ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। যে সময়ে নতুন কোনো সম্ভাবনার স্বপ্ন বুনে মানুষ ঘুম ভাঙে, ঠিক সেই সকালেই এক নিস্তব্ধ মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হলো মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ভোর আনুমানিক সাড়ে পাঁচটায় যখন চারপাশ শান্ত, তখনই এক নিমিষে আগুনের উত্তপ্ত লেলিহান শিখা কেড়ে নিল একটি জীবন। ছাই করে দিল জীবনের বহু স্মৃতি। ঘুমন্ত অবস্থাতেই আগুনে পুড়ে প্রাণ হারালেন কুষ্টিয়ার সন্তান নেওয়াজ চৌধুরী মিতু (৫৭)।

পরিবারের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছিল। আগুনের ধোঁয়া আর উত্তাপে বাসাটিতে তিনি আটকা পড়েন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। শুধু একজন মানুষকেই নয়, আগুন কাড়ি কাড়ি আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে রেখে গেছে কেবল পোড়া গন্ধ আর স্বজনদের আর্তনাদ। মিতু চৌধুরীর পরিচিতজনরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী ও বাউল আদর্শে বিশ্বাসী। অত্যন্ত মানবিক, পরোপকারী মিতু এতো মানুষের উপকার করেছেন যা বলে ফুরোনো যাবে না।
নেওয়াজ চৌধুরী মিতুর শিকড় ছড়িয়ে ছিল কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে; তিনি ঐতিহ্যবাহী আব্দুল জলিল বিশ্বাসের নাতি। কুষ্টিয়া শহরের পূর্ব মজমপুরের মরহুম চৌধুরী সুলতান সালাউদ্দিনের বড় ছেলে। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের সাবেক এই শিক্ষার্থী নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের দিকে কুষ্টিয়ার শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘আন্দোলনের বাজারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। সম্পাদক ও প্রকাশক মনজুর এহসান চৌধুরীর ভাতিজা এবং সহযোদ্ধা হিসেবে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি আজও সেখানকার সাংবাদিকদের মনে অমলিন। পরবর্তীতে পেশাদার ঠিকাদারি ব্যবসায় মন দিলেও তাঁর মধ্যে সেই প্রগতিশীল আর আন্তরিক মানুষটি হারিয়ে যায়নি।
কয়েক বছর ধরে মোহাম্মদপুরের এই বাসাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন তিনি। রাজধানীর বাবর রোডের আল-মারকাজুল ইসলামীতে গোসল শেষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত্যুকালে মিতু চৌধুরী রেখে গেলেন অসুস্থ মা, স্ত্রী, দুই কন্যা এবং ছোট ভাই-বোন মালা ও মিঠুকে। প্রিয় মানুষটিকে এভাবে অসময়ে হারাবে তা ভাবেনি কেউ। এক লহমার আগুন শুধু একটি বাসাবাড়ি পোড়ায়নি, স্বজন ও সহযোদ্ধাদের বুকে জ্বেলে দিয়ে গেছে চিরকালের শোকের আগুন।
