সোমবার,

০৬ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ২১ ১৪৩৩

XFilesBd

ওরাশের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৮০০০ ফুট ওপরে

তি ময় সিন থেকে ডেথ বিফোর ডিসগ্রেস: লে. জেনারেল মতিউর রহমানের স্মৃতির পাতায় রুদ্ধশ্বাস জীবনের চালচিত্র

ড. অখিল পোদ্দার

প্রকাশিত: ০৫:৫১, ৬ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০৬:০০, ৬ জুলাই ২০২৬

তি ময় সিন থেকে ডেথ বিফোর ডিসগ্রেস: লে. জেনারেল মতিউর রহমানের স্মৃতির পাতায় রুদ্ধশ্বাস জীবনের চালচিত্র

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) এস এম মতিউর রহমানের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ "আমার সেসব দিনগুলো" বাংলা সাহিত্যের আত্মজৈবনিক ধারায় এক অনন্য সংযোজন। প্রায় চার দশক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত নিষ্ঠা গৌরবের সাথে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর জীবনে এসে লেখক তাঁর জীবনের বর্ণাঢ্য, রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন স্মৃতির সিন্দুক উন্মোচন করেছেন। বইটির মূল্য মাত্র ২৫০.০০ টাকা হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবনের পাঠ অমূল্য। নবধারা পাবলিকেশন থেকে মার্চ ২০২৬- প্রকাশিত এই গ্রন্থটিতে মোট ৫টি চমকপ্রদ গল্প বা স্মৃতিকথা সংকলিত হয়েছে। আলোচিত এ গ্রন্থ নিয়ে লিখেছেন-ড. অখিল পোদ্দার

যুদ্ধের ক্ষত এক শিশুর নিষ্পাপ কান্নার প্রতিচ্ছবি-

ভালো থেকো মোহাম্মদ:

গল্পটির শুরুই হয় জীবনের এক অমোঘ বাঁক বদলের তারিখ দিয়ে। লেখক তৎকালীন মেজর হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের উদ্দেশ্যে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হন। জাগরেব হয়ে তিনি পৌঁছান বসনিয়ার অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং রণকৌশলগতভাবে উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্র 'ওরাশে' (Orasje) টাউনশিপে। এখানে একদিকে ছিল হাড়কাঁপানো শীত, অন্যদিকে মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শেল-বাগোলার তীব্র গর্জন।

শীত যুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট: ওরাশের বৈরী আবহাওয়া যুদ্ধাবস্থার চিত্র লেখক অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তৎকালীন পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক লিখেছেন:

"এখানে আসার - দিন পরই বরফ পড়তে শুরু করলো। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়ির উঠান হাঁটু সমান বরফে ঢেকে গিয়েছে। দেখলাম বাড়িওয়ালার - বছর বয়সের ফুটফুটে ছেলে মোহাম্মদ বরফের উপর তার সাথে খেলার জন্য একজন সাথি খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও বাচ্চাটিকে নিরাশ করতে পারলাম না, ওর সাথে ১০-১৫ মিনিট বরফের উপর দৌড়ঝাঁপ করতেই হলো। এই বাসায় আমার প্রথম রাতের শীতের কষ্ট ছিল অসহনীয়। কয়েক সেট কাপড় পড়ে স্লিপিং ব্যাগের ভিতর মাথা ব্যতিরেকে সম্পূর্ন শরীর ঢুকিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় তখন বিদ্যুৎ গ্যাসের মারাত্বক অভাবের কারণে ঘর গরম করার সিস্টেম অকার্যকর থাকায় ঘরে বাইরে একই রকম ঠান্ডা লাগতো।"

লেখকের থাকার ঘরটির ছাদ ছিল ভাঙাপলিথিন দিয়ে ঢাকা ছিল। বাড়িওয়ালি ফাতিমার কাছ থেকে লেখক জানতে পারেন যে, কিছুদিন আগে একটি মর্টার শেল বা বোমা ঘরের ছাদের ওপর পড়েছিল। এই রক্ত হিম করা পরিবেশেও লেখক দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি যা লিখেছেন তা রীতিমতো ঝরঝরে, রোমাঞ্চকর ও ক্লাইম্যাক্সে ভরপুর। কষ্টেসৃষ্টে একবার নিয়ে বসলে পাতা শেষ না করে কেউ উঠতে পারবেন না। গেল ক’দিন আগে কুষ্টিয়ার খোকসা থেকে ঢাকায় ফিরতে নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো ৫ খানা গল্প। ট্রেনের জানালা ভেদিয়ে যখন বাইরে তাকালাম তখন সবে ফরিদপুর উতরে ভাঙার কাছাকাছি। লেখক যে আকর্ষণ তৈরী করেছেন তা সত্যিই শ্রদ্ধাতূল্য। তাঁর গদ্যের ঢং যেনো শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখার্জী, দেবেশ রায়, ব্রাত্য বসুদের মতোই। পাতায় আটকে থাকে চোখ। নিবিষ্ট মনন সচরাচর ভাবতে চায় না এ দুনিয়ার অন্য কিছু। সুতরাং ফেরা যাক যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার সেই অপাপবিদ্ধ শিশু মোহাম্মদের বাড়ির উঠোনে। যেখানে অদৃশ্য এক উপলব্ধী লেখককে নিবিষ্ট করেছিল। যেমনটি আধুনিক মানুষকে হামেশাই বেঁধে ফেলে নিয়তির মায়া। স্মৃতির বাঁধন ঝলক দেয় সন্ধ্যাতারার মতো।

