মঙ্গলবার,

২৫ আগস্ট ২০২৬

|

ভাদ্র ৯ ১৪৩৩

XFilesBd

ধানমন্ডি ক্লাবে সাহিত্য-চিন্তার ২০তম মেলবন্ধন

রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক একটি আধ্যাত্মিক তারের ঝঙ্কারে প্রতিফলিত: উভয়ের রসায়ন বুঝতে তাঁদের মিলনাত্মক রসে ডুব দিতে হবে। 

শোভন বিশ্বাস

প্রকাশিত: ০৩:০৪, ২৫ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০৩:১৪, ২৫ আগস্ট ২০২৬

রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক একটি আধ্যাত্মিক তারের ঝঙ্কারে প্রতিফলিত: উভয়ের রসায়ন বুঝতে তাঁদের মিলনাত্মক রসে ডুব দিতে হবে। 

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার বুকে ইট-কাঠ-পাথরের দেয়াল উতরে মাঝে মাঝে এমন আলোর দ্বীপ জেগে ওঠে, যেখানে কোলাহল ছাপিয়ে প্রাধান্য পায় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মানবিক দর্শনের অনুপম চর্চা। শিল্প-সাহিত্যের নিয়মিত পাঠক, গবেষক ও সৃষ্টিশীল মানুষের এমনই এক নন্দিত ঠিকানা ‘ধানমন্ডি আড্ডা’। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এই মননশীল ফোরামের বিশেষ ২০তম আসর। ২৪ আগস্টে আয়োজিত এই আসরের বিষয়বস্তু ছিল বাংলা সাহিত্যের দুই ধ্রুবতারা—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পারস্পরিক আত্মিক ও সাহিত্যিক মেলবন্ধন প্রসঙ্গে। মোটাদাগে যার শিরোনাম ছিল- রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের রসায়ন

রাজধানীর কোলাহলপূর্ণ সন্ধ্যায় ধানমন্ডি ক্লাবের সম্মেলন কক্ষে জমে উঠেছিল চিরায়ত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। যে আলোচনা সময়ের জন্যই বড্ড বেশি প্রয়োজন। লেখক, কবি, গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো মিলনায়তন পরিণত হয় নিবিড় মননচর্চার কেন্দ্রস্থলে। সবাই ঐকমত্য পোষণ করে বলেন-বর্তমান সময়ে রবীন্দ্র-নজরুলের দর্শন বোঝা ও চর্চা কতোটা জরুরী।

কেনো না একটি পক্ষ যাদের কোন পড়ালেখা-গবেষণা কিংবা জানাশোনা কিছুই নেই তারা অপ্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে হেয় প্রতিপন্ন করছে। নজরুল দর্শনের বিপরীতে দাঁড় করানোর বৃথা চেষ্টা করে বাংলা সাহিত্য ও মননের ব্যাপক ক্ষতি করছে।

আলোচনায় গভীরতর মাত্রা দান করেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ। তিনি তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যকার বাহ্যিক বয়সের ব্যবধান ছাপিয়ে আত্মিক ঐক্যের জায়গাগুলো নিপুণভাবে তুলে ধরেন।

ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ উল্লেখ করেন, রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ককে কেবল দুটি ভিন্ন ধারার কবির সম্পর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি ছিল শ্রদ্ধাবোধ, মহত্ত্ব এবং বাংলা সাহিত্যের পরিধি বিস্তারের এক অনন্য মেলবন্ধন। রবীন্দ্রনাথ যেমন তরুণ নজরুলকে চিনে নিতে ভুল করেননি এবং তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন, ঠিক তেমনি নজরুলও রবীন্দ্র-প্রতিভার অসীমতাকে পরম শ্রদ্ধার সাথে নিজের কাব্যে ও মানসিকতায় ধারণ করেছিলেন।

এই সময়ে রবীন্দ্রদর্শনের মাত্রা কিভাবে জগত ও জীবনে স্বস্তি আনতে পারে তা তুলে ধরেন ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ। অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল। তিনি রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি তুলে ধরে বলেন, দুই মহীরুহের সম্পর্কের রসায়ন ছিল পারস্পরিক মানবিক শ্রদ্ধা ও সাহচর্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিল এক গভীর আত্মিক টান যা বাংলা সাহিত্যকে কালজয়ী সাম্যবাদ ও সুন্দরের আলোয় আলোকিত করেছে।

ধানমন্ডি আড্ডার সাধারণ সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক নূর কামরুন নাহারের ক্ষুরধার ও প্রাঞ্জল সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক শাহীনুর রেজা। উপস্থাপিত প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের এই দুই চিরন্তন ধারার পারস্পরিক আদান-প্রদান, ছন্দ, কবিতা, গান এবং চিন্তাচেতনার বৈচিত্র্যময় সংযোগ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়।

মূল প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে আলোচনায় অংশ নেন 'বাংলার মিশেল ফুকো' হিসেবে খ্যাত চিন্তক, কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব।অত্যন্ত কড়াভাবে তীক্ষ্ণ ভাষায় সৈকত হাবিব তুলে ধরেন কাটমোল্লা টাইপের সাহিত্যিকদের ঘুণে ধরা ভাবনা ও চেতনার প্রসঙ্গ। নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের নানান লেখা ও কবিতার লাইন ব্যাখ্যা করে তিনি স্পস্ট করেই বলেন, নজরুল কড়াভাবে তাঁর লেখনিতে রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিজেস্ব শ্রদ্ধা ও ভাবনার কথা উল্লেখ করে গেছেন। এরপরও মূর্খতা ছড়ানো হচ্ছে। এটি যতো না সাহিত্যিক ভঙ্গিমা থেকে তার চেয়েও মাত্রাতিরিক্তভাবে ছড়ানো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও অন্ধকারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বিশেষ একটি গোষ্ঠী সাহিত্য পরিবেশনার নাম করে রবীন্দ্রনাথের নামে খেতে বিষ ছিটানোর মতো কুতর্ক উগড়ে দিচ্ছেন। তাদের কৃপা করা ছাড়া এই মুহূর্তে কোন উপায়ও নেই।

