রোববার,

২৩ আগস্ট ২০২৬

|

ভাদ্র ৭ ১৪৩৩

XFilesBd

পঁচিশ বছরের স্মৃতিঘেরা আড্ডা: নদী পেরিয়ে বন্ধুত্বের ঘাটে মিলল ৯৪-৯৫ সেশনের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২:৫৬, ২২ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ২৩:৩০, ২২ আগস্ট ২০২৬

পঁচিশ বছরের স্মৃতিঘেরা আড্ডা: নদী পেরিয়ে বন্ধুত্বের ঘাটে মিলল ৯৪-৯৫ সেশনের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে পঁচিশটি বছর খসে গেছে অলক্ষ্যে। সময়ের ধূলিঝড়ে জীবন কতদিকে কত ডালপালা মেলেছে—কারো চুলে রুপোলি রেখা ফুটেছে, কারো চোখে জমেছে সংসারের প্রাহরিক ক্লান্তি, আবার কেউ সামলাচ্ছেন অ্যাকাডেমিক বা কর্পোরেট জগতের বিশাল দায়িত্ব। কিন্তু সব পরিচয়, সব পদবি এবং জীবনের সব বৈষয়িক হিসাব-নিকাশ এক নিমিষে ধুয়েমুছে যায়, যখন পুরোনো বন্ধুদের ভিড়ে সুর ওঠে—"বন্ধু কেমন আছিস? তোরা বাচ্চারা কী করছে বল?’’

ঠিক তেমনই এক স্মৃতিকাতর ও আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল কেরাণীগঞ্জের আটি মডেল টাউন। সম্প্রতি সেখানে আয়োজন করা হয়েছিল কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের রজতজয়ন্তী পুনর্মিলনী। আড়াই দশক আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে, আমতলার ছায়ায় কিংবা ঝালমুড়ির টঙে যেসব কিশোর-কিশোরী সাহিত্য আর স্বপ্নের পাঠ নিয়েছিলেন, তারা আবার এক হয়েছিলেন বুড়িগঙ্গা নদীর এপারে, জীবনের মাঝবয়সে এসে।

কেরাণীগঞ্জের আটিবাজার সংলগ্ন আটি সোসাইটির সবুজ ও স্নিগ্ধ পরিবেশে আয়োজিত এই মিলনমেলার নেপথ্যে ছিল প্রফেসরস বিল্ডার্স। আর এই উদ্যোগের মূল অনুঘটক ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদ খান—যিনি নিজেও ছিলেন ইবি বাংলা বিভাগের ১৯৯৪-৯৫ সেশনেরই একজন গর্বিত ছাত্র। বন্ধুদের এই হঠাৎ মেলবন্ধনে সবাই যেন এক লাফে ফিরে গিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার সেই চেনা ক্যাম্পাসে।

সারাদিনের এই আড্ডায় আবেগ ও শ্রদ্ধার ছোঁয়া এনে দেন বিভাগটির প্রিয় শিক্ষক, প্রফেসর ড. রেজাউল করিম। পুরো দিনজুড়ে চলা এই অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন। প্রিয় ছাত্রদের পঁচিশ বছর পর এমন এক ছাদের নিচে হাসিমুখে দেখে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তিনিও। পুরো অনুষ্ঠানটির দক্ষ ও প্রাণবন্ত পরিচালনায় ছিলেন প্রফেসরস বিল্ডার্সের পরিচালক আফজাল হোসেন শিশির।

পঁচিশ বছরের ব্যবধানকে তুচ্ছ করে প্রবীণ বন্ধুদের খোশগল্প, হাসি-তামাশা আর খুনসুটিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ভেন্যু। সাবেক বন্ধুদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডীন ও চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. চন্দন আনোয়ার, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ড. তারেক পারভেজ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাবের আলী, অধ্যাপক ইবাদত, অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, অধ্যাপক মিজানুর রহমান, অধ্যাপক আকরাম,

