২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়া সংক্রান্ত গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক খবর জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। তবে নিছক একমুখী পরিসংখ্যানের আড়ালে আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল মূল বাস্তবতা। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ ও থানাভিত্তিক সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রচারিত নিখোঁজের সিংহভাগ শিশুই ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে বা সশরীরে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। গণমাধ্যমে তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় একটি বড় ধরনের বিভ্রান্তির জন্ম হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পুলিশি তথ্য নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দূর হয়। পুলিশ সদর দফতরের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, আলোচিত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের ঘটনা জিডি আকারে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এর ইতিবাচক দিক হলো, এ সময়ের মধ্যে পুলিশি তৎপরতা ও অন্যান্য উপায়ে মোট ১৩ হাজার ৬৭৯ জন শিশু উদ্ধার সক্ষম হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ৮৭ শতাংশই নিজ নিজ পরিবারে ফিরে এসেছে এবং উদ্ধার না হওয়া শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজের মাত্র ১৩ শতাংশ।

বয়সভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে নিখোঁজের ঘটনার ধরণে স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নিখোঁজ হওয়া জিডির সংখ্যা ছিল ৪৭৪টি, যার মধ্যে ৪০৬ জন শিশুই উদ্ধার হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি। এই বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে নিখোঁজ হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো পথ চেনার অক্ষমতা, পরিবারের সাথে ঘুরতে গিয়ে ভুলবশত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, নিজের নাম বা ঠিকানা স্পষ্টভাবে বলতে না পারা এবং একাকী বাসায় ফিরতে গিয়ে ভুল পথে চলে যাওয়া। এটি মূলত দুর্ঘটনাজনিত অসচেতনতার ফল।

অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজের ঘটনা পরিসংখ্যানগতভাবে অনেক বেশি, যা প্রায় ১৫ হাজার ২৪৩টি। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে এবং উদ্ধার না হওয়া শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৯৭০ জন। এই বয়সের শিক্ষার্থীদের নিখোঁজ বা বাড়ি ছাড়ার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। দেখা গেছে, অভিভাবকের সাথে মানসিক দূরত্ব, পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি, স্বাধীনা জীবনযাপনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ কিংবা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে সমাজে মুখ দেখানোর ভয়ে আত্মগোপন করার প্রবণতা এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া বন্ধুদের প্ররোচনা কিংবা পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবেও অনেকে সাময়িকভাবে বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজের তকমা লাগিয়েছে।
বর্তমান সময়ে নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান দ্রুত বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় প্রযুক্তিগত কারণ রয়েছে। পুলিশি সেবা সহজ করার অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি চালু হওয়ায় এখন নাগরিকেরা ঘরে বসেই অতি দ্রুত থানায় তথ্য নথিভুক্ত করতে পারছেন। আগে থানায় যাওয়ার ঝামেলা এড়াতে অনেক পরিবার হয়তো একদিন অপেক্ষা করতেন, কিন্তু এখন সঙ্গে সঙ্গেই জিডি করা হচ্ছে। ফলে কাগজপত্রে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা নিখোঁজের মোট পরিসংখ্যানে নেতিবাচক হিসেবে দেখা গেলেও মূলত এটি সচেতনতা ও সহজ সেবার ফল। অনুসন্ধানে এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, নিখোঁজের বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং এর সাথে পারিবারিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা গভীরভাবে যুক্ত।
