ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯টা। বলা যায় তিলোত্তমা রাজধানীর তখন সবে সন্ধ্যা। অফিস-আদালত ছুটি হওয়ার পর ঢাকার রাজপথে যখন মানুষের ঢল নামছে, ঠিক তখনই এক অদ্ভুত নিরবতা নেমে আসে রাজধানীর ব্যস্ততম বিপণিবিতানগুলোতে। সরকারি নিয়মে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ঠিক নয়টায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঢাকা শহরের সব মার্কেট। কিন্তু এই ঢালাও নিয়মের নিচে চাপা পড়ে গেছে এক নিরব হাহাকার, যা কোনো সাধারণ ব্যবসাকেন্দ্রের আর্থিক ক্ষতির চেয়েও অনেক গভীর এর ক্ষত। এই ক্ষতি সংস্কৃতির, এই লোকসান মেধার, এটি বাঙালির মনন ধ্বংসের পাঁয়তারা।

মার্কেট বন্ধের এই চাবুক সবচেয়ে নির্মমভাবে এসে লেগেছে ঢাকার বইয়ের দোকানগুলোর পিঠে। কারণ, কাপড়ের দোকান বা জুতার শোরুমের মতো ঢাকার সিংহভাগ ঐতিহ্যবাহী বইয়ের দোকান আলাদা কোনো ভবনে নয়, বরং গড়ে উঠেছে বড় বড় মার্কেটের ভেতরে। ফলে মার্কেট বন্ধের খাঁচায় বন্দি হয়ে প্রতিদিন ঠিক নয়টায় বন্ধ করে দিতে হচ্ছে জ্ঞানের আলো ছড়ানো এই বইয়ের দোকানগুলোকে। অথচ নিয়তির পরিহাস হলো, ঢাকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনে পাঠক ও ক্রেতা সাধারণের বইয়ের দোকানে আসার আসল সময়টাই শুরু হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর। মাত্র এক দেড় ঘন্টার এই সংকীর্ণ জানলায় দম আটকে মরছে ঢাকার বইয়ের বাজার ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা।
অন্ধকারের মুখোমুখি কাঁটাবন ও আজিজ সুপার মার্কেট
রাজধানীর বুকে বইয়ের বাজার ও সাংস্কৃতিক আড্ডার কেন্দ্রস্থল হিসেবে দুটি নাম সবার আগে আসে—কাঁটাবন কনকর্ড এম্পোরিয়াম এবং শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট। এই দুটি কেবল ইট-পাথরের বাণিজ্যিক মার্কেট নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুটি প্রধান ফুসফুস।
প্রতিদিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ চারপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রথিতযশা লেখক, মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত এই চত্বরগুলো। কিন্তু ৯টার কঠোর নিয়ম এই প্রাণোচ্ছল আবহে এক বিরাট অন্ধকার নামিয়ে এনেছে।
বইয়ের দোকানের ভেতরের চিত্রটা এখন বেশ করুণ। রাত সাড়ে ৮টা বাজতেই দোকানদারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে জ্যাম ঠেলে কোনো পাঠক হয়তো মাত্র দোকানে এসে বইয়ের পাতা ওল্টানো শুরু করেছেন, ঠিক তখনই মার্কেটের মাইকে ঘোষণা আসে—‘মার্কেট বন্ধের সময় হয়ে গেছে, সম্মানিত গ্রাহকগণ দ্রুত কেনাকাটা শেষ করুন।’ পাঠক তখন তড়িঘড়ি করে বই নামিয়ে রেখে অতৃপ্ত মন নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যান। ৯টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মার্কেটের মেইন সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে আলোয় একটু আগে জ্বলজ্বল করছিল জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ কিংবা কবি নজরুলের বইয়ের প্রচ্ছদ, সেখানে মুহূর্তেই নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
