সমকালীন সমাজে দিন দিন বেড়ে চলা নৈতিক অবক্ষয়, মানসিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক দূরত্ব মোকাবিলায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর মানবিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার সার্বজনীন অনুসরণের বিকল্প নেই। এই নববী আদর্শ কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে 'সুফি সেন্টার'-এর উদ্যোগে সম্প্রতি রাজধানীর এশিয়া হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে “সিরাতে রাসূল (দ.): আত্মশুদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক বিকাশ” শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনার ও সুফি মেডিটেশন সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সুফি সেন্টারের মহামান্য পরিচালক খাজা ওসমান ফারুকী (খাজাজী)-এর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, গবেষক, বিচারক ও সুফি সাধকরা অংশ নেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং প্রধান আলোচক ড. শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুলউলায়ী বলেন, রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর জীবনী কেবল কোনো নির্দিষ্ট জাতির ধর্মীয় ইতিহাস নয়। তাঁর জীবনাদর্শ নৈতিক উৎকর্ষ, আত্মশুদ্ধি, মানবিক মর্যাদা, পরমতসহিষ্ণুতা ও আধ্যাত্মিক বিকাশের এক অনন্য ও সর্বজনীন নির্দেশক। আলোচকেরা জোর দিয়ে বলেন, আজকের যান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক বিশ্বে নববী জীবন থেকে সহমর্মিতা, সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ব্যক্তিপর্যায়ে চিন্তার শুদ্ধতা ও অন্তর্জগতের পরিশুদ্ধি ঘটলেই কেবল একটি সুস্থ ও সহনশীল সমাজ গঠন সম্ভব। সেমিনারে সম্মানিত আলোচক হিসেবে আরও গভীর আলোকপাত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুস সবুর খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ওসমান গনী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মাসুম বাকী বিল্লাহ কাদেরী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রেজাউল হোসাইন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জজকোর্টের সদর আদালতের বিচারক জনাব মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, এশিয়া হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মো. জহিরুল ইসলাম এবং জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার চেয়ারম্যান জনাব লায়ন নুরুল ইসলাম।

সেমিনারের দ্বিতীয় পর্বে সুফি সেন্টারের পরিচালক খাজা ওসমান ফারুকী (খাজাজী)-এর প্রত্যক্ষ পরিচালনায় এক বিশেষ 'সুফি মেডিটেশন' ব্যবহারিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীদের আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি, অন্তর্মুখী মনন তৈরি, মানসিক প্রশান্তি অর্জন এবং আত্মশুদ্ধির বিভিন্ন ব্যবহারিক অনুশীলনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। আয়োজকদের মতে, সিরাতে রাসুল (দ.)-এর সুমহান নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সুফি মেডিটেশনের মতো আত্মশুদ্ধির অনুশীলনের সমন্বয় ব্যক্তি ও সমাজজীবনে গভীর ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সমাপনী বক্তব্যে সভাপতির আসনে বসে খাজা ওসমান ফারুকী (খাজাজী) সিরাতে রাসুল (দ.) চর্চার মূল রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সিরাতে রাসূল (দ.) নিয়ে আলোচনাকে যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা সাময়িক আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর শিক্ষা বাস্তবায়নের আসল উপায় হলো নিজের চরিত্র গঠন ও আত্মশুদ্ধি। তিনি আরও যোগ করেন, মানুষের বাহ্যিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি অন্তর্জগতের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন অপরিহার্য; কারণ একজন মানুষের চিন্তা, চেতনা ও আচরণের সঠিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমেই কেবল মূল্যবোধসম্পন্ন ও বৈষম্যহীন মানবকল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, সংস্কৃতিসেবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সুফি মেডিটেশন অনুশীলনকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
