স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় যেন একজন সহকারী প্রকৌশলীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বদলি সংক্রান্ত সরকারি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও টানা এক যুগ (১২ বছর) ধরে তিনি একই জেলা দপ্তরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ঠিকাদারদের সাথে অংশীদারত্বে ব্যবসা, ভুয়া বিল উত্তোলন, নথিপত্র জালিয়াতি এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে চরম অসদাচরণের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের তির এলজিইডি পটুয়াকালের সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. কামাল হোসেনের দিকে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখার নীতিমালা (স্মারক নম্বর: ৪৬.০৬৭.০১৫.০০.০০.০৬৬.২০১৫-৫২৭) এর (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের সহকারী প্রকৌশলীকে নিজ জেলা এবং স্পাউসের জেলা ব্যতীত অন্য যে কোনো জেলায় বদলি বা পদায়ন করার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মানুযায়ী মো. কামাল হোসেনের নিজ জেলায় চাকরি করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া নীতিমালার (খ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে—কোনো কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ ৩ (তিন) বছরের জন্য কোনো জেলায় বদলি বা পদায়ন করা হবে এবং একই জেলায় ৩ বছর অতিক্রম হলে তাকে আবশ্যিকভাবে অন্যত্র বদলি করতে হবে। অথচ সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে মো. কামাল হোসেন বিগত প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ৩টি ভিন্ন ধাপে ঘুরেফিরে পটুয়াখালী এলজিইডিতেই অবস্থান করছেন। নিজ জেলায় বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বহাল তবিয়তে থাকার নেপথ্যে তিনি উচ্চ মহলে আর্থিক সুবিধা প্রদান করেন মর্মে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিচয় বদলে কার্যালয় জুড়ে প্রভাব বিস্তার করে রাখার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এলজিইডির মাননিয়ন্ত্রণ শাখাকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন কামাল হোসেন। ওই শাখায় নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের এক ভাতিজাকে বসিয়ে রেখে ঠিকাদারদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করার অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদাররা কাজের বিল পাসের জন্য মাননিয়ন্ত্রণ শাখায় এলে কাজের মানে কাল্পনিক ত্রুটি ধরে বিল আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে 'কাজের মান ঠিক নেই'—এমন ভয় দেখিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয় এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।
২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রুটিন মেইনটেনেন্স কাজের নির্বাচিত ঠিকাদারদের চাপ দিয়ে তিনি নিজে নামমাত্র কাজ করে অর্থ আত্মসাৎ করেন। প্রতি বছর এই ৫০ লক্ষ টাকার বরাদ্দ যেন তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার মূলধনে পরিণত করেছেন। এর আগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যতবার এই দপ্তরে কর্মরত ছিলেন, তিনিই এই অর্থ ব্যয় করেছেন; কিন্তু তাঁর নিজের ব্যবসার উন্নতি ছাড়া রাস্তার কোনো অগ্রগতি হয়নি। জানা যায়, এক প্রভাবশালী ঠিকাদারকে ব্ল্যাকমেইল করে কাজটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন কামাল হোসেন। পরবর্তীতে কোনো মালামাল ক্রয় না করেই তিনি বিল উত্তোলনের চেষ্টা চালান। তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মালামাল না কিনে বিল প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে, তাঁর ওপর চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা বদলি হলে পরে যোগদান করা মোঃ বোরহান উদ্দিন নামক কর্মকর্তার সহায়তায় মালামাল ক্রয় ছাড়াই ওই ভুয়া বিল পাস করিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলে দপ্তরে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) অনুস্বাক্ষরের জন্য নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর আবশ্যিক। তবে কামাল হোসেনের ২০২৫ সালের জানুয়ারি–এপ্রিল মাসের আংশিক এসিআর-এ নেননি সেই সময়কার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর; বরং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সদর দপ্তরে জমা দিয়েছেন—তা নিয়ে অফিসে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ববর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসারকে বাদ দিয়ে এসিআর সংগ্রহ করা সরকারি চাকরির আচরণবিধির মারাত্মক লঙ্ঘন। জানা গেছে, অসদাচরণের দায়ে এসিআর-এ নম্বর কম পাওয়া ও পদোন্নতি আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় তিনি এই জালিয়াতির আশ্রয় নেন।
সহকর্মী ও কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর অশোভন আচরণের রেকর্ড রয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে কার্যালয়ের রেস্ট হাউজে এক বিশেষ অতিথির সাথে কামাল হোসেনের ছোট ভাই দেখা করতে চাইলে কর্তব্যরত পুলিশ ও আনসার সদস্যরা বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর নিষেধ সত্ত্বেও কামাল হোসেন আনসার কমান্ডার ও সদস্যদের অকথ্য ভাষায় সবার সামনে গালাগাল করেন। এ কারণে তাঁকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়। তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত ওই সতর্কীকরণে তাঁর আচরণকে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর বিধি ২(এফ) অনুযায়ী 'অসদাচরণ' এবং বিধি ৪(৫)(সি) অনুসারে দণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। আর এই ঘটনার পরপরই ঘটে এসিআর জালিয়াতির ঘটনা।
সহকারী প্রকৌশলী পদে কর্মরত থাকলেও অফিসিয়াল দাপ্তরিক চিঠিপত্র বা নথি পর্যালোচনার মৌলিক দক্ষতা কামাল হোসেনের নেই বলে জানিয়েছেন দপ্তরের একাধিক কর্মচারী। অফিসের কম্পিউটার অপারেটরের ওপর নির্ভর করেই তিনি দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে নেন। দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দীর্ঘমেয়াদী একই কর্মস্থলে অবস্থান এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের যে পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে—তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অডিট নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন ঠিকাদার মহলের দাবি, পটুয়াখালী এলজিইডির সামগ্রিক কাজের স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শুরু করা উচিত
