বৃহস্পতিবার,

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

|

ভাদ্র ২৫ ১৪৩৩

XFilesBd

হলুদ সাংবাদিকতা ও কায়েমি স্বার্থচক্রের ফাঁদে ভূমি প্রশাসন: মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ। অভিযান শিগগিরই

আবু সাহিদ, টঙ্গী-রূপগঞ্জ ঘুরে এসে

প্রকাশিত: ০২:১৫, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০২:১৭, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হলুদ সাংবাদিকতা ও কায়েমি স্বার্থচক্রের ফাঁদে ভূমি প্রশাসন: মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ। অভিযান শিগগিরই

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসগুলোতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের টিকিয়ে রাখাই এখন জেলা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাভার, রূপগঞ্জ, টঙ্গী কিংবা কেরানীগঞ্জের মতো শিল্প ও আবাসন অর্থনৈতিক বলয়কেন্দ্রিক ভূমি কার্যালয়গুলোতে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ এবং কায়েমি স্বার্থচক্রের প্রভাব দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি চিহ্নিত অসাধু চক্র ভূমি সংক্রান্ত নানাবিধ অবৈধ সুবিধার ফাইল পাস করাতে ব্যর্থ হয়ে এবং নিজেদের পছন্দের লোক বসাতে একের পর এক ভিত্তিহীন ও মানহানিকর সংবাদ প্রচার করে কর্মকর্তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যাপারটি ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার পর নড়েচড়ে বসেছে মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অন্য অধিদফতরের কর্মকর্তাগণ। ইতোমধ্যে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে অবহিত করার পর এহেন কর্মকাণ্ড রোধ করতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। সচিবের পিএস আবু হারিস মিয়ার বরাত দিয়ে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শীঘ্রই ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধ ও মাঠ লেভেলের কর্মকর্তাদের বিরক্ত বন্ধ করতে অভিযান শুরু করবে। ইতোমধ্যে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের সাথেও বিষয়টি নিয়ে মত বিনিময় করেছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোর জমিজমার বাজারমূল্য আকাশচুম্বী হওয়ায় এসব এলাকার ভূমি অফিসের ওপর সব সময়ই ভূঁইফোড় ‘অনলাইন নিউজ পোর্টাল’ ও তথাকথিত অপসাংবাদিকদের নজর থাকে। সরকারি খাসজমি রক্ষা করা, ক-শ্রেণির জমির অবৈধ নামজারি রোখা কিংবা দালালমুক্ত সেবা দিতে গিয়ে বারবার তোপের মুখে পড়ছেন মাঠপর্যায়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভূমি সহকারী কর্মকর্তারা। সম্প্রতি সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেটের চক্রান্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই কার্যালয়ে নিজের বা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে না পেরে একটি চক্র মনগড়া ও কাল্পনিক তথ্য দিয়ে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে একের পর এক ‘সংবাদ তৈরি’ করে তা অনলাইনে প্রচার করছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, মূলত সততার সঙ্গে কাজ করা এই কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেইল করে সরিয়ে সেখানে নিজেদের অনুগত কোনো কর্মকর্তাকে বসানোই এই চক্রটির মূল লক্ষ্য।

একই ধরনের প্রশাসনিক বন্ধ্যত্ব তৈরি হয়েছে রূপগঞ্জ এবং গাজীপুরের টঙ্গী ভূমি কার্যালয়েও। তথাকথিত ও ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের অনবরত হয়রানি, ভুয়া খবরের ভয় দেখানো এবং সামাজিক হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সেখানে কর্মরত কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পেশাগত নিরাপত্তা ও সম্মানহানির ভয়ে এখন কোনো সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা এসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসে পোস্টিং নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর এই মনস্তাত্ত্বিক চাপের সত্যতা স্বীকার করে জানান, অপসাংবাদিকতার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাই নন, খোদ জেলা প্রশাসনও এর ভুক্তভোগী। জেলা প্রশাসক স্পষ্ট ভাষায় জানান, "মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কী বলব, আমি নিজেও অসাধু চক্রের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। তবে কে যোগ্য আর কে অযোগ্য বা অসৎ, তা প্রশাসন ভালোভাবেই জানে। কোনো ভূঁইফোড় পোর্টাল বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ভুয়া রিপোর্টে কান দিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত দায়িত্বশীল সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে কোনো কর্মকর্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে পদ থেকে সরানো হবে না।"

প্রশাসন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, পেশাদার সাংবাদিকতার আড়ালে যারা কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করে জমিজমার অবৈধ ধান্ধা বা সিন্ডিকেট চালাতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা থেকে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা হারিয়ে যাবেন, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।