মোহাম্মদের সাথে বন্ধুত্ব চিরতরে বিদায়ের বেদনা:

যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই জনপদে শিশুদের কোনো খেলার সাথি ছিল না। ছোট্ট মোহাম্মদ লেখকের মাঝে খুঁজে পেয়েছিল এক পরম বন্ধুকে। কিন্তু সামরিক জীবনের নিয়ম অনুযায়ী লেখকের বদলির আদেশ আসে জাগরেব সদরদপ্তরে। চলে যাওয়ার সেই মুহূর্তটি ছিল অসম্ভব আবেগঘন। লেখক সেই হুবহু অংশটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

"চলে আসার সময় মোহাম্মদের হাতে একটি চকলেটের প্যাকেট দিলে সে চকলেট না নিয়ে কাঁদতে শুরু করে। গত রাতেই কোনভাবে জানতে পেরেছে আমি চলে যাচ্ছি। যুদ্ধের কারণে বেশিরভাগ মানুষ আশেপাশের নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ায় মোহাম্মদের কোন খেলার সাথি ছিল না। বিষয়টি বুঝতে পেরে আমি মাঝে মাঝে ওর সাথে খেলতাম। কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর গোলাপী রং এর চোয়াল বেয়ে নামা চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম আমি আবার আসবো। কিন্তু ছোটো বাচ্চা হলেও সে খুব ভালো করেই জানে আমি আর কখনও ওখানে ফিরে যাবোনা। অস্ফুট শব্দে কিছু একটা বলার পর সামান্য ইংরেজি জানা মোহাম্মদের মা বললেন, বলেছে আমি মিথ্যা বলছি। আমার গাড়ি চলতে শুরু করেছে। একজন কঠিন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও লক্ষ্য করলাম আমি কাঁদছি। মনে হলো মোহাম্মদকে মিথ্যে কথাটা না বললেই পারতাম। কিন্তু সত্যটাই বা বলি কীভাবে? ওদেরকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে স্বার্থপরের মতো অন্য সবাই যা করে আমিও তাই করলাম। জানিনা ছেলেটি কেমন আছে, কোথায় আছে। আশা করি সেই ছোটো মোহাম্মদ এখন অনেক বড়ো হয়েছে। ভালো থেকো মোহাম্মদ। তোমার জন্য নিরন্তর শুভকামনা। মহান আল্লাহ তোমাকে এবং তোমার পরিবারের সবাইকে ভালো রাখুন।"

 

মেসিডোনিয়ার বুকে এক খ্রিষ্টান মায়ের মাতৃত্ব-

তি ময় সিন:

১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে মিশনের মেয়াদ কমে যাওয়ার পর লেখককে মেসিডোনিয়ায় (বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়া) বদলি করা হয়। পাহাড়ঘেরা ছবির মতো সুন্দর এই দেশের 'তেতোভো' উপত্যকায় লেখকের কর্মজীবন শুরু হয়। সেখানে তিনি এএসপি রাজিবের সাথে মার্শাল টিটোর আমলের তৈরি একটি সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে থাকা শুরু করেন। সেই বাসার মালকিন ছিলেন সাবা নামের ৬৫ বছর বয়সী এক সম্ভ্রান্ত খ্রিষ্টান নারী, যিনি দেখতে ছিলেন অনেকটা ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের মতো। লেখকের এটি দ্বিতীয় গল্প। যেখানে তিনি বর্ননার যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তা যে কোন নামি লেখকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। চিত্রকল্প বা এ্যালিগরি তুলে ধরাতে তাঁর যে শিল্পিত আঁচর তা সচরাচর হাল-সাহিত্যে মেলা ভার।

এক টুকরো বাংলাদেশ আলু ভর্তার স্বাদ:

