কুষ্টিয়ার খোকসায় রাজনীতির খোলস পাল্টে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ চরমপন্থী বা সর্বহারাদের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। এলাকা জুড়ে এখন একক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে কুখ্যাত ‘রাজন বাহিনী’। চরাঞ্চল ও লোকালয়ে চাঁদাবাজি, জমি দখল, হুমকি এবং অস্ত্রবাজির মাধ্যমে চরম জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে এই সন্ত্রাসী চক্রটি। বিশেষ করে উপজেলার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন গভীর শঙ্কা ও চরম নিরাপত্তার অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। বিএনপি নেতা রাজু খান ইতোমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ায় রাজন বাহিনীর অত্যাচার, চাদাবাজি ও অস্ত্রমহড়া নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। উল্টো এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়কে রাজনের লোকজন নানাভাবে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খোকসা ও আশপাশের এলাকাগুলোতে রাজত্ব চালানো এই ‘রাজন বাহিনী’ মূলত সাবেক সর্বহারা ক্যাডারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ভাড়াটে সন্ত্রাসী দল। তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কেবল ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সাধারণ চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র ও ককটেল ব্যবহার করছে।
এই সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্মমতার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে খোকসা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নাফিজ আহম্মেদ রাজু খানের ওপর সাম্প্রতিক নারকীয় হামলায়। খোকসা থানাপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে মোটরসাইকেল থেকে নামামাত্রই রাজু খানের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাজু খানকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর ওপর এই তাণ্ডব চালায় রাজন বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা।
নৃশংসতার চরম রূপ দেখিয়ে রাজু খানকে প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় এবং হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর দুই হাত ও পায়ের একাধিক হাড় গুঁড়ো করে দেওয়া হয়। পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা চিৎকার করে এগিয়ে এলে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে এবং এলাকাকে আতঙ্কগ্রস্ত করতে সন্ত্রাসীরা অন্তত ১৬ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও একাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। গুরুতর আহত রাজু খান বর্তমানে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হামলা ও রাজু খানের জখমের কৌশল বিশ্লেষণ করে স্থানীয় সচেতন মহল নিশ্চিত, ঘটনাটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কোন্দল নয়; এটি সর্বহারাদের চিরচেনা ‘টার্গেট কিলিং’ ও পঙ্গু করে দেওয়ার বর্বরোচ্ছেদ রীতি। অভিযোগ রয়েছে, আগামী পৌরসভা নির্বাচনে রাজু খানের অবস্থান শক্ত হওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাজন বাহিনীকে ভাড়া করে এই নৃসংশ মিশন বাস্তবায়ন করিয়েছে।
রাজু খানের মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ওপর নিজ বাড়ির গেটে এমন ওপেন সিক্রেট হামলার পর সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের মুখে রয়েছেন খোকসার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা। স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, রাজন বাহিনী এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ওপর দীর্ঘ দিন ধরে নজরদারি ও চাঁদা দাবি করে আসছে। তাদের ভিটেমাটি দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদা নির্ধারণ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। রাজু খানের ঘটনার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভয়ে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না; অনেকে সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্থানীদের প্রধান ক্ষোভ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, রাজু খানের বাড়ির সামনে যখন রাজন বাহিনীর ক্যাডাররা ১০-১৫ মিনিট ধরে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন থানার খুব কাছে ঘটনা ঘটলেও পুলিশ পৌঁছাতে অনেক দেরি করে। পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তা বা ধীরগতির কারণে রাজন বাহিনী আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খোকসার সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, এখনই যদি রাজন বাহিনীকে চিহ্নিত করে তাদের অবৈধ অস্ত্রের উৎস ও আশ্রয়দাতাদের গ্রেফতার না করা হয়, তবে আশপাশের পুরো এলাকা আবার সেই ৯০-এর দশকের রক্তাক্ত চরমপন্থী যুগের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। হিন্দু সম্প্রদায়সহ সর্বস্তরের মানুষের নিরাপদ জীবনযাত্রার জন্য দ্রুত এই বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর ও চিরুনি অভিযান চালানোর আকুল দাবি উঠেছে।
