মানুষের জীবন সীমিত। কিন্তু মহৎ কর্মের আয়ু অসীম। চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক অসম্ভব সুন্দর স্বপ্নকে সঙ্গী করে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হলো নতুন দিগন্ত। শোকের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এক মানবিক ভালোবাসার আলো ছড়াতে যাচ্ছে দেশজুড়ে। ঢাকার মিরপুরস্থ বিআইএইচএস হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এক আবেগঘন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল ‘নিলুফার খানম এ্যানী ফ্রি মোবাইল হার্ট অ্যান্ড হেলথ হাসপাতাল’।

প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এবং তাঁর আজীবনের মানবসেবার ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখতে কুষ্টিয়া ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান লাল্টু নিয়েছেন এই অভূতপূর্ব উদ্যোগ। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (BADAS) এর সহযোগিতায় এবং নিলুফার খানম এ্যানী ফাউন্ডেশনের সার্বিক পরিচালনায় অত্যাধুনিক মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা বাসটি আনুষ্ঠানিকভাবে কুষ্টিয়া ডায়াবেটিস সমিতির কাছে হস্তান্তর হয়েছে গত ১০ জুলাই, শুক্রবার।

চাকার ওপর হাসপাতাল:
প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা যদি ধরি তাহলে এটি কেবল একটি বাস নয়, চাকার ওপর গড়ে ওঠা লাইফ-সাপোর্ট ও অত্যাধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র। শহরের বড় বড় হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা এবার বাসে চড়ে পৌঁছে যাবে গ্রাম-বাংলার এ প্রান্ত হতে ওপ্রান্তে। দুর্গম চরের গরিব, দুস্থ ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় ভ্রাম্যমাণ এ হাসপাতাল যারপরনাই পরম প্রাপ্তি হিসেবে উপস্থিত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রয়াত নিলুফার খানম এ্যানীর স্বামী বিশিষ্ট সমাজসেবী মতিউর রহমান লালটু ।

বিশেষ করে হৃদরোগ (Heart Disease), কিডনি রোগ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের (NCDs) প্রাথমিক স্ক্রিনিং, ইসিজি (ECG), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় রেফারেল এবং স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে এই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের মাধ্যমে। খুব শিগগিরই কুষ্টিয়া জেলা থেকে এই ফ্রি মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক মাঠপর্যায়ের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন যুগের পথিকৃৎ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মহতি এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ. কে. আজাদ খান। তিনি বলেন, পৃথিবীর স্বাস্থ্যসেবা যে লাইনে যাচ্ছে, সেই হিসেবে এই উদ্যোগটি পথিকৃৎ হয়ে থাকবে। এটি সত্যিই একটি যুগান্তকারী কাজ। এখন স্বাস্থ্যসেবা অনলাইনেও দেওয়া সম্ভব। এই বাসটি যদি ইন্টারনেট কানেক্টেড থাকে, তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীর বাড়ির কাছে গিয়েও ঢাকার অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগীকে অনায়াসে দেখতে পারবেন ও পরামর্শ দিতে পারবেন।

কুষ্টিয়া ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি ও প্রয়াত এ্যানীর স্বামী মতিউর রহমান লাল্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ প্রয়াত এ্যানীর বহুমাত্রিক গুণের কথা স্মরণ করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ও বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা, বিএনপি নেত্রী সালিমা তালুকদার আরনি, বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. ফজলুর রহমান, এশিয়ান কম্পিউটিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ এইচ কাফি এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক ও সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন।

এছাড়াও ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আব্দুল খালেক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ফায়েকুজ্জামান এবং এয়ার কমোডর (অব.) মঈন। অনুষ্ঠানে মায়ের স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে আবেতাড়িত হন প্রয়াত এ্যানীর সন্তান লায়লা জাহান ও তানভীর রহমান। পুত্রবধূ নাঈমা তানভীর রহমান প্রয়াত এ্যানীর সমাজকর্ম, মানবিক গুণ ও দরিদ্রের প্রতি সহনশীলতা তুলে ধরেন।

উপস্থিত অন্যরা বলেন, এই আশা-ভালোবাসার প্রয়াস সফল হোক। পৃথিবীর মায়া থেকে বিদায়ের পরও নিলুফার খানম এ্যানী মানুষের মাঝে চিরায়ত-জাগ্রত। তাঁর সামাজিক অবদানের কারণেই তিনি আত্মায় গেঁথে আছেন। তিনি আজ হাজারো মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে ফিরে এসেছেন।
সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে মতিউর রহমান লাল্টু বলেন, “আমাদের এই উদ্যোগের পেছনে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি। আমি আশা করি, ভবিষ্যতেও তাদের এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সবার সহায়তায় আমরা এই উদ্যোগকে সফল করতে চাই।”

তিনি বলেন, নিলুফার খানম এ্যানী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর নামের এই চাকাগুলো যখন দেশের মেঠোপথ ধরে কোনো অসুস্থ মানুষের দোরগোড়ায় পরম স্বস্তি নিয়ে হাজির হয়।
উপস্থিত অন্যরা আশা করেন, এ্যানীর শোক শক্তিতে রূপান্তর করার এই দুর্দান্ত মানবিক গল্পটি আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

