রতি সাম্প্রতিক অসহিষ্ণুতা নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা, পাশাপাশি আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি সমাজের ইতিবাচক রূপান্তরের সম্ভাবনা। দর্শক সারিতে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন এশিয়া হোটেলের কর্ণধার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম, বরেণ্য প্রাবন্ধিক কবি ও প্রকাশক সৈকত হাবিব, মার্বেল ব্যবসায়ী আমিরুল ইসলাম, লেখক ও সংগঠক ইসমাইল হোসেন ইজমিসহ অন্যরা।