প্রফেসর স্বাধীন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খোকন, ব্যাংকার জুলফিকার হায়দার বাবু ও একুশে টেলিভিশনের বিদায়ী প্রধান বার্তা সম্পাদক বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ড. অখিল পোদ্দার। অনুষ্ঠানে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আটি সোসাইটির প্রফেসরস বিল্ডার্সের এমডি রাশেদ খান। সময়ের সাথে জীবনের পথ বদলে গেলেও বন্ধুদের আড্ডায় সেই পুরোনো সরলতা ছিল একদম নিখাদ। কেনো না বন্ধুদের কেউ আসছেন নড়াইল থেকে, কেউ কুষ্টিয়া কেউবা বরিশাল, সাভার, ফরিদপুর, নোয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা থেকে। সঙ্গে ছিলেন বন্ধুনীদের স্বামী অথবা বন্ধুদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যা।

এই মিলনমেলাকে অন্যরকম এক মাত্রা দিয়েছিল নারী বন্ধুদের স্বতঃস্ফূর্ত এবং বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। জীবনের নানা ব্যস্ততা ঠেলে স্মৃতির টানে ছুটে এসেছিলেন মিলি, লিলি, সাবিহা সুলতানা রিক্তা, কবিতা ও স্বপ্না। আড্ডার মাঝেই ভেসে আসে সুরের মূর্ছনা; কণ্ঠ ছেড়ে গান গেয়ে পুরো পরিবেশকে ভাসিয়ে দেন বন্ধু মিলি। তাঁর সেই গান যেন উপস্থিত সবাইকে এক মুহূর্তে পঁচিশ বছর আগের কোনো এক অলস বিকেলের আড্ডায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

অনুষ্ঠানে ছিল এক বিশেষ সাহিত্যিক চমক। ইবি বাংলা বিভাগেরই প্রাক্তন ছাত্র ও দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক-গবেষক ড. অখিল পোদ্দারের সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘হাড়ের ভেতর হেমন্ত’ কাব্যপ্রেমী বন্ধুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কবিতার প্রতি পরম ভালোবাসায় বইটি তুলে দেন কবিতা, মিলি, লিলি, সাবিহা, স্বপ্না ও কবিপত্নী অনন্যা। এর পরপরই বিকেএসপি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বন্ধু কবিতা তাঁর নিজস্ব সাবলীল কণ্ঠে ড. অখিল পোদ্দারের এই কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। যান্ত্রিক শহরের বুকে কবির কাব্যচরণ আর সুহৃদ বন্ধুর কণ্ঠ মিলে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ।

বিকেলের ঢলে পড়া রোদের সাথে সাথে অনুষ্ঠানস্থলে সুরের ঝঙ্কার আরও তীব্র হয়। আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট ফোক শিল্পী এ্যানী খান। তাঁর মাটির সুরের গানে মেতে ওঠেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীরা। এর পর মঞ্চে আসেন রেডিও-টেলিভিশন কাঁপানো কাওয়ালি শিল্পী মুক্তি দেওয়ান। তাঁর কাওয়ালির সুফিয়ানা সুর ও ছন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো আটি মডেল টাউন। বন্ধুরা হাত তালি দিয়ে, সুর মিলিয়ে যেন ভুলে গিয়েছিলেন নিজেদের বয়স আর দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি।

পঁচিশ বছরের এই পথচলা কেবল অতীতকে রোমন্থন করার আড্ডা ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল আগামী দিনে একে অপরের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার। জীবনযুদ্ধের নানান বাঁকে কে কোথায় আছেন, কে কেমন আছেন—সেই খবর নেওয়ার পাশাপাশি সুখে-দুঃখে বন্ধুদের ছায়া হয়ে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সবাই। আয়োজক রাশেদুল খানের এই অনন্য উদ্যোগকে উপস্থিত সব বন্ধু ও শিক্ষকরা আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

দিনের শেষে যখন সূর্যের আলো ফিকে হয়ে আসছিল, তখন সবার চোখেই ছিল একটুখানি জল আর মুখে ছিল পরম তৃপ্তির হাসি। বিদায়ের মুহূর্তে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলা—"আবার দেখা হবে তো?" কেরাণীগঞ্জের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে দিল, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে যে বন্ধুত্বের বীজ বোনা হয়েছিল পঁচিশ বছর আগে, তা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। সময়ের ধুলো জমে সেই সম্পর্কের বাঁধন ক্ষয়ে যায়নি বরং রজতজয়ন্তীর এই রোদে তা যেন আরও বেশি উজ্জ্বল ও অর্থবহ হয়ে উঠেছে। জয়তু বাংলা বিভাগ, জয় হোক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের।