বৃহস্পতিবার,

০৬ আগস্ট ২০২৬

|

শ্রাবণ ২১ ১৪৩৩

XFilesBd

পোলট্রি মাংসে বিপদজনক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল: নীরব ঘাতকের মুখোমুখি বাংলাদেশসহ ৩ দেশ

অখিল পোদ্দার

প্রকাশিত: ০৩:০৩, ৬ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০৩:০৭, ৬ আগস্ট ২০২৬

পোলট্রি মাংসে বিপদজনক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল: নীরব ঘাতকের মুখোমুখি বাংলাদেশসহ ৩ দেশ

আপনি যে পোলট্রি মুরগির মাংস নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় রাখছেন, তা কি আদৌ নিরাপদ? আন্তর্জাতিক এক সাম্প্রতিক গবেষণা জনস্বাস্থ্যের এক ভীতিকর চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের পোলট্রি মুরগির মাংসে আন্তর্জাতিক নিরাপদ মানদণ্ডের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল’ বা অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশের বিপজ্জনক উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এতে করে অণুজীবের ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি বা ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (AMR)-এর মতো বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝাঁকি আরও তীব্র হওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘পোলট্রি নিউজ’-এ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গবেষণাটি পরিচালনা করেছে লন্ডনের স্বনামধন্য ‘রয়েল ভেটেরিনারি কলেজ’ (আরভিসি)। ভেটেরিনারি ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি ও অ্যানেস্থেসিয়ার অধ্যাপক লুডোভিক পেলিগ্যান্ডের নেতৃত্বে চালানো এই গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি যুক্ত ছিল। ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস রিসার্চ ফান্ডের অর্থায়নে এবং ‘ওয়ান হেলথ পোলট্রি হাব’-এর উদ্যোগে ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৩টি দেশের বিক্রির উপযোগী খামার এবং খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সর্বমোট ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত নমুনাগুলো পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে ৬৯ ধরনের ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল এসব দেশের বেশ কিছু নমুনায় ওষুধটির মাত্রা নিরাপদ সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। বাজার বা খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নেওয়া ৩.৭ শতাংশ থেকে ৮.৬ শতাংশ নমুনায় নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পাওয়া গেছে। যেখানে ২০২১-২২ সালের তথ্যানুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে এই হার ছিল মাত্র ০.০৫ থেকে ০.০৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আমাদের বাজারের মাংসে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ইউরোপের তুলনায় বহু গুণ বেশি।

প্রাণীদেহে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগের পর শরীর থেকে তা পুরোপুরি নিষ্ক্রান্ত হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় (উইথড্রয়াল পিরিয়ড) অপেক্ষা করার নিয়ম থাকলেও খামারিরা পোলট্রি বাজারজাত করার ঠিক আগ মুহূর্তেও নির্বিচারে এসব ওষুধ প্রয়োগ করছেন। ফলে জবাইয়ের পরও মাংসে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, যা না জেনে প্রতিদিন খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছেন সাধারণ ভোক্তারা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভেটেরিনারি ওষুধের ব্যবহার নিয়ে তদারকির অভাব এবং সচেতনতার মারাত্মক ঘাটতিই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক বড় আতঙ্কের নাম। মাংসে থাকা এসব অবশিষ্টাংশ নিয়মিত মানবদেহে প্রবেশ করলে সাধারণ অসুখেও শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। গবেষণার প্রধান অধ্যাপক পেলিগ্যান্ড আশা প্রকাশ করেন, এই তথ্যের মাধ্যমে পশুচিকিৎসায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত খামার থেকে বাজার—প্রতিটি ধাপে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে কঠোর নজরদারি জোরদার করা।