সাবা তাঁর প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাসাটিকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসতেন। লেখক রান্না করতে জানতেন। একদিন তুষারপাতের কারণে বাসায় থাকার সময় সাবা এলে লেখক নিজের হাতে বাঙালি খাবার রান্না করে তাঁকে খাওয়ানতাঁর যে বর্ননা তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এমন দৃশ্যকল্প আঁকিয়ে সমসাময়িক সাহিত্যে খুব কম লেখকের মধ্যেই বিরাজিত। তিনি লিখেছেন-

"জানতে চাইলাম আমি রান্না করলে উনি খাবেন কিনা। তিনি সহাস্যে আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে রাজি হয়ে গেলেন। আমি রান্না শুরু করলাম। সাদা ভাত, আলু ভর্তা, ডিম ভাজি এবং পাতলা ডাল। আমার বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ, সুস্বাদু এবং সস্তা খাবার। এক ঘণ্টার মধ্যে রান্না শেষ করে ছোটো ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে দিলাম। এতক্ষণ সাবা কোন কথা না বলে শুধু দেখছিলেন আমি কি করি। বাংলাদেশ থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে আলু ভর্তা করা হয়েছে। রাজিবের আসতে দেরি হবে। তাই অপেক্ষা না করে আমরা খেতে বসলাম। আমার রান্নার হাত ভালোই পেকেছে। সাবার জন্য একটু ঝাল হলেও আমি দেখলাম তিনি তৃপ্তিসহকারে খেলেন।"

ভুল বোঝাবুঝি এবং মাতৃত্বের পরম রূপ:

সাবা মাঝে মাঝে লেখকের অনুপস্থিতিতে এসে ঘর পরিপাটি করে দিতেনএমনকি লেখকের গোপনে রাখা ছোটখাটো কাপড়ও ধুয়ে দিতেন। নোংরার কারণে যা তিনি প্রায়শই লুকিয়ে রাখতেন। একদিন লেখক এতে ভীষণ ক্ষিপ্ত রাগান্বিত হলে সাবা অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে মিশন শেষ করে লেখকের বাংলাদেশে ফেরার দিন সাবার সেই মাতৃত্ব রূপ কান্না লেখককে আজীবন ঋণী করে রাখে। বিদায়ের সেই আবেগঘন মুহূর্তের বর্ণনা:

"সময় হয়ে এসেছে, নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে। বড়ো লাগেজগুলো গাড়িতে রেখে আমি আবার উপরে উঠে এলাম। এবার আমারও খারাপ লাগতে শুরু করেছে। সাবার বাসায় আমি চার মাস থেকেছি। আমার জীবনের অন্যতম সেরা চার মাস। মনে হলো আমি মায়াজালে আটকে যাচ্ছি। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো আমাকে যেতে হবে। সাবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য তার কাছে এগিয়ে গেলাম। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। ওদের ভাষায় বললাম আমি যাচ্ছি, তুমি ভালো থেকো। তার মুখে হাসি কিন্তু চোখে পানি। আমাকে হাসিমুখে বিদায় দিতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেননা। তিনি একটু এগিয়ে এসে দুহাত আমার কাঁধের উপর রাখলেন আর বললেন, তিময়সিন অর্থাৎ তুমি আমার ছেলে। একথা বলে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। সাবা ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত ধার্মিক খ্রিষ্টান নারী। তিনি প্রতি রবিবার প্রার্থনা করার জন্য চার্চে যেতেন। সময়ে তার দেশে প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাকে নিজের ছেলে মনে করতেন। আমার কাপড় ধুয়ে আয়রন করে দিতেন। একদিন আমি তার উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে তাকে ভুল বুঝেছিলাম। গাড়ি বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। সকালের সোনালি রোদে তেতোভো উপত্যকা ঝলমল করছে। কিন্তু আমার চোখে পানি, সাবার জন্য খারাপ লাগছে। বারবার মনে পড়ছে তার বলা শেষ তিনটি শব্দ - তিময়সিন।"

বুদাপেস্টের চলন্ত ট্রেনে কমান্ডো অফিসার যখন মারদাঙ্গা

পকেটমারের খপ্পরে:

১৯৯৬ সালের শীতকালের এক রোমাঞ্চকর ঘটনা এটি। লেখক তাঁর বন্ধু মেজর হুমায়ুন (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) দিনের ছুটিতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে বেড়াতে যান। সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে সদ্য পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পা দেওয়া হাঙ্গেরি তখন অর্থনৈতিকভাবে বেশ ভঙ্গুরযার ফলে সেখানে পকেটমারদের উপদ্রব ছিল চরমে। বিশেষ করে বিদেশিদের পাসপোর্ট নগদ টাকা চুরি করে জালয়াতির বড় ব্যবসা চলত সেখানে। বুদাপেস্টের পাতালে মেট্রোরেলে ভ্রমণের সময় লেখক প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এক মুহূর্তের জন্য ওভারকোটের পকেট থেকে হাত বের করে ট্রেনের হাতল ধরেন। আর ঠিক সেই কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতায় তাঁর পাসপোর্টটি চুরি হয়ে যায়। তৃতীয় গল্পে তিনি বর্ননাচ্ছটার যে সমারোহ দেখিয়েছেন তাতে ইতিহাস, সমাজের স্তর নেমে যাওয়া, তৎকালীন অধপতন ও অতিসংবেদনশীলতা নির্মোহভাবে উঠে এসেছে।

চলন্ত ট্রেনে জীবনবাজি রেখে চোর ধরা:

পাসপোর্ট চুরির বিষয়টি বুঝতে পেরে লেখক স্টেশনে দেখা এক সন্দেহভাজন জিন্স ছাই রঙের জ্যাকেট পরা তরুণকে দেখতে পানযে কিনা ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করছিল। লেখক কোনো দ্বিধা না করে তার কলার চেপে ধরেন। কিন্তু স্টেশনে নামার পর চোরটি এক ঝটকায় লেখকের হাত থেকে ছুটে গিয়ে বন্ধ হতে যাওয়া ট্রেনের ভেতর উঠে পড়ে। সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের বর্ণনা:

"ঠিক এই সময়ে ছেলেটি এক ঝটকায় আমার হাত থেকে ছুটে গিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লো। ততক্ষণে দরজার তিন চতুর্থাংশ বন্ধ হয়েছে। আমি ব্যাগ ফেলে রেখে ওর পিছনে ছুটলাম। দরজার অবশিষ্ট ফাঁকা জায়গা দিয়ে আমার পক্ষে ট্রেনে উঠা সম্ভব না। কিন্তু আমি দমে গেলাম না। অবস্থায় দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে মাত্র - ইঞ্চি খোলা জায়গা দিয়ে আমার একটি হাত ভিতরে প্রবেশ করাতে সমর্থ হই। দুই পাশ থেকে আসা দরজা আমার হাতে ধাক্কা খেয়ে আবার খুলে গেলো। এবার খোলা দরজা দিয়ে আমি ভিতরে প্রবেশ করি এবং একটুও সময় নষ্ট না করে পকেটমার ছেলেটিকে ধরে ফেলি। ট্রেন আবার চলতে শুরু করলো। ইউরোপের একটি দেশে চলন্ত ট্রেনের ভিতর এক অকল্পনীয় ঘটনা।"

আলেকজান্ডারের সাহায্য এবং সংকট মুক্তি

লেখক একজন দক্ষ কমান্ডো এবং কমান্ডোদের প্রশিক্ষক হওয়ায় চোরটিকে শক্ত হাতে কাবু করে রাখেন। পরে ট্রেনের মেঝেতে ফেলে দেওয়া পাসপোর্টটি কুড়িয়ে নিয়ে 'আলেকজান্ডার' নামের এক হাঙ্গেরিয়ান ভদ্রলোক লেখককে সাহায্য করেন। আলেকজান্ডার জানান যে, চোরেরা ধরা পড়ার ভয়ে প্রমাণ নষ্ট করতে জিনিসপত্র নিচে ফেলে দেয়। আলেকজান্ডারের বদান্যতায় এবং মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় লেখক শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট ফিরে পান এবং প্ল্যাটফর্মে উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধু হুমায়ুনের সাথে পুনরায় মিলিত হন। পুরো গল্প ক্লাইম্যাক্সে ভরপুর। সিনেমার মতো শুধু সিকোয়েন্স বদলেছে কিন্তু পাঠকের মন পড়ে থাকবে আখ্যানের অনন্ত গহীনে।

যুদ্ধের ডাক বনাম অনাগত সন্তানের পিতৃস্নেহ

৬ই আগস্ট ১৯৯৫:

এটি লেখকের চতুর্থ গল্প। গল্পটি লেখকের জীবনের সবচেয়ে মানসিক টানাপোড়েনের এক কালপঞ্জি। পুরোটা গল্পে শুধু মায়া আর মায়া। বাঙালি মধ্যবিত্তজীবনের টানাপড়েন, ভালোবাসার দেহঘড়িতে সাময়িক এ্যালার্ম ও সচেতনভাবে দায়িত্বশীলতা শোভা পেয়েছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর বলকান অঞ্চলে বিশেষ করে বসনিয়ায় যে ভয়াবহ ত্রিমুখী যুদ্ধ জাতিগত নিধন শুরু হয়তা দমনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে লেখক মনোনীত হন। তাঁর ফ্লাইটের তারিখ নির্ধারিত হয় ৬ই আগস্ট ১৯৯৫ কিন্তু লেখকের ব্যক্তিগত জীবন তখন এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তাঁর স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা এবং ডাক্তারদের মতে, প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ছিল ২রা আগস্ট ১৯৯৫। একদিকে দেশের সম্মান আন্তর্জাতিক দায়িত্বের ডাকঅন্যদিকে জীবনের প্রথম অনাগত সন্তানের পাশে থাকার তীব্র আকুলতাদুয়ে মিলে মেজর মতিউর রহমান জুয়েলকে চরম এক দোলাচলে ফেলে দেয়। লেখক তাঁর মানসিক যন্ত্রণার চিত্রটি তুলে ধরেছেন এভাবে:

