শুক্রবার,

০৭ আগস্ট ২০২৬

|

শ্রাবণ ২২ ১৪৩৩

XFilesBd

কুষ্টিয়ার খোকসায় রক্তের দাগ ও উগ্রপন্থার প্রচ্ছায়া: রাজু খানের ওপর হামলা কি সর্বহারার পুনরাবির্ভাব?

আবু সাহিদ, খোকসা থেকে ফিরে

প্রকাশিত: ০১:৩৭, ৭ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০৩:০৫, ৭ আগস্ট ২০২৬

কুষ্টিয়ার খোকসায় রক্তের দাগ ও উগ্রপন্থার প্রচ্ছায়া: রাজু খানের ওপর হামলা কি সর্বহারার পুনরাবির্ভাব?

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের রক্তাক্ত সীমান্ত কুষ্টিয়া আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। খোকসা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং আসন্ন পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নাফিজ আহম্মেদ রাজু খানের ওপর সাম্প্রতিক সশস্ত্র হামলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর ও ভীতিকর সংকেত। খোকসা ও তৎসংলগ্ন পদ্মা-গড়াই নদীর কোলঘেঁষা এলাকাগুলোতে যে কৌশলে এই হামলা চালানো হয়েছে—ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে পা অকেজো করা, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাড় ভেঙে দেওয়া, এরপর ১৬ রাউন্ড গুলি ও ককটেলের তাণ্ডব চালিয়ে এলাকা ত্যাগ করা—তা স্থানীয়দের মনে ৯০-এর দশকের 'সর্বহারা' বা চরমপন্থী সংগঠনগুলোর চিরচেনা স্টাইলের নারকীয় স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদে একসময় পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি ও জাসদ গণবাহিনীর অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে পদ্মা পারের চরাঞ্চল, দেবীনগর এবং খোকসা-কুমারখালীর সীমান্তজুড়ে চরমপন্থীদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছিল। বিগত দেড় দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে চরমপন্থী সংগঠনগুলো আত্মসমর্পণ করে অথবা আড়ালে চলে যায়। ফলে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছিল এ অঞ্চলে। তবে স্থানীয় গোয়েন্দা সূত্র ও সচেতন মহলের শঙ্কা, অতি সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক নজরদারির ফাঁক গলে পুরোনো সর্বহারা ও ক্যাডার নেটওয়ার্কগুলো নতুন পরিচয়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

রাজু খানের হামলার ধরনটি পর্যালোচনা করলে চরমপন্থী বা পেশাদার কোনো অপরাধী চক্রের সরাসরি উপস্থিতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ কোনো দলীয় কোন্দল বা নির্বাচনী প্রতিপক্ষ এত বড় পরিসরে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র (যেমন শর্টগান) এবং শক্তিশালী ককটেল ব্যবহার করে খোদ খোকসা থানার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এরকম তাণ্ডব চালানোর দুঃসাহস সচরাচর দেখায় না। এর আগে গত মাসেই খোকসার দেবীনগরে চরাঞ্চলের চরমপন্থী ঘরানার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, যা এই আঞ্চলিক সহিংসতার গতিধারাকে নির্দেশ করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চরাঞ্চলের জমি দখল, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় হাটবাজারের তোলাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে নিষিদ্ধ চরমপন্থী দলগুলোর আত্মগোপনে থাকা সদস্যরা আবার ভাড়াটে কিলার বা আঞ্চলিক ক্যাডার হিসেবে সক্রিয় হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নিজেদের ফায়দা লুটতে এসব অবদমিত সর্বহারা বা চরমপন্থী ক্যাডারদের অর্থের বিনিময়ে পুনরায় ব্যবহার করছে কি না, সেই প্রশ্নটি এখন খোকসার রাজনীতিতে জোরালো হচ্ছে। যদিও নাফিজ আহম্মেদ রাজু অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনী ময়দান থেকে তাকে সরিয়ে দিতে প্রতিপক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে, কিন্তু যে নৃশংস পন্থায় অপারেশনটি চালানো হয়েছে, তাতে চরমপন্থী আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে হামলাকারীরা রাজুর নাম ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই এলোপাতাড়ি কোপানো ও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত শুরু করে—যা সর্বহারাদের টার্গেট কিলিং বা অঙ্গহানি করার পুরনো সামরিক মহড়ার হুবহু রূপায়ন।

খোকসার আমজনতা এখন এক ভীতিকর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা অস্ত্রধারী ও তাদের অর্থদাতাদের গোড়া থেকে চিহ্নিত না করে, তবে খোকসা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তগুলোতে সর্বহারার রাজনীতি বা চরমপন্থার বিষাক্ত থাবা যে আবার নতুন রূপে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, রাজু খানের ওপর এই নারকীয় হামলা তারই সুস্পষ্ট আগাম বার্তা দিচ্ছে।