যে আড্ডা থেকে জন্ম নেয় আগামীর বাংলাদেশ
কাঁটাবন ও আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দশকে যে শিল্প-সংস্কৃতির আড্ডা গড়ে উঠেছে, তার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কোনো উদ্দেশ্যহীন বা অলস আড্ডা নয়। এখানে এক টেবিলে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক, তরুণ কবি, প্রগতিশীল সাংবাদিক এবং উদীয়মান সংস্কৃতিকর্মী।
এই আড্ডাগুলো থেকেই জন্ম নেয় নতুন কোনো ম্যাগাজিনের পরিকল্পনা, নতুন কোনো লিটল ম্যাগাজিনের রূপরেখা কিংবা কোনো প্রগতিশীল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি। রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৌশল থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের নতুন বাঁক বদলের আলোচনা—সবকিছুরই আঁতুড়ঘর এই কাঁটাবন ও আজিজ। যখন এই আড্ডাগুলো অকালেই ভেঙে যায়, তখন আসলে একটি দেশের চিন্তাশীল সমাজ গঠনের প্রক্রিয়াটাই বাধাগ্রস্ত হয়।
একজন প্রবীণ লেখক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "একটা কাপড়ের দোকান ৯টায় বন্ধ হলে মানুষ পরের দিন সকালে এসে কাপড় কিনতে পারবে। কিন্তু একজন পাঠক যখন সন্ধ্যায় অফিস শেষ করে এসে দেখে বইয়ের দোকান বন্ধ, সে হয়তো আর কোনোদিন বইটা কিনবেই না। বই কোনো জরুরি চাল-ডাল নয় যে মানুষ বাধ্য হয়ে কিনবে, এটি মনের খোরাক। এর জন্য পরিবেশ ও সময় প্রয়োজন।

পাঠক ও ক্রেতাদের ক্ষোভ: জ্যামের শহরে এক ঘণ্টার প্রহসন
ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের কথা সবারই জানা। বিকেল ৫টা/ ৬টায় অফিস ছুটি হলে একজন মানুষের কাঁটাবন বা শাহবাগ পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ৭টা বা সাড়ে ৮টা বেজে যায়। অর্থাৎ, একজন পাঠক যখন সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে একটু বইয়ের ঘ্রাণ নিতে, পছন্দের লেখকের নতুন বইটা ছুঁয়ে দেখতে বাজারে আসেন, তখন তার হাতে সময় থাকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জানান, "আমাদের ক্লাস-ল্যাব শেষ হতে হতেই বিকেল হয়ে যায়। একটু চা খেয়ে আজিজে এসে বই দেখব, সেই উপায় নেই। আসার পরপরই দোকান বন্ধ হয়ে যায়। বই তো আর জামা-কাপড় নয় যে দেখেই পছন্দ হয়ে যাবে। একটু উল্টেপাল্টে দেখতে হয়, ভূমিকা পড়তে হয়। ৯টায় মার্কেট বন্ধের নিয়মের কারণে আমরা বই কেনা এবং পড়া দুটো থেকেই বঞ্চিত হচ্ছি।"
বইয়ের দোকানদারদের অবস্থাও শোচনীয়। করোনাকালীন ধাক্কা এবং কাগজের আকাশচুম্বী দামের কারণে এমনিতেই বইয়ের ব্যবসা মন্দা। তার ওপর এই সময়সীমা ব্যবসার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। কাঁটাবনের বিশিষ্ট পুস্তক ব্যবসায়ী পাঠক সমাবেশের কর্ণধার সাহিদুল ইসলাম বিজু জানান, "আমাদের সারা দিনের বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশ হতো সন্ধ্যা ৮টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে। এখন সেই মূল সময়টাই যদি বন্ধ থাকে, তাহলে আমরা দোকান ভাড়া দেব কীভাবে আর কর্মচারীদের বেতনই বা দেব কীভাবে? সুতরাং ব্যবসায়ীদের ব্যাপারটি সরকারের ভেবে দেখা উচিত।
সংস্কৃতি বনাম বাণিজ্য: বইয়ের দোকান কি আলাদা বিবেচনার দাবি রাখে না?