"১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর - জন অফিসারের একটি দলের সাথে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়াতে চলমান মিশনে অংশগ্রহণের জন্য আমাকেও নির্বাচন করা হয়। আমাদের জন্য নির্ধারিত ফ্লাইট ছিল ৬ই আগস্ট ১৯৯৫। কিন্তু ব্যক্তিগত পারিবারিক কারণে আমি সময়ে আমার স্ত্রীকে রেখে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কারণ তখন আমরা আমাদের অনাগত প্রথম সন্তানের আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের প্রথম সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ছিল ২রা আগস্ট ১৯৯৫। ... কিন্তু আমি কোন কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। ... দেখতে দেখতে জুলাই মাস শেষ হলো। আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর আমাদের প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আগমনের নির্ধারিত দিন। ঘুম আসছেনা। শেষপর্যন্ত রাত পেরিয়ে সকাল হলো। আমার স্ত্রীকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তির জন্য নিয়ে যাচ্ছি। আগস্ট মাসের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি মেঘাচ্ছন্ন আমার মন। এই অবস্থায় বিদেশে যেতেই ইচ্ছে করছেনা। আগামীকাল ২রা আগস্ট, আর মাত্র কয়েকদিন পর ৬ই আগস্ট রাতে আমার ফ্লাইট। আনুমানিক এক বছরের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বরফে ঢাকা যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছি। আমি দিশেহারা, অনেক কাজ পড়ে আছে।"

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) এস এম মতিউর রহমানের "আমার সেসব দিনগুলো" গ্রন্থের পঞ্চম সম্ভবত সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্প বা স্মৃতিকথা হলো "DEATH BEFORE DISGRACE" (অপমানের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়) এই গল্পটি লেখকের সামরিক জীবনের অকুতোভয় মানসিকতা, এক চরম পেশাদারিত্ব এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের সম্মানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার এক অনন্য দলিল।

DEATH BEFORE DISGRACE

গল্পের শুরুতেই লেখক স্কাইডাইভিংয়ের রোমাঞ্চের পাশাপাশি এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে উন্মোচন করেছেন। সাধারণ পাবলিক যা কোনদিনই জানবে না, বুঝবেও না। এ গল্পের পরতে পরতে ভিন্ন এক মতিউরকে পাওয়া যাবে। যাঁর বুকে শুধুই লালসবুজের সমারোহ। দেশ মানে তাঁর কাছে অনন্ত এক আকাশ। ব্রহ্মাণ্ডজুড়েই যেনো মতিউর রহমান জুয়েলের বাংলাদেশ। ১৯৮৯ সালে আমেরিকার ফোর্ট বেনিং সামরিক ঘাঁটিতে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সম্পূর্ণ একা, একজন তরুণ ক্যাপ্টেন হিসেবে তাঁর প্রথম বেসিক প্যারাস্যুট জাম্পের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ১২,০০০ মাইল দূরে অচেনা পরিবেশে প্রথম জাম্পের আগের রাতে যে নার্ভাসনেস বা ভয় কাজ করে, লেখক তা লুকানোর চেষ্টা করেননি।

তাঁর এই সততা গল্পটিকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। লেখক দেখিয়েছেন যে, ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভয়কে কীভাবে জয় করতে হয়-সেটিই আসল পরীক্ষা। দরজার সামনে গিয়ে যখন অন্য দেশের অনেক সৈনিককে ভীতিসন্ত্রস্ত হয়ে থমকে যেতে এবং জাম্পমাস্টারের লাথি বা ধাক্কা খেতে দেখেন, তখন লেখকের আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। তিনি নিজেকে মনে করিয়ে দেন-Death Before Disgrace (জান দিব মান নয়) তিনি বুঝিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং পুরো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি। কোনো ধাক্কা না খেয়ে ক্ষিপ্রতার সাথে শূন্যে লাফিয়ে পড়ার এই সিদ্ধান্তটি তাঁর ভেতরের দৃঢ় চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।

