শনিবার,

২০ জুন ২০২৬

|

আষাঢ় ৫ ১৪৩৩

XFilesBd

ব্যক্ত করলেন নিজের অভিজ্ঞতা

এ কিসের আলামত? আদ দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে মুক্ত কলাম

ডা. গুলশান আরা বেগম

প্রকাশিত: ০১:৫৫, ২০ জুন ২০২৬

এ কিসের আলামত? আদ দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে মুক্ত কলাম

এ কিসের আলামত?

- ডা. গুলশান আরা বেগম

সাধারণত কোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান যখন যাত্রা শুরু করে, তখন মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের প্রচারণা, মূল্যছাড়, বিশেষ সুবিধা বা অফার দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন সেই সুবিধাগুলো কমতে থাকে, আর সেবার মূল্য বাড়তে থাকে।

আদ-দ্বীনের গল্পটা ঠিক উল্টো।

আজকের বিশাল মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বহু বছর আগে, আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর পূর্বে, যশোর রেল রোডের একটি ছোট টিনশেড ঘর থেকে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন না ছিল আধুনিক অবকাঠামো, না ছিল আর্থিক সামর্থ্য। ছিল শুধু একটি স্বপ্ন—অসহায়, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জন্য মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

যশোর সদর হাসপাতালে কর্মরত থাকার সুবাদে আমি সেই শুরুর দিনগুলোর সাক্ষী। পরবর্তীতে আমার কর্মস্থল ঢাকায় স্থানান্তরিত হলেও আদ-দ্বীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে যশোর যেতাম, রোগী দেখতাম, অপারেশন করতাম, এবং পরদিন রাতেই ঢাকায় ফিরে আসতাম। কারণ আদ-দ্বীন ছিল শুধু একটি হাসপাতাল নয়; এটি ছিল একটি আদর্শ, একটি অঙ্গীকার।

অনেকেই হয়তো জানেন না, প্রতিষ্ঠার প্রথম দিককার সময়ে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হতো মানুষের সহযোগিতায়। কিন্তু তখনও রোগীদের কাছ থেকে মুনাফা অর্জনের চিন্তা ছিল না। চিন্তা ছিল কীভাবে একজন দরিদ্র মানুষও মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসা পেতে পারে।

সেই ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। হাজারো চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর কর্মস্থল হয়েছে। লাখো মানুষ এখানে চিকিৎসা নিয়েছে। অসংখ্য মা সন্তান জন্ম দিয়েছেন, অসংখ্য রোগী নতুন জীবন পেয়েছেন।

আমি শুরুতেই প্রচারণার কথা বলেছিলাম।

হ্যাঁ, আদ-দ্বীনও প্রচারণা করে। তবে সেই প্রচারণা ব্যবসা বাড়ানোর জন্য নয়। গ্রামে গ্রামে মাইকিং করে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে অপারেশনের জন্য আহ্বান জানানো হয়। গাইনি, চক্ষু, প্রোস্টেটসহ বিভিন্ন ধরনের অপারেশন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়। শুধু অপারেশনই নয়, রোগীর থাকা-খাওয়া পর্যন্ত বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়।

ঢাকা থেকে অভিজ্ঞ সার্জনরা খুলনা আদ দ্বীনে গিয়ে অপারেশন করেন। আমিও একাধিকবার জটিল গাইনি অপারেশন করেছি। নিজের চোখে দেখেছি—রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে অনেক সময় সবার জন্য বেডের ব্যবস্থাও করা যায় না।

আজ আদ-দ্বীনকে মানুষ এক নামে চেনে। চাইলে প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের মতো অপারেশন ফি, ভর্তি ফি, ভিজিট ফি, প্যাথলজি খরচ কিংবা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক সেবা নামমাত্র মূল্যে দেওয়া হচ্ছে।

কারণ এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সেবার ওপর, ব্যবসার ওপর নয়।

আমি এখানে আদ-দ্বীনের গুণকীর্তন করতে আসিনি। আমি শুধু সেই ইতিহাসের কিছু অংশ তুলে ধরলাম, যা অনেকেই হয়তো জানেন না বা জানতে চান না।

এবার আসি বর্তমান প্রসঙ্গে।

ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু—এটি নিঃসন্দেহে একটি হৃদয়বিদারক, বেদনাদায়ক এবং মর্মান্তিক ঘটনা। কোনো ভাষাই সন্তান হারানো বাবা-মায়ের কষ্টকে প্রকাশ করতে পারে না। কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো ব্যাখ্যা, কোনো তদন্ত সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।

এই নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যু নিয়ে অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হতে হবে। যদি কারও অবহেলা, গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে শাস্তি, জরিমানা এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও উঠছে।

একটি দুর্ঘটনার কারণে কি একটি সম্পূর্ণ হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া উচিত?

তদন্তে মূলত দুটি বিষয় সামনে এসেছে—

১. ছয় নবজাতকের মৃত্যু

২. অবকাঠামোগত ত্রুটি

এর মধ্যে প্রথমটির ক্ষতি অপূরণীয়। কোনো শক্তিই সেই ছয়টি প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

কিন্তু দ্বিতীয়টি—অবকাঠামোগত ত্রুটি—সংশোধনযোগ্য। নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে, প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করে, নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

তাহলে প্রশ্ন হলো, সংশোধনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন কেন?

একটি প্রতিষ্ঠানে যদি ত্রুটি থাকে, তবে সেই ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বিবেচনা করতে হবে যে, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই হাসপাতালের সেবার ওপর নির্ভরশীল।

যে প্রতিষ্ঠান চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব বহন করেছে, অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, তাদের জন্য আশ্রয়স্থল হয়েছে—সেই প্রতিষ্ঠানকে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়াই কি একমাত্র সমাধান? সাধারণ জনগণ, নীতিনির্ধারক এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তাই আমার প্রশ্ন—

আমরা কি সমস্যার সমাধান চাই, নাকি একটি প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ীভাবে থামিয়ে দিতে চাই?

আর যদি সমাধানই লক্ষ্য হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো বাস্তবতা বা উদ্দেশ্য আছে কি না, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।

প্রশ্নটি তাই এখনও রয়ে গেছে—

এটি কি শুধুই একটি দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়া, নাকি অন্য কিছুর আলামত?