পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে কোটি টাকা মূল্যের পৈতৃক ও বায়া সম্পত্তি গ্রাস করতে জাল দলিল ও গায়েবি নথিপত্র তৈরির এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে। এলাকার নিরীহ বাসিন্দা রুহুল আমিনের ৬ একরের বেশি জমি জাল দলিল এবং মিউটেশন রেকর্ড করে নিজেদের নামে বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দুই সহোদর আবদুল বারেক সিকদার ও আঃ খালেক সিকদারের বিরুদ্ধে। সিআইডির (CID) দীর্ঘ ও নিবিড় দালিলিক অনুসন্ধানে এই অভিনব ও অবিশ্বাস্য জালিয়াতির পুরো আদ্যোপান্ত বেরিয়ে এসেছে। এই জালিয়াতির মূল হোতা বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হলেন উপজেলার ছৈলাবুনিয়া গ্রামের মৃত ইসমাইল সিকদারের মেজ পুত্র মো. আবদুল বারেক সিকদার (৫২)। সিআইডি পটুয়াখালী জেলার পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) বিপ্লব মিস্ত্রীর দাখিল করা চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বারেক সিকদারসহ তাঁর ৫ ভাই-বোনের বিরুদ্ধে আনীত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৫০৬(ii) ও ১১৪ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য ও প্রমাণিত হয়েছে। সিআইডি ঢাকা সদর দপ্তরও এই প্রতিবেদনের সাথে একমত পোষণ করে বিজ্ঞ আদালতে দাখিলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে।

আদালত ও সিআইডি সূত্র জানায়, মির্জাগঞ্জ থানাধীন ছৈলাবুনিয়া মৌজার নিজ জমি রক্ষা করতে মোঃ রুহুল আমিন বাদী হয়ে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা (নং-১১১/২০২৫) দায়ের করেন। মামলার বিবাদীরা হলেন—আবদুল বারেক সিকদার, মোঃ আঃ খালেক সিকদার, আবদুল কুদ্দুস সিকদার, রোকেয়া বেগম, আলেয়া বেগম ও মোসাঃ রেহেনা। আদালত মামলার সত্যতা নিরূপণে প্রথমে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রার দিগ্বিজয় গাইনকে দায়িত্ব দেন এবং পরবর্তীতে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য বিশেষায়িত সংস্থা সিআইডিতে ন্যস্ত করেন।
তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডি কর্মকর্তা বিপ্লব মিস্ত্রী অনুসন্ধানের স্বার্থে বরগুনার আমতলী আদালতের একটি মামলার নথি থেকে ১৯৬৩ সালের খেপুপাড়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মূল ‘থাম বহি’ (ভলিউম নং-০২/১৯৬৩) সংগ্রহ করেন। বিবাদী বারেক সিকদার দাবি করেছিলেন, ১৯৬৩ সালের ১৮ এপ্রিলের ৮৮৩ নং দলিলের মাধ্যমে তাঁর বাবা ইসমাইল সিকদার এই জমির মালিক হন। কিন্তু সিআইডি যখন মূল থাম বহির ৮৩ নম্বর পৃষ্ঠা যাচাই করে, তখন দেখা যায়—১৯৬৩ সালের ৩ এপ্রিলের আসল ৮৮৩ নম্বর দলিলের দাতা ছিলেন 'মেসের আলী মোল্লা'। অথচ বারেক সিকদার সিআইডি তদন্ত টিমের কাছে যে দলিল জমা দিয়েছিলেন, তাতে দাতা হিসেবে উল্লেখ ছিল বন্দে আলী, মফেজ, সহরভানু বিবি ও রহমজানদের নাম। অর্থাৎ বারেকের দেওয়া দলিলের সঙ্গে সরকারি মূল নথির কোনো মিল পাওয়া যায়নি। বারেক দাবি করেছিলেন ১৯৬৫ সালের প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসে রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বহি বিনষ্ট হয়ে গেছে; আর সেই সুযোগ নিয়েই এই জাল সইমোহর ও ভূয়া দলিল তৈরি করা হয়েছিল।
তদন্তে জালিয়াতির একাধিক সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। ১৯৬৩ সালের ১৮ এপ্রিল ৮৮৩ নং দলিলের তিন জায়গায় তিন রকম জমির হিসাব পাওয়া গেছে। প্রথম পাতায় জমির পরিমাণ ৬ একর ৭৫ শতাংশ, শেষভাগে তফসিলে ৭ একর ২১ শতাংশ, আর ভেতরে দাতাদের জমির হিস্যা যোগ করে দেখা যায় ৯ একর ৭১ শতাংশ জমি দলিল করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, দলিলের প্রথম পৃষ্ঠায় দাতার ক্রমিক নম্বর ৫-এর পর সরাসরি বসানো হয়েছে ৮—মাঝখান থেকে ৬ ও ৭ নম্বর ক্রমিকের কোনো দাতার নামই ছিল না। নিচে দাতার নাম ৯ জন উল্লেখ থাকলেও সই ও টিপসই নেওয়া হয়েছিল ১০ জনের।
এছাড়া বারেক কর্তৃক নামজারি (মিউটেশন) অফিসে জমা দেওয়া দলিলের লেখার সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া দলিলের লেখার স্পষ্ট অমিল পাওয়া যায়। তদন্তে আরও দেখা যায়, বারেকের পিতা ইসমাইল সিকদার ১৯৬৩ সালে যে জমি কেনা সম্পতি দাবি করছেন, পরবর্তীতে একই জমি ১৯৮০ সালে বেতাগী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে, ২০০২ সালে এবং ২০০৫ সালে মির্জাগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ভিন্ন ভিন্ন দলিলে পুনরায় কেনেন। নিজের কেনা জমিই বারবার সন্তানদের নামে কেনা প্রমাণ করে যে ১৯৬৩ সালের ৮৮৩ নং দলিলটি সম্পূর্ণ ভূয়া ও জাল। এমনকি এই ভূয়া দলিলের ওপর ভিত্তি করে দায়ের করা দেওয়ানি অগ্রক্রয় মামলাও (নং-০২/২০০৩ ও ১৪৮/২০২৩) আদালত খারিজ করে দেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই জালিয়াত চক্রের লোভের হাত থেকে রেহাই পায়নি বারেকের নিজের আপন ভাইয়েরাও। বারেকের আপন বড় ভাই আব্দুল রব দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে হাড়ভাঙা খাটুনির কোটি কোটি টাকা দেশে মেজ ভাই বারেকের কাছে পাঠিয়েছিলেন নিজের নামে জমি কেনার জন্য। কিন্তু বারেক সেই টাকা আত্মসাৎ করে নিজের নামে সুবিদখালী এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরে আলিশান সম্পত্তি গড়ে তোলেন। প্রবাস থেকে ফিরে নিজের সারাজীবনের উপার্জিত টাকা ও জমির হিসাব চাইলে বারেক তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। বারেকের দেওয়া মানসিক আঘাতে ও জমি আত্মসাতের চরম শোকে একপর্যায়ে স্ট্রোক করে মারা যান আব্দুল রব। সিআইডির কাছে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে বারেকের এই নির্মমতার বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন খোদ প্রয়াত বড় ভাই আব্দুল রবের স্ত্রী মোসাঃ রাবেয়া বেগম।
সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখ সকাল ১০টায় মামলার বাদী ও সাক্ষীরা বারেক সিকদারের ঘরে গিয়ে জালিয়াতির কারণ জানতে চাইলে বারেক ও তাঁর ভাই খালেক সিকদার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, "জাল দলিল করেছি, জমাখারিজও করেছি। তুই জমি ছেড়ে দে, না হলে তোকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলব।" এই ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ ১৪ জন নিরপেক্ষ সাক্ষী সিআইডির কাছে সত্যতা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
সিআইডি ঢাকা সদর দপ্তর গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে বারেক সিকদারসহ ৬ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ধারা মোতাবেক প্রতিবেদন দাখিলের অনুমোদন দেয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মির্জাগঞ্জে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত তা আমলে নিয়ে জালিয়াত চক্রের ৬ জনের নামেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
মির্জাগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ গ্রেফতারি পরোয়ানার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পরোয়ানা হাতে পাওয়ার পর আসামিদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশি চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মামলার বাদী রুহুল আমিন ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই জালিয়াত চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