বিজি প্রেসের ছাদে ভিনগ্রহের মানুষ

১৯৯৪ সালের ২১শে মার্চ, ঢাকার প্যারেড গ্রাউন্ডে স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজের অনুশীলন চলাকালীন ৮০০০ ফুট উপর থেকে জাম্প করার পর লেখক এক চরম আবহাওয়ার কবলে পড়েন। ঢাকা শহরের তীব্র দমকা বাতাসের কারণে তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বুড়িগঙ্গার ওপর চলে যান। সেখান থেকে জীবন বাঁচানোর তাগিদে, ঠান্ডা মাথায় হিসাব কষে তেজগাঁও শিল্প এলাকার 'বিজি প্রেস'-এর একটি অসমান একতলা ভবনের ছাদে ল্যান্ড করেন।

এই অংশের বর্ণনাটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই হাস্যরসে ভরপুর। ছাদ থেকে নামার জন্য লেখক যখন নিচে এক মধ্যবয়সী লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখন সেই লোক লেখকের লাল-কালো চামড়ার হেলমেট, ঝুলন্ত প্যারাস্যুট গিয়ার দেখে "ভিনগ্রহের মানুষ" মনে করে ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়! এই অংশটি জীবনের চরম সংকটের মধ্যেও এক টুকরো হালকা বিনোদন তৈরি করে, যা লেখকের লেখনী শৈলীর এক চমৎকার গুণ। পরবর্তীতে সহযোদ্ধা ওয়ারেন্ট অফিসার জহুরের সাথে তাঁর মিলন এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরে জহুরের অশ্রু বিসর্জন প্রমাণ করে যে, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধন কতটা গভীর আত্মিক। সত্যি বলতে যারা একটু এডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের কাছে এ গল্প অনবদ্য ও অনন্য।

২৬শে মার্চের রুদ্ধশ্বাস ক্লাইম্যাক্স এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

গল্পের মূল ক্লাইম্যাক্স বা চরম উত্তেজনাকর মুহূর্ত তৈরি হয় ১৯৯৪ সালের ২৬শে মার্চ মূল কুচকাওয়াজের দিনে। লেখক ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার গর্বিত বাহক যাকে নিয়ম অনুযায়ী সবার শেষে ল্যান্ড করতে হতো। ৫০০০ ফুট উচ্চতায় প্যারাস্যুট খোলার পর হঠাৎ ঢাকার বৈরী দমকা বাতাস তাঁকে কাফরুলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে ঠেলে দেয়।

প্যারেড গ্রাউন্ডের ঠিক সামনে একটি বিশাল লেক বা জলাভূমি ছিল। তীব্র বাতাসের কারণে লেখক বুঝতে পারেন তিনি লেকের পানিতে পড়তে যাচ্ছেন। টেলিভিশনে তখন লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে, কুচকাওয়াজে উপস্থিত আছেন হাজার হাজার মানুষ। দেশের জাতীয় পতাকা সাথে থাকা অবস্থায় পানিতে ভিজে যাওয়াকে লেখক নিজের দেশের জন্য একপ্রকার 'ডিসগ্রেস' বা অপমান হিসেবে গণ্য করেন। আর ঠিক এইখানেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্তটি নেন:

"চিন্তা করে দেখলাম, জাতীয় পতাকাসহ এত মানুষের সামনে পানিতে না ভিজে ডানদিকের ছোটো খোলা জায়গায় যেতে পারলে সেখান থেকে প্যারেড গ্রাউন্ডে চলে আসা সম্ভব। কালবিলম্ব না করে প্যারাস্যুট ডানদিকে ঘুরিয়ে দিলাম। একটি অকল্পনীয় বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। এর ফলে বাতাসের গতি, প্যারাস্যুটের গতি এবং ঘূর্ণনগতি এই তিনটি ফ্যাক্টর একত্রিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে আমি একটি ধাবমান রকেটে পরিণত হয়ে যাই। বুলেটের গতিতে বিল্ডিং এর দিকে যাচ্ছি।"

নির্মাণাধীন সেই ভবনের লোহার রড বের হয়ে থাকা কলামগুলোর মাত্র ১২ ফুটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বুলেটের গতিতে বের হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি পাঠককে আক্ষরিক অর্থেই রোমাঞ্চের চরম সীমায় নিয়ে যায়। কলামের সাথে সামান্য ধাক্কা লাগলেই যেখানে মৃত্যু নিশ্চিত, সেখানে লেখক নিজের পা দুটোকে থুতনির কাছে ভাঁজ করে অলৌকিকভাবে সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে যান এবং একটি টিনের ঘরের বারান্দায় ল্যান্ড করেন। ঘাড় বাঁচাতে গিয়ে হাত সামান্য কেটে যাওয়া ছাড়া তিনি অক্ষত থাকেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী সিনিয়ার অফিসারের মন্তব্য"মতিউর তুমি জানোনা আমি কি দেখেছি। আমি একজন হার্টের রোগী। আজ তোমার লোমহর্ষক অবতরণের দৃশ্য দেখে মরতে বসেছিলাম"প্রমাণ করে সেই দৃশ্যটি কতটা লোমহর্ষক ছিল।

কমান্ডো স্পিরিট এবং দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ

এই গল্পটি কেবল প্যারাস্যুট থেকে লাফ দেওয়ার গল্প নয়এটি একজন প্যারা কমান্ডোর DO OR DIE (করো অথবা মরো) এর বহি:প্রকাশ। অদম্য সেনার জীবনবাজির মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার জীবন্ত প্রমাণ। লেখক চাইলে সহজেই মিশন পরিত্যাগ করে কোনো নিরাপদ ফাঁকা জায়গায় নেমে যেতে পারতেনপানির লেকে ল্যান্ড করলে হয়তো ঝুঁকি অনেক কম হতো। কিন্তু লাল-সবুজ পতাকার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য তিনি নিজের জীবনকে বাজি ধরে রকেটের গতিতে কংক্রিটের বিল্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েছেন। এটি তাঁর নিখাদ দেশপ্রেম এবং পেশাগত গৌরবের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। পাঠক এখানে এসে একজন দক্ষ, বিচক্ষণ ও রিয়েল দেশপ্রেমিককে স্যালুট জানাবেন নিশ্চিত। বইয়ের পাতা থেকে চোখ না সরিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে রইবেন। জ্ঞানচক্ষুতে দেখবেন-কচুক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, প্যারেডগ্রাউন্ডসহ আশপাশের সব এলাকা।

DEATH BEFORE DISGRACE গল্পটি পড়ার সময় পাঠকের হৃদস্পন্দন দ্রুততর হতে বাধ্য। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) এস এম মতিউর রহমান তাঁর জীবনের এই চরম সত্য রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে যেভাবে সহজভাবে কনটেমপোরারি ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন, এক কথায় তা অনবদ্য। গল্পটিতে কোনো অতিপ্রাকৃতিক বা অতিরঞ্জিত বর্ণনা নেই। অত্যন্ত খাঁটি সামরিক ঘরানার সুশৃঙ্খল বর্ণনা পাঠককে সরাসরি তেজগাঁওয়ের আকাশে ৮০০০ ফুট ওপরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। গল্পটি আমাদের শেখায় যে পেশাদারিত্বের চরম সীমায় পৌঁছাতে হলে নিজের দায়িত্বের প্রতি কতটা সৎ একনিষ্ঠ হতে হয়। এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য এবং বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে ইচ্ছুক তরুণদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস।

পূর্বের ৪টি গল্পের মানবিক আবেগঘন সুরের পর-এই পঞ্চম গল্পটি পুরো বইটিতে একটি অনন্য 'অ্যাকশন রিলিজ' (Action and Release) তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, লেখক যেমন একজন সংবেদনশীল মনের মানুষ (যিনি মোহাম্মদ বা সাবার জন্য কাঁদেন) তেমনই দেশের প্রয়োজনে তিনি একজন ইস্পাতকঠিন কমান্ডোতিনি দেশের পতাকার সম্মানের জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। বইটির শেষ গল্প হিসেবে এটি পাঠককে এক দীর্ঘস্থায়ী সম্মোহন এবং লেখকের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধের জায়গায় রেখে যায়।

 

সাহিত্যিক মূল্যায়ন: আমার সেসব দিনগুলো

সহজ সাবলীল ভাষা শৈলী: লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) এস এম মতিউর রহমান বিনয় প্রকাশ করে বলেছেন যে, তিনি কোনো প্রথিতযশা লেখক বা সাহিত্যিক নন। কিন্তু তাঁর লেখার ভাষা অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল এবং সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটে। কোনো কৃত্রিম অলঙ্কার ছাড়াই তিনি যেভাবে একের পর এক দৃশ্যপট তৈরি করেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

ঘটনার সত্যতা জীবন্ত বিবরণ: একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে লেখকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ। বসনিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়াশা, ট্রেনের ভেতরের রুদ্ধশ্বাস চোর ধরার কায়দা কিংবা মেসিডোনিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসবকিছুই তিনি নিখুঁতভাবে ডায়েরির পাতার মতো তুলে ধরেছেন।

