রোববার,

১৯ জুলাই ২০২৬

|

শ্রাবণ ৩ ১৪৩৩

XFilesBd

আকাশ ধরার প্রত্যয় জিএম কামরুল ইসলামের

আঞ্চলিক আকাশ পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে: ইউরোপ-আমেরিকার আকাশে ডানা মেলার প্রস্তুতি ইউএস-বাংলার

ড. অখিল পোদ্দার

প্রকাশিত: ০১:৫৩, ১৯ জুলাই ২০২৬

আঞ্চলিক আকাশ পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে: ইউরোপ-আমেরিকার আকাশে ডানা মেলার প্রস্তুতি ইউএস-বাংলার

দেখতে দেখতে যুগ পূর্ণ করল দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। এক যুগে পা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন ডানা মেলতে চায় এভিয়েশনের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতাপূর্ণ আকাশপথইউরোপ আমেরিকায়। বৈশ্বিক আকাশপথ জয়ের এমন উচ্চাভিলাষকে স্বপ্ন মনে করলেও অল্প দিনেই তা বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করেন প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম।

২০১৪ সালের ১৭ জুলাই দুটি ড্যাশ- কিউ৪০০ উড়োজাহাজ নিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রা শুরু করেছিল ইউএস-বাংলা। সময়ের পরিক্রমায় আজ তারা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডানা মেলেছে। এক যুগে এসে তাদের বহরে যুক্ত হয়েছে আধুনিক বোয়িং ৭৩৭-৮০০, এটিআর ৭২-৬০০ এবং দূরপাল্লার এয়ারবাস ৩৩০-৩০০ এর মতো বড় উড়োজাহাজ। এই ধারাবাহিকতাই তাদের আত্মবিশ্বাসকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা এখন বোয়িং দিয়ে সরাসরি ইউরোপ আমেরিকার আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখছে।

তবে ইউরোপ-আমেরিকায় ফ্লাইট পরিচালনার স্বপ্ন শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতের নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপের আকাশসীমায় (ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ) ফ্লাইট চালাতে হলে থার্ড কান্ট্রি অপারেটর (TCO) অনুমোদন এবং কঠোর নিরাপত্তা পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। অন্যদিকে, আমেরিকার ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (FAA) নিয়ম আরও কঠোর। মার্কিন মুলুকে সরাসরি ফ্লাইট চালাতে হলে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) ক্যাটাগরি- মর্যাদা অর্জন করতে হবে। ইউএস-বাংলা এই আইনি কারিগরি চ্যালেঞ্জগুলো জেনেই তাদের প্রস্তুতি সাজাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (IATA) পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করেছে এবং নিয়মিতআসা’ (IOSA) নিরাপত্তা অডিট সফলভাবে সম্পন্ন করছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউরোপ আমেরিকার রুটে বোয়িং চালানোর এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ইউএস-বাংলা তাদের বহর সম্প্রসারণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। দূরপাল্লার রুটের জন্য তারা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বা এয়ারবাস ৩৫০-এর মতো অত্যাধুনিক জ্বালানি সাশ্রয়ী ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের যুক্তরাজ্য (লন্ডন), ইতালি (রোম) এবং আমেরিকার নিউইয়র্কের মতো গন্তব্যগুলো তাদের রাডারে রয়েছে, যেখানে বিশাল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করেন। এই রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা গেলে দেশের প্রবাসীরা যেমন ট্রানজিটের ভোগান্তি থেকে বাঁচবেন, তেমনি দেশের টাকা দেশেই থাকবে।

অবশ্য এই স্বপ্ন পূরণের পথে তীব্র প্রতিযোগিতাও একটি বড় ফ্যাক্টর। ইউরোপ-আমেরিকার রুটে মধ্যপ্রাচ্যের নামী-দামী বিমান সংস্থাগুলোর সাথে ইউএস-বাংলাকে প্রতিযোগিতা করতে হবে। তা ছাড়া, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও এই রুটগুলোতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই বাজারে টিকতে হলে ইউএস-বাংলাকে শুধু উড়োজাহাজ চালালেই হবে না, বরং আন্তর্জাতিক মানের অন-বোর্ড সেবা, নিয়মানুবর্তিতা এবং প্রতিযোগিতামূলক ভাড়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এ ব্যাপারে জিএম কামরুল ইসলাম অবশ্য নিজের প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হতে চান। সুতরাং সেবা ও মান নিয়ে তিনি বরাবরের মতোই আশাবাদী।

১২ বছরের যাত্রায় ইউএস-বাংলা প্রমাণ করেছে যে তারা দেশীয় বাজারে এবং আঞ্চলিক রুটে সফল। অভ্যন্তরীণ রুটের ছোট বিমান থেকে শুরু করে আজ আন্তর্জাতিক রুটের বড় বড় বোয়িং এয়ারবাস পরিচালনার যে অভিজ্ঞতা তারা সঞ্চয় করেছে, সেটাই তাদের ইউরোপ-আমেরিকা জয়ের মূল জ্বালানি। চ্যালেঞ্জ অনেক, কিন্তু সঠিক কৌশল, বৈশ্বিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের শতভাগ বাস্তবায়ন এবং বহরে সঠিক দূরপাল্লার বোয়িং বা এয়ারবাস যুক্ত করতে পারলে ইউএস-বাংলার এই এক যুগের স্বপ্ন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাস্তব রূপ নেওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের এক যুগ পূর্তি এবং ইউরোপ-আমেরিকার আকাশে ওড়ার স্বপ্ন নিয়ে এক্সফাইলস পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. কামরুল ইসলাম। যিনি বলেছেন-আমাদের লক্ষ্য এখন ইউরোপ-আমেরিকার আকাশ।

এক্সফাইলস: ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সফলতার ১২ বছর বা এক যুগ পূর্ণ করল। এই দীর্ঘ যাত্রার মূল চালিকাশক্তি কী ছিল?

মো. কামরুল ইসলাম: আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের সম্মানিত যাত্রীসাধারণের আস্থা, নিয়মানুবর্তিতা (অন-টাইম পারফরম্যান্স) এবং সেবার সর্বোচ্চ মান। ২০১৪ সালে মাত্র দুটি উড়োজাহাজ নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। আজ আমাদের বহরে অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক রুট মিলিয়ে ২৪টিরও বেশি আধুনিক উড়োজাহাজ রয়েছে। আমরা সবসময় যাত্রীদের নিরাপত্তা আরামদায়ক ভ্রমণকে অগ্রাধিকার দিয়েছি, যা আমাদের দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইনসে পরিণত করেছে।

এক্সফাইলস: আপনাদের এক যুগ পূর্তিতে একটি বড় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, ইউএস-বাংলা এখন বোয়িং নিয়ে ইউরোপ আমেরিকার আকাশে ডানা মেলতে চায়। এই স্বপ্নের পেছনে আপনাদের মূল পরিকল্পনা কী?

মো. কামরুল ইসলাম: এটি কেবল গুঞ্জন নয়, এটি আমাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। আমরা পর্যায়ক্রমে আমাদের বহর এবং রুটের পরিধি বাড়াচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্য এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালনার পর আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট, বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকা। এই রুটে প্রচুর বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, যারা সরাসরি ফ্লাইটে যাতায়াত করতে চান। আমরা তাদের সেই চাহিদা পূরণ করতে চাই।

এক্সফাইলস: ইউরোপ-আমেরিকার রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিশেষ ধরনের বোয়িং বা এয়ারবাসের মতো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের প্রয়োজন হয়। বিষয়ে আপনাদের প্রস্তুতি কেমন?

মো. কামরুল ইসলাম: দূরপাল্লার রুটে সরাসরি ফ্লাইটের জন্য আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের বহরে এয়ারবাস ৩৩০-৩০০ এর মতো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ যুক্ত করেছি। ইউরোপ আমেরিকার রুটের জন্য আমরা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বা সমমানের অত্যাধুনিক জ্বালানি সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছি। একটি আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইনস হিসেবে আমাদের সক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে এবং সঠিক সময়ে সঠিক উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হবে।

এক্সফাইলস: আমেরিকার এফএএ (FAA) বা ইউরোপের টিসিও (TCO) এর মতো কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড আইনি চ্যালেঞ্জগুলো আপনারা কীভাবে মোকাবেলা করছেন?

মো. কামরুল ইসলাম: আমরা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (IATA) পূর্ণাঙ্গ সদস্য। আমরা নিয়মিত আইওএসএ (IOSA) নিরাপত্তা অডিট সফলভাবে সম্পন্ন করছি। ইউরোপ-আমেরিকায় ফ্লাইট চালুর ক্ষেত্রে কিছু কারিগরি রাষ্ট্রীয় নীতিমালার বিষয় থাকে। যেমনআমেরিকার ক্ষেত্রে আমাদের সিভিল এভিয়েশনকে (বেবিচক) ক্যাটাগরি- অর্জন করতে হবে। সরকারি পর্যায়ে এই প্রক্রিয়াগুলো চলমান রয়েছে। ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব ধরনের কারিগরি আইনি প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

এক্সফাইলস: বৈশ্বিক বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় এয়ারলাইনসের সাথে প্রতিযোগিতা করে ইউএস-বাংলা কীভাবে টিকবে বলে আপনি মনে করেন?

মো. কামরুল ইসলাম: প্রতিযোগিতা সবসময়ই থাকবে, তবে আমাদের বড় সুবিধা হলো আমরা প্রবাসীদের সরাসরি কানেক্টিভিটি দিতে পারব। কোনো ট্রানজিট ছাড়াই কম সময়ে তারা দেশে ফিরতে পারবেন। এর পাশাপাশি, আমাদের অন-বোর্ড আতিথেয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক ভাড়ার কারণে আমরা বিশ্বাস করি যাত্রীরা ইউএস-বাংলাকেই বেছে নেবেন। এক যুগের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বেসরকারি বিমান সংস্থা হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।