দ্রুতগতির প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক যুগে মানুষ যখন ক্রমশ প্রকৃতি, নির্জনতা ও নিজের অন্তর্জগৎ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে, তখন কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতাই মানুষকে নতুন করে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তক সৈকত হাবিব। তিনি বলেন, “একুশ শতকের এই কোলাহলময় পৃথিবীতে জীবনানন্দ পাঠ কেবল সাধারণ সাহিত্যচর্চার অংশ নয়, বরং যান্ত্রিকতার শেকল ভেঙে নিজেকে, প্রকৃতিকে এবং পৃথিবীকে গভীরভাবে বোঝার এক অপরিহার্য আত্মিক মাধ্যম।”

বৃহস্পতিবার সাভার সরকারি কলেজ পাঠচক্রের উদ্যোগে আয়োজিত "একুশ শতকে জীবনানন্দ পাঠ" শীর্ষক এক প্রাণবন্ত আলোচনাসভায় মূল আলোচকের বক্তব্যে এসব বলেন তিনি। কলেজের হলরুমে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত থেকে কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব আধুনিক মানুষের সংকট এবং জীবনানন্দের কাব্যদর্শনের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর নিপাট সমালোচনার জন্যই হাল সময়ে সাহিত্যিক ঘরানা তাঁকে জীবনানন্দ বিশেষজ্ঞ বলেই গণ্য করে থাকেন।
অত্যন্ত নির্ভেজাল ও ঝাঁঝালো বক্তা কবি ও চিন্তক সৈকত হাবিব একুশ শতকের মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান যুগ প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগ হলেও মানুষের ভেতরের শূন্যতা দিন দিন বাড়ছে। মানুষ আধুনিকতার চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রকৃতি, নিবিড় নীরবতা এবং নিজের আত্মিক সত্তা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের সময়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ আমাদের থামতে শেখান, একটু সময় নিয়ে ভাবতে শেখান এবং যান্ত্রিকতার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নিজের আসল স্বরূপকে চিনতে শেখান।

সৈকত হাবিব তাঁর সুচিন্তিত পাঠ-বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন যে, জীবনানন্দের কবিতায় কেবল প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ বা উপমাই প্রধান নয়, বরং তাঁর সৃষ্টির পরতে পরতে মিশে আছে মানুষের গভীর নিঃসঙ্গতা, প্রেম, মৃত্যুচিন্তা, মহাকালের প্রবাহ এবং অস্তিত্বের টানাপোড়েনের এক অনিবার্য অনুভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আধুনিক নগরজীবনের শত ব্যস্ততা ও কোলাহলের মধ্যেও জীবনানন্দের বাণী মানুষকে তার শাশ্বত মেঠো শিকড় এবং চিরায়ত মানবিকতাবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
কবির বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের কথা স্মরণ করে প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব বলেন, জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ আমাদের সুপ্ত প্রকৃতিপ্রেমকে জাগিয়ে তোলে এবং দেশজ মাটির সান্নিধ্যে টেনে নেয়। আবার অন্যদিকে তাঁর তীব্র নিঃসঙ্গতা, বিপন্নতা ও বিষাদের কবিতাগুলো আধুনিক মানুষের গহিনের মানসিক একাকীত্ব ও শূন্যতাকে স্পর্শ করে পরম মমতায়। ফলে একুশ শতকের জটিল ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রায় আত্মোপলব্ধির জন্য জীবনানন্দের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
আয়োজিত এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সাভার সরকারি কলেজের সম্মানিত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল হামিদ। অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক শ্রাবন্তী ঘোষের সুসংহত ও সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সাভার সরকারি কলেজ পাঠচক্রের আহ্বায়ক, বিশিষ্ট কবি ও গল্পকার এবং অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইব্রাহিম আজাদ।
পাঠচক্রের আহ্বায়ক ইব্রাহিম আজাদ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে সৈকত হাবিবের আলোচনার সুর ধরে বলেন, একুশ শতকের দ্রুতগতির এই যান্ত্রিক সময়ে মানুষ যখন তার অন্তর্জগৎ হারিয়ে ফেলছে, তখন জীবনানন্দ পাঠ মানুষকে পুনরায় গভীর মানবিক বোধ ও সুকুমার বৃত্তিতে ফিরিয়ে আনে। জীবনানন্দের কাব্যসম্ভারে প্রকৃতি, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও মৃত্যুর যে চিরন্তন প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, তা মূলত নিজেকে এবং সমাজকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার এক অপার সুযোগ তৈরি করে দেয়। পাঠচক্রের এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের সেই বোধের জায়গাতেই সমৃদ্ধ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঐতিহ্যবাহী অধর চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সাগর রশীদ, সাভার সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদের সম্মানিত সম্পাদক জহিরুল ইসলাম খান এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ফজলুল হক। বক্তারা তাঁদের আলোচনায় সৈকত হাবিবের মূল প্রবন্ধের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি কাব্য চর্চা ও ভাবুকতার চর্চা বজায় রাখার আহ্বান জানান। সাভার সরকারি কলেজের বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক, শিক্ষকবৃন্দসহ বিপুল সংখ্যক সাহিত্যপ্রেমী শিক্ষার্থী এই আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। মূল আলোচক কবি সৈকত হাবিবের জীবনানন্দ বিষয়ক প্রাঞ্জল ও গভীর জীবনমুখী আলোচনা উপস্থিত তরুণ শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত ও আপ্লুত করে তোলে।
