শনিবার,

২৫ জুলাই ২০২৬

|

শ্রাবণ ৯ ১৪৩৩

XFilesBd

সভ্যতার নিকট যাত্রা

তারিফ হোসেন

প্রকাশিত: ০২:১৫, ২৫ জুলাই ২০২৬

সভ্যতার নিকট যাত্রা

সভ্যতার নিকট যাত্রা

তারিফ হোসেন

সভ্যতাকে সাধারণত নগর, রাষ্ট্র, স্থাপত্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সভ্যতার একটি গভীরতর পাঠও সম্ভব—যেখানে সভ্যতা কেবল মানুষের বাহ্যিক জীবনব্যবস্থা নয়; বরং অস্তিত্বের নিজের মধ্যে ক্রমাগত পরিশীলন, সংস্কার, সমন্বয় ও আত্ম-অতিক্রমণের একটি ontological process।
এই অন্তর্গত যাত্রাকে নিম্নলিখিত সূত্রে প্রকাশ করা যায়।

আকার → সংস্কার → সংস্কৃত → সংস্কৃতি → সভ্যতা → পরম → নব-আকার

আকার 
অস্তিত্বের প্রথম প্রকাশ। বস্তু, শরীর, ঘর, নগর, ভাষা, শিল্প, স্থাপত্য কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠান—সবকিছুই কোনো না কোনো আকারের মধ্যে প্রকাশিত হয়। মানুষ প্রথমে তার জীবনকে আকার দেয়; কিন্তু সব আকার সুন্দর বা সুসংগঠিত নয়। তাই প্রয়োজন হয় সংস্কারের।

সংস্কার 

রূপের পরিশীলন,অমসৃণকে মসৃণ করা, বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় আনা,অশোভনকে শোভন করা এবং বিচ্ছিন্নতাকে
সামঞ্জস্যের মধ্যে নিয়ে আসা। অর্থাৎ আকার হলো রূপ, আর সংস্কার হলো সেই রূপের পরিশীলন।

সংস্কৃত 

সংস্কারের ফলিত অবস্থা যা পরিশীলিত, পরিমার্জিত, সুগঠিত ও সম্যক্-কৃত। কিন্তু পরিশীলন যদি স্থির অর্জন হয়ে থাকে, তবে তা আবার জীর্ণ হতে পারে। তাই সংস্কৃতকে জীবন্ত রাখতে প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রবাহের। সেখানেই জন্ম নেয় সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি 

সংস্কৃতকে জীবন্ত রাখার প্রবাহ—a living process of refinement। যেখানে সৌন্দর্য শুধু শিল্পকর্মে নয়, তা জীবনযাপনে প্রবাহিত হয়; জ্ঞান শুধু তথ্য নয়, সেটা জীবনকে পরিচালনা করে; নৈতিকতা শুধু নিয়ম নয়, চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে—সেখানেই সংস্কৃতির জন্ম।সংস্কৃতি যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সীমা অতিক্রম করে বহু মানুষ, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞানপ্রণালি, শিল্প ও জীবনধারাকে বৃহত্তর সামঞ্জস্যের মধ্যে যুক্ত করে, তখন জন্ম নেয় সভ্যতা।

সভ্যতা 

এটা কেবল রাষ্ট্র নয়।রাষ্ট্র ক্ষমতাকে সংগঠিত করে; সভ্যতা জীবনকে সমন্বিত করে।রাষ্ট্রের ঐক্য রাজনৈতিক; সভ্যতার ঐক্য সাংস্কৃতিক।রাষ্ট্রের কেন্দ্রে থাকে ক্ষমতা; সভ্যতার কেন্দ্রে থাকে সমন্বয়।একটি সভ্যতা একাধিক রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করতে পারে; আবার একটি রাষ্ট্রের পতনের পরও তার সভ্যতাগত চেতনা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে।কিন্তু সভ্যতার যাত্রা এখানেও শেষ নয়। সভ্যতা যতই পরিশীলিত ও সমন্বিত হোক, একসময় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এই সমগ্রতার অন্তর্গত ঐক্য কোথায়?
যখন ব্যক্তি নিজেকে কেবল সামাজিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং চেতনসত্তা হিসেবে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন সভ্যতার গতি ইন্দ্রিয় থেকে অতীন্দ্রিয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। 

এখানে পরম কোনো দূরবর্তী স্থান নয়; বরং সমগ্রতার চূড়ান্ত ontological horizon।অতীন্দ্রিয়তা ইন্দ্রিয়-বিরোধী নয়। বরং সংস্কৃত ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়েই অতীন্দ্রিয়তার দিকে পথ উন্মুক্ত হয়। ইন্দ্রিয়কে ধ্বংস করা নয়, তাকে সংস্কৃত করাই এখানে অগ্রগতির পথ।তবে পরম কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়। পরম থেকে আবার জন্ম নেয় নব-আকার।পরমের স্পর্শে চেতনা নতুন জীবন, নতুন শিল্প, নতুন জ্ঞান, নতুন নৈতিকতা ও নতুন সামাজিক রূপের জন্ম দেয়। ফলে পরম সৃষ্টির সমাপ্তি নয়; বরং নবসৃষ্টির অন্তর্গত উৎস।এভাবেই চক্রটি আবার শুরু হয়

পরম → নব-আকার → নতুন সংস্কার → নতুন সংস্কৃত → নতুন সংস্কৃতি → নতুন সভ্যতা → পুনরায় পরম এটি একটি স্ব-নবায়নশীল সভ্যতা-চক্র (self-renewing civilizational cycle)।
সংক্ষেপে
আকার — অস্তিত্বের প্রকাশ।
সংস্কার — প্রকাশের পরিশীলন।
সংস্কৃত — পরিশীলিত প্রকাশ।
সংস্কৃতি — পরিশীলনের জীবন্ত প্রবাহ।
সভ্যতা — সেই প্রবাহের সমন্বিত সমষ্টি।
পরম — সেই সমগ্রতার অতীন্দ্রিয় অর্থ।
নব-আকার — পরম থেকে নতুন সৃষ্টির পুনরাবির্ভাব।

এই দৃষ্টিতে সভ্যতার ইতিহাস কেবল অরণ্য থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে নগর, নগর থেকে রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্র থেকে সাম্রাজ্যের ইতিহাস নয়। সভ্যতার একটি গভীরতর অন্তর্গত ইতিহাসও রয়েছে।আকার থেকে পরিশীলন,পরিশীলন থেকে সংস্কৃতি,সংস্কৃতি থেকে সমন্বয়,সমন্বয় থেকে সমগ্রতা,সমগ্রতা থেকে অতীন্দ্রিয়তা,এবং অতীন্দ্রিয়তা থেকে পুনঃসৃষ্টি।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়

আকার হলো অস্তিত্বের প্রথম উচ্চারণ।
সংস্কার হলো সেই উচ্চারণের সুন্দরায়ন।
সংস্কৃত হলো তার পরিশীলিত রূপ।
সংস্কৃতি হলো সেই পরিশীলনের প্রবাহ।
সভ্যতা হলো সেই প্রবাহের সমগ্র সংগীত।
পরম হলো সেই সংগীতের নীরব উৎস।
আর নব-আকার হলো সেই নীরব উৎস থেকে পুনরায় জন্ম নেওয়া নতুন সৃষ্টির প্রথম শব্দ।
 লেখক: তারিফ হোসেন বিশিষ্ট িকথাকার  ও শিল্পী