বৃহস্পতিবার,

১১ জুন ২০২৬

|

জ্যৈষ্ঠ ২৭ ১৪৩৩

XFilesBd

ব্যাংক রান: আর্থিক আস্থার সংকট ও বিপদের সমীকরণ

আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশিত: ০১:৩৩, ১১ জুন ২০২৬

আপডেট: ০১:৪২, ১১ জুন ২০২৬

ব্যাংক রান: আর্থিক আস্থার সংকট ও বিপদের সমীকরণ

 ব্যাংক রান: আর্থিক আস্থার সংকট ও বিপদের সমীকরণ

 - আব্দুর রাজ্জাক (সি,এ,এম,এস,) এফ এ, ভিপি

ব্যাংকে টাকা জমা রাখার পেছনে মানুষের প্রধান ভরসা একটিই—প্রয়োজনে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে। কিন্তু যখন কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধে এবং বিপুলসংখ্যক আমানতকারী আতঙ্কিত হয়ে একই সময়ে টাকা তুলতে ভিড় জমান, তখন অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ব্যাংক রান’। এটি কেবল একটি ব্যাংকের সংকট নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং ইতিহাসের বহু আর্থিক বিপর্যয়ের পেছনে এই আস্থাহীনতাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। সহজ ভাষায়, আমানতকারীরা যখন মনে করেন যে তাদের জমানো অর্থ আর নিরাপদ নেই, তখন তারা দ্রুত টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। মজার বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে দুর্বল না হলেও গুজব বা আতঙ্কের কারণে এই সংকটের সৃষ্টি হয়, যা বাস্তব সংকটের চেয়ে অনেক বেশি মানসিক।

ব্যাংক রানের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যেমন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, বড় ধরনের লোকসান, কিংবা মূলধন ঘাটতির খবর। তবে বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে গুজব অনেক দ্রুত ছড়ায়, যা মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা দ্রুত কমে যায়। আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ফলে এখন মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোটি কোটি টাকা স্থানান্তর করা সম্ভব, যা ব্যাংক রানকে আরও দ্রুত ও ব্যাপক করে তুলেছে। আগে যেখানে ব্যাংকের সামনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য দেখা যেত, এখন সেখানে ডিজিটাল লেনদেনের হিড়িকই বিপদ সংকেত হিসেবে কাজ করে।

অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে, ব্যাংকে রাখা সব অর্থ ভল্টে সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকগুলো আমানতের সামান্য অংশ রিজার্ভ হিসেবে রেখে বাকি অর্থ বিনিয়োগ ও ঋণ হিসেবে বিতরণ করে, যাকে বলা হয় ‘ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং’। ফলে হঠাৎ সবাই টাকা তুলে নিতে চাইলে ব্যাংকের পক্ষে তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এমনকি ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ বেশি থাকলেও নগদের অভাবে সাময়িক তারল্য সংকট দেখা দেয়। ব্যাংক রান একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে সীমাবদ্ধ থাকলে তাকে সাধারণ ব্যাংক রান বলা হয়, কিন্তু যখন সেই আতঙ্ক পুরো ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে ‘ব্যাংক প্যানিক’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯২৯ সালের মহামন্দা থেকে শুরু করে ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যের নর্দার্ন রক কিংবা ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পতন—সবই ছিল ব্যাংক রানের ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণ। বাংলাদেশেও তাত্ত্বিকভাবে এমন ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি, আমানত বিমা ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো কার্যকর পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। পরিশেষে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি কিন্তু টাকা নয়, বরং আস্থা। একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আমানতকারীরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে সেটি গুরুতর সংকটের মুখে পড়ে। তাই অর্থনীতিবিদদের সেই বহুল উদ্ধৃত কথাটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক—ব্যাংকের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার নগদ অর্থ নয়, বরং আমানতকারীদের অগাধ বিশ্বাস।