মানবিকতা অসাম্প্রদায়িক চেতনা: বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর মানবিক আবেদন। বসনিয়ার মুসলিম শিশু মোহাম্মদকে জড়িয়ে ধরে একজন সেনা কর্মকর্তার কান্না কিংবা মেসিডোনিয়ার ধার্মিক খ্রিষ্টান বৃদ্ধা সাবার মুসলিম লেখকের প্রতি মাতৃত্বের টান-প্রমাণ করে যে যুদ্ধ বা ধর্মের সীমানা ছাপিয়ে মানুষের মধ্যকার ভালোবাসাই পরম সত্য।

পারিবারিক উত্তরাধিকার: লেখকের বড় ভাই বাংলাদেশের বরেণ্য ছড়াকার লেখক কবি নাসের মাহমুদ। পরিবারে এমন একজন গুণী মানুষের উপস্থিতি লেখকের অবচেতন মনেও যে এক গভীর সাহিত্যবোধের জন্ম দিয়েছে তা এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় দৃশ্যমান। সামরিক বিষয়ের বাইরে গিয়ে জীবনের এই ছোট ছোট গল্পগুলো ফেসবুকের দেয়াল পেরিয়ে আজ যে গ্রন্থরূপ পেয়েছে, তা সত্যিই বাংলা সাহিত্যের জন্য আনন্দের। ঘুণপোকায় বাসা বাঁধা সমাজের বৃহত্তম অংশ যখন মোবাইল কিংবা পরচর্চায় ব্যস্ত তখন লেখক গেরস্থালির রুটিন আনন্দ জলাঞ্জলি দিয়ে এমন একখানা গ্রন্থ আমাদের উপহার দিয়েছেন। হৃদয়ের দায়বদ্ধতা থেকে তিনি যে সমাজনিষ্ঠতার পরিচয় দিলেন তাতে তিনি মোহরখচিত ভালোবাসা পেতেই পারেন।

পরিশেষে বলা যায়, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) এস এম মতিউর রহমানেরআমার সেসব দিনগুলোএমন একটি স্মৃতিকথা, যা কেবল একজন সেনা কর্মকর্তার পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা নয়, বরং একজন মানুষের ভেতরের ভাঙা-গড়া, সিদ্ধান্তের চাপ, দায়িত্বের ভার এবং আবেগের নিঃশব্দ বিস্ফোরণকে একসাথে ধারণ করে। বইটি পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার বুঝতে পারে, এটি কোনো সাজানো সাহিত্য নয়এটি বাস্তব জীবনের এমন কিছু মুহূর্তের দলিল যা সময়ের চাপেও মুছে যায় না।

লেখক দীর্ঘ প্রায় চার দশকের সামরিক জীবনে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেনবিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তার অভিজ্ঞতা বইটির মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছে তিনি শুধু একজন সৈনিক ননতিনি একজন পর্যবেক্ষক- যিনি যুদ্ধ, মানুষ এবং সম্পর্ককে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই দেখার ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছে এই বইয়ের বর্ণমালা।

এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো-এখানে কোনো অতিরঞ্জিত নায়কত্ব নেই। লেখক নিজেকে কখনো বড় করে তোলেননি। বরং তিনি নিজের দুর্বলতা, দ্বিধা, ভয় এবং আবেগকে সরাসরি তুলে ধরেছেন। ফলে বইটি পাঠকের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। একজন সৈনিকের ভেতরেও যে একজন সাধারণ মানুষ বাস করে

এবং সেই মানুষের মনের মধ্যে বসবাস পেঁজা তুলোর মতো নরম একখণ্ড আকাশ। যা ভাবতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। এ বই তারই প্রমাণ দিচ্ছে। বইয়ের গল্পগুলো আলাদা আলাদা হলেও গভীর অভ্যন্তরীণ সংযোগ আছে। সেই সংযোগটি হলো-মানুষ বনাম দায়িত্ব। কখনো দায়িত্ব জেতে, কখনো মানুষ জেতে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুটো একসাথে টিকে থাকতে পারে না। এই টানাপোড়েনই বইটির মূল প্রাণ।

আমার সেসব দিনগুলো কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়; এটি একটি জীবনের দলিল, যেখানে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, মাতৃত্ব, রোমাঞ্চ, কর্তব্যবোধ এবং খাঁটি মানবিক অনুভূতি। প্রতিটি গল্পের সমাপ্তি পাঠককে এক অদ্ভুত শূন্যতা একই সাথে এক পরম শান্তিতে ডুবিয়ে দেয়। ২৫০ টাকা মূল্যের এই বইটি প্রতিটি বইপ্রেমী মানুষের সংগ্রহে রাখার মতো একটি চমৎকার সৃষ্টি। লেখকের অদূর ভবিষ্যতের লেখনীগুলোর জন্য রইল নিরন্তর শুভকামনা।