আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অর্জিত নিট মুনাফার ৫ শতাংশ পাবেন কর্মীরা। অথচ দেশের রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতগুলোতে এই আইন স্রেফ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। শত শত কোটি টাকা মুনাফা করা বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী, বেসরকারী হাসপাতাল, ব্যাংকিং ও সেবাখাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই শ্রমিক-কর্মচারীদের এই আইনি পাওনা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করে আসছে।বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২৩৪ ধারা (সংশোধিত ২০১৩) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তপূরণকারী প্রতিটি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক নিট মুনাফার ৫ শতাংশ অর্থ ৮০:১০:১০ অনুপাতে যথাক্রমে শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল, কল্যাণ তহবিল এবং সরকারি শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আইন অমান্য করলে সুদের বিধানসহ শাস্তির নিয়ম থাকলেও, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর চরম উদাসীনতা ও মালিকপক্ষের কারসাজিতে দেশের লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায় এক হতাশাজনক চিত্র। তিনি স্বীকার করেন, “ঢাকা মহানগরে শত শত বাণিজ্যিক ও সেবামূলক বড় প্রতিষ্ঠান থাকলেও এই আইন যথাযথভাবে মেনে চলার হার বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। আগে একেবারেই ছিল না। এখন শতাধিক পোশাক কারখানা, কিছু করপোরেট হাউস, ১২ টি মিডিয়া স্টেশন ও হাতে গোনা দু-একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ কর্মীদের এই শেয়ার প্রদান করে না।” ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র স্বাস্থ্যখাতের। প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করলেও এই খাতের কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রণোদনা দেয়ার বেলাতে তাদের হাত খুবই কষা। আমরা অনেকগুলি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছি। তাতে ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে। রাজধানী ঢাকা শহরে শুধু দুটি হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার উল্লিখিত নিয়ম মানছে। যার একটি ধানমন্ডিতে অপরটি উত্তরাতে অবস্থিত। ঢাকার বাইরে ৪টি হাসপাতাল ও ১ টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এই আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করে। প্রতি বছর তারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে মুনাফার সঠিক অংশ, প্রাপ্য সুবিধা ও বেতন প্রথা মেনে বুঝিয়ে দেন। আমরা এসব নিয়ে সরকারের উচ্চমহলে রিপোর্ট দিয়েছি। সেখান থেকে দুটি সংস্থা, অডিট বিভাগ ও এনবিআরকে স্বাস্থ্যখাতের এই দুর্নীতির ফাইল পাঠানো হয়েছে বলে জেনেছি। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, অচিরেই হয়তো অভিযান পরিচালনা করে মালিকদের বিরুদ্ধে জেলা জরিমানার ব্যবস্থা করা হতে পারে। এ ব্যাপারে একটি ল ফার্ম আমাদের আইনি সাপোর্ট দিচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথেও এ নিয়ে বৈঠক করেছে অধিদফতরের উচ্চমহল। মন্ত্রী মহোদয় ব্যাপারটি জেনে ক্ষোভ প্রকাশ করে অসাধু মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে 'প্রফিট শিয়ারিং' বা মুনাফায় কর্মীর অংশীদারত্বকে প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি মনে করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে আইনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের শেয়ার ও বোনাস নিশ্চিত করা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও 'পেমেন্ট অব বোনাস অ্যাক্ট ১৯৬৫' অনুযায়ী বাৎসরিক মুনাফার সর্বনিম্ ৮.৩৩% থেকে সর্বোচ্চ ২০% পর্যন্ত শ্রমিকদের দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে কর্মীবান্ধব এই নীতি অনুসরণ করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হলেও বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

ঢাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানা, বেসরকারী তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যালয় এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বহু প্রতিষ্ঠান ভূয়া অডিট রিপোর্ট বানিয়ে নিজেদের 'লোকসান' দেখায়, যাতে শ্রমিকের এই মুনাফার অংশ দিতে না হয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হলেও সেই অর্থ পরিচালন পর্ষদের হাতেই আটকে থাকে, যা কখনোই পৌঁছায় না সাধারণ কর্মীর পকেটে।

শ্রমিকদের এই অব্যাহত বঞ্চনা কেবল তাদের জীবনযাত্রার মানকেই ব্যাহত করছে না, বরং একটি বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ তৈরির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও শ্রমিক নেতাদের মতে, বিভিন্ন গ্রুপ অফ কম্পানিজ যারা এই নিয়ম মানে তাদেরকে হাইলাইট করতে হবে- যাতে অন্য মালিকেরা দেখে দেখে শেখে। তাদের ইতিবাচক কাজগুলিকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহন করে সরকার ও কলকারখানা পরিদর্শন দপ্তরকে আরও কঠোর হতে হবে। নিয়মিত অডিট ও তদারকির মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানে এই আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা না গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার আইনি পাওনা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাস কেবল দীর্ঘই হতে থাকবে। যার গভীর ছায়া পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।
