আদ দ্বীন হাসপাতাল তখন বন্ধ; বদ্ধ দরজার ওপারে তখন ঘোর অনিশ্চয়তা। চারপাশে প্রচ্ছন্ন এক ছায়া এসে গিলে খাচ্ছিল সবাইকে। সবাই হতভম্ব- দুশ্চিন্তা গ্রাস করে ফেলছিল ক্রমশ। স্বাস্থ্যকর্মীরা খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। কবে কখন চালু হবে আদ দ্বীন-কেউ তা জানে না। চারপাশের গুঞ্জনে গর্ভবতী মায়েরা প্রকটভাবে চিন্তিত। এমন অমানাশিায়- অন্ধকারের আগল ভেঙে কথা বলে ওঠেন এক নারী। নাম তাঁর দীপা। যেন আড়মোর ভেঙে দূর আকাশ থেকে প্রকম্পিত হলো সে কণ্ঠ। বন্ধ আদ দ্বীনের সবাই শুনলেন সে কথা। সবাই আশা ফিরে পান বুকের ভেতরে ভেতরে। দীপার আত্মবিশ্বাসের সুর ভাঁজ খেলে যায় মগবাজার আদ দ্বীনের দেয়ালে দেয়ালে। এতোদিন পর তাঁর সেই দরাজকণ্ঠের উচ্চারণ সত্য হলো! সেই সাথে এক মায়ের ভালবাসা তথা নির্মম বাস্তব দৃষ্টান্ত তৈরী হলো মগবাজার আদ দ্বীনে।

দু’মাস আগে আদ দ্বীন হাসপাতাল যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন এক নারী ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। চোখে তার জল ছিল না, ছিল অদম্য এক তেজ। গর্ভে বেড়ে ওঠা সন্তানকে জড়িয়ে ধরে তিনি তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট কণ্ঠে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, "আমার বাচ্চার ডেলিভারি আগস্টেই হবে। আর এই আদ্-দ্বীন হাসপাতালেই হবে!"
দীপা নামের সেই মায়ের বুকভরা আত্মবিশ্বাসের ভিডিওটি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। সাধারণ মানুষ সেদিন দেখেছিলেন এক নারীর অলৌকিক জেদ—যেখানে একনিষ্ঠ মা তাঁর অনাগত সন্তানের সুরক্ষার জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালের উন্নত সেবা আর স্নেহের ওপর সমস্ত অস্তিত্ব সঁপে দিয়েছেন। হাজারো অনিশ্চিত চোখের সামনে দীপার সেই আকুল ও সাহসী উচ্চারণ হয়ে উঠেছিল অন্ধকার সময়ের আলোর দিশা। নিভে যেতে বসা হাজারো প্রাণের নতুন জ্বালানি।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্টাফ, ডাক্তার আর নার্সরা সেই বিশ্বাসের ঋণ ভুলতে পারেন নি। দীপার সেই সাহসী কণ্ঠ প্রতিদিন তাঁদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।তাঁর সেই দীপ্ত উচ্চারণ তৈরি করেছিল এক পরম মমতার দায়বদ্ধতা। দিন গড়িয়ে যখন সেই কাঙ্ক্ষিত আগস্ট মাস এলো, আদ্-দ্বীনের করিডোরও ততদিনে ফিরে পেয়েছে চেনা স্পন্দন।
১৭ আগস্ট ২০২৬। হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষের বাইরে থমথমে অপেক্ষা। এটি দীপার তৃতীয় সিজারিয়ান কেস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল। কিন্তু সে লড়াইয়ে জিতলেন সাহসী মা- দীপা। হারেনি অন্যরাও। সবার কলকাকলিতে সৃষ্টি হয়েছে অনবদ্য আত্মবিশ্বাসের ইতিহাস।
নিরবতা ভেঙে ভেসে এলো এক নবজাতকের কাঙ্ক্ষিত কান্নার শব্দ। দীপার শূন্য কোল আলো করে জন্ম নিল ফুটফুটে কন্যা সন্তান। সৃষ্টিকর্তা যেন এক মায়ের সেই ব্যাকুল মনের ইচ্ছা আর গভীর বিশ্বাসকেই বাস্তব করে ফিরিয়ে দিলেন।

আদ্-দ্বীনের কেবিনে দীপা আর তাঁর দেবশিশুকে ঘিরে যে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ ঘটনার ফ্রেমে বাঁধানো যাবে না। নার্সদের পলকহীন রাতজাগা যত্ন, ডাক্তারদের পরম মমতার ছোঁয়া—সব মিলিয়ে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ যেন ছোট্ট প্রণের আবহে সঞ্চালিত। ভালোবাসার চাদরে মুড়ে ছোট্ট এ প্রাণ মাঝেমধ্যেই নড়েচড়ে আদ দ্বীন কতৃপক্ষকে অভিবাদন জানাচ্ছে। হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের সাহস দিচ্ছেন কচি হাতের ইশারায়। সম্মানীয় দীপার এই গল্প শুধু এক সন্তানের জন্মগাথা নয়; এটি ভালোবাসা, একনিষ্ঠ আস্থা আর পরম বিশ্বাসের হৃদয়গ্রাহী ইতিহাস। আদ দ্বীন হাসপাতালের শত দেয়ালের খোপে খোপে এমন কতো শত গল্প কথা বলে চলেছে গেল দু’মাসের নিরন্তর যাত্রায়!!