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ঝর্ণা রহমান, এবং লেখক ও কবি মনি হায়দারসহ অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ রবীন্দ্রচেতনার নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। কবি মনি হায়দার তাঁর আলোচনায় আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্র-নজরুল দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ও তাদের সাহিত্যিক মেলবন্ধনের তত্ত্বীয় ও দার্শনিক দিকগুলো নিয়ে আলোকপাত করেন। কথাসাহিত্যিক ঝর্ণা রহমান রবীন্দ্র-নজরুল যুগের মানবিক আবেদন ও নারীর মনস্তাত্ত্বিক স্থান কীভাবে দুই কবির রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করেন। এছাড়াও অন্যান্য বক্তারা রবীন্দ্র-নজরুল রসায়নের নানা অজানা দিক এবং কীভাবে নজরুলকে কবিগুরু তাঁর 'বসন্ত' গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন ও পরবর্তীতে নজরুলের কারাবাসকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনশন ভাঙার আকুল আকুতি জানিয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো স্মরণ করেন।

ধানমন্ডি আড্ডার ২০তম এই মাইলফলক আসরটিতে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্য, সমাজ ও গবেষণা অঙ্গনের এক বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ। সাংবদিক, কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক ও বিভিন্ন পেশার সুধীজনদের পদচারণায় অনুষ্ঠানটি সংস্কৃতিপ্রেমীদের এক ঐতিহাসিক প্রাপ্তিতে পরিণত হয়। আসরে উপস্থিত থেকে এই আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেন প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক ড. অখিল পোদ্দার, যিনি সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চার নানান দিগন্ত নিয়ে আড্ডার ফাঁকে নিজস্ব মতবিনিময় করেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ ড. সাগর, অধ্যাপক ইব্রাহিম আজাদ, ড. গোলাম মোস্তফা, এবং সুজন বড়ুয়া।

আড্ডায় মননশীল উপস্থিতির উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখেন কবি ও লেখক রোকেয়া ইসলাম, সুজন বড়ুয়া, রোকেয়া ইসলাম, হাসিদা মুন, শিপ্রা সরকার, মুশতাক মুকুল, মিলি হক, শহীদুল জয়, ঝর্ণা রহমান, রেহমান সিদ্দিক, শরণ বড়ুয়া, কনক বিশ্বাস, রুহিনা ফেরদৌস, সুমন সরদার, শওকত হোসেন চৌধুরী, খালেক মল্লিক, ইব্রাহিম আজাদ, শুভ বিশ্বাস, রোমানা আক্তার, ইসমত আরা, আতিকুল ইসলাম, রীনা পণ্ডিত, নাহার ফরিদা খান, ড. গোলাম মোস্তফা, মারুফা জাহান মুক্তি, জেবুন নেসা হেলেন, হামিদ রায়হান, রমজান, শাহীনুর রেজা, ফেরদৌস হাসান, ড. সাগর, শাহনাজ আহমেদ, আহমেদ জসিম, ভবসিন্ধু, আশফাকুজ্জামান, কবি প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব, লেখক গবেষক ও সাংবাদিক ড. অখিল পোদ্দার, শ্যামল কুমার রায়, ফৌজিয়া রুবি, ইশরাত হোসেন বাবলু, নূর কামরুন নাহার, টোটন চন্দ্র দাস, সোহেল চৌধুরী, সুমাইয়া আজিজ। আলোচনা শেষে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী রোমানা ইসলাম ও ভবসিন্ধু।

যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততার মধ্যে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘ধানমন্ডি আড্ডা’। দেখতে দেখতে ২০টি আসর পেরিয়ে এই আড্ডা আজ ঢাকার অন্যতম প্রধান মননশীল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। প্রতি আসরেই সাহিত্য, দর্শন, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।

ধানমন্ডি আড্ডার ২০তম আসরে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এ ধরনের নিয়মিত আয়োজন কেবল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয় না, বরং তরুণ প্রজন্মের মাঝে সঠিক মানবিক মূল্যবোধ, সাহিত্যপ্রেম ও শিল্পবোধ জাগিয়ে তুলতেও অনন্য ভূমিকা রাখে। রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের যে উদারতা, সাম্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল, তা আজকের এই সমাজব্যবস্থায় ও মননশীল চর্চায় অত্যন্ত জরুরি এক অনুপ্রেরণা।

রাত নেমে এলেও ধানমন্ডি ক্লাবের সেই মিলনায়তনে যেন থামছিল না অনুভূতির সুর। রবীন্দ্র ও নজরুলের শাশ্বত সাহিত্য-রসায়নের অনুপম পাঠ এবং একের পর এক গুণী মানুষের মননশীল আলোচনার রেশ সঙ্গে নিয়েই রাতের ধানমন্ডি ক্লাবের প্রাঙ্গণ ছাড়েন উপস্থিত অতিথিবৃন্দ। ‘ধানমন্ডি আড্ডা’ আগামী দিনেও এভাবে সাহিত্যপ্রেমীদের একসূত্রে বেঁধে রাখবে—এমনই এক আনন্দময় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এর সভাপতি বহুলপ্রজ লেখক ডা. মোহিত কামাল ও সাধারণ সম্পাদক লেখক কবি নূর কামরুন নাহার।