দেশে মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ কমার কোনো ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা) এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ও হামের জটিল উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত চার মাসের সামান্য বেশি সময়ে দেশে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯৭ জনে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ হামবিষয়ক তথ্য ও বিশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এ আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অল্প সময়ে শিশু মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান দেশের সার্বিক টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ এবং রোগ নজরদারির (ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স) দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।

২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, ২৬ দিনে ৯৫ প্রাণহানি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শেষ ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে সিলেট বিভাগে দুইজন, রাজশাহী বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন রয়েছে।
এর আগে গত ২৬ জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা ছিল ৭০২ জন। অর্থাৎ, এরপরের মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে এই ভাইরাসে নতুন করে আরও ৯৫ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা নির্দেশ করছে যে, মাঠপর্যায়ে সংক্রমণের তীব্রতা এখনো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি বা চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ৮ জন শিশু। হাসপাতালে আসা এসব শিশুর নমুনা পরীক্ষা করে ১৩০ জনের শরীরে সরাসরি হামের ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এদিকে, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ২১ জুলাই পর্যন্ত চার মাসের বেশি সময়ে সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৬ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে ১৪ হাজার ৭০৮ জনের শরীরে হামের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা গেছে।

হামের লক্ষণ নিয়ে আসা শিশুদের জন্য বিশেষায়িত আইসোলেশন ও সাধারণ ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত চার মাসে মোট ১ লাখ ২ হাজার ২৪৪ জন শিশু উপসর্গ নিয়ে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যে জটিলতা কাটিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৮ হাজার ৪১১ জন। তবে বিশাল সংখ্যক শিশু সুস্থ হয়ে ফিরলেও, আক্রান্তের মোট সংখ্যার তুলনায় শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার পরিধি পর্যাপ্ত কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই সঠিক সময়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না আসা এবং নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা তীব্র পুষ্টিহীনতার মতো আনুষঙ্গিক জটিলতায় ভোগায় মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
সাধারণত হাম একটি কার্যকর ও সহজলভ্য টিকার (এমআর ভ্যাকসিন) মাধ্যমে শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ দেশে চার মাসের ব্যবধানে প্রায় আটশত শিশুর মৃত্যু এবং পৌনে দেড় লাখের কাছাকাছি শিশুর উপসর্গ দেখা দেওয়া মাঠপর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। করোনাত্তোর সময়ে শিশুদের নিয়মিত রুটিন টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যাওয়া (ড্রপ-আউট) এবং দুর্গম বা প্রান্তিক এলাকায় সঠিক সময়ে বুস্টার ডোজ না পৌঁছানোকে এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অবিলম্বে মহামারী উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন (এমআর সিএ) পরিচালনা করা, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও আইসোলেশন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি বাড়িভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায়, বর্ষাকালীন আনুষঙ্গিক অন্যান্য রোগের প্রভাবে শিশু মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান আরও দীর্ঘ হতে পারে।