প্রশ্ন উঠেছে সরকারের এই ঢালাও নীতি নিয়ে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় অবশ্যই একটি যৌক্তিক কারণ, কিন্তু সংস্কৃতির মূল্য চুকিয়ে কি এই সাশ্রয় দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল আনবে? একটি কাপড়ের দোকান বা ইলেকট্রনিক্সের দোকানের সঙ্গে একটি বইয়ের দোকানের পার্থক্য সরকার কেন বুঝতে পারছে না, তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
বইয়ের দোকানগুলো খুব বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না। সেখানে কোনো হাই-ভোল্টেজ এসি বা চোখ ধাঁধানো নিয়ন আলোর রোশনাই থাকে না। সামান্য কয়েকটি টিউবলাইট আর ফ্যান দিয়েই একটি বইয়ের দোকান চমৎকারভাবে চলতে পারে। ফলে বইয়ের দোকান রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখলে রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ খাতের এমন কোনো বড় ক্ষতি হবে না, যা এই দোকানগুলো বন্ধ রাখলে সাশ্রয় হচ্ছে। সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, "যে আড্ডা থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে আসে, যে আড্ডা সমাজকে অন্ধকারের গ্রাস থেকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে এভাবে জোর করে বন্ধ করে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমরা যদি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বইয়ের দোকান থেকে সন্ধ্যা ৭টায় তাড়িয়ে দিই, তাহলে তারা কোথায় যাবে? তারা মাদক, অপরাধ কিংবা স্ক্রিন অ্যাডিকশনের দিকে ঝুঁকে পড়বে। বইয়ের দোকান খোলা রাখা কেবল ব্যবসার স্বার্থে নয়, সামাজিক সুস্থতা বজায় রাখার স্বার্থেও জরুরি।"
সমাধানের পথ: অবিলম্বে বিশেষ প্রজ্ঞাপন প্রয়োজন
এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কাঁটাবন ও আজিজ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী, পাঠক এবং সচেতন নাগরিক সমাজ একটি সুনির্দিষ্ট দাবির পক্ষে সোচ্চার হচ্ছেন। দাবিটি হলো—বইয়ের দোকানগুলোকে অন্যান্য সাধারণ বাণিজ্যিক মার্কেটের আওতামুক্ত রাখা হোক।
আলাদা সময়সীমা: বড় মার্কেটের ভেতরে হলেও বইয়ের দোকানগুলোর অংশটিকে রাত ১০টা বা সাড়ে ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিশেষ অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে মার্কেটের মূল গেট খোলা রেখে কেবল বইয়ের ব্লকের বিদ্যুৎ সচল রাখা সম্ভব।
ফটোগ্রাফি ও সাংস্কৃতিক জোন ঘোষণা: কাঁটাবন কনকর্ড এবং আজিজ সুপার মার্কেটকে সরকার বিশেষ 'সাংস্কৃতিক হেরিটেজ জোন' হিসেবে ঘোষণা করতে পারে, যেখানে বইয়ের দোকান ও আড্ডার জায়গাগুলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সাধারণ নিয়ম থেকে ছাড় পাবে।
বিকল্প প্রবেশপথ: মার্কেটের ভেতরের অন্যান্য দোকান বন্ধ হয়ে গেলেও বইয়ের দোকানগুলোতে যাতায়াতের জন্য যদি কোনো বিকল্প পকেট গেট থাকে, তবে তা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।
এমন গুচ্ছ দাবির পক্ষে মত দেন বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক কবি নাসিমা আনিস। তাঁর বক্তব্যের সায় দেন পাঠক সমাবেশের কর্ণধার সাহিদুল ইসলাম বিজু। তিনি বলেন, হাল সময়ে এসে এমনিতেই বইয়ের ব্যবসায় বিশাল ধ্বস। প্রকাশকেরা সবাই অচল হয়ে পড়েছেন। এমন অবস্থায় সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দরকার।
শেষ কথা
বই কোনো পণ্য নয়, বই হলো একটি জাতির মেরুদণ্ড। আর বইয়ের দোকানগুলো হলো সেই মেরুদণ্ড সোজা রাখার থেরাপি সেন্টার। ঢাকা শহরের মতো একটি যান্ত্রিক ও যানজটের নগরীতে যেখানে মানুষের নিশ্বাস ফেলার জায়গা এমনিতেই কম, সেখানে কাঁটাবন আর আজিজের মতো মুক্তবুদ্ধির আড্ডাস্থলগুলোকে এভাবে ৭টার সাইরেনে স্তব্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
আমরা যদি একটি জ্ঞানভিত্তিক, প্রগতিশীল এবং মাদকমুক্ত সমাজ আশা করি, তবে সবার আগে আমাদের বইয়ের দোকানের আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে। রাত ৯টার অন্ধকার যেন আমাদের মেধার জগতকে গ্রাস করতে না পারে, সেই সুমতি প্রশাসনের আসুক—এটাই এখন রাজধানীর পাঠক, লেখক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের একমাত্র প্রত্যাশা। আর যেন কোনো পাঠককে বই হাতে নিয়ে অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফিরে যেতে না হয়।
