Rabindranath Tagore–এর “বৈজ্ঞানিক” কবিতাটি বাহ্যত একটি শিশুমনের কল্পনা ও প্রকৃতিপ্রেমের কবিতা হলেও এর অন্তর্গত স্তরে প্রকৃতি, চেতনা এবং সৃষ্টির গূঢ় সম্পর্কের এক গভীর অনুধ্যান নিহিত রয়েছে। এখানে “বিজ্ঞান” শব্দটি কেবল বস্তুজগতের বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান নয়; বরং অস্তিত্বের অন্তরাত্মাকে অনুভব করার এক বিশুদ্ধ জ্ঞান। খোকা দৃশ্যমান প্রকৃতিকে কেবল বাহ্যরূপে দেখে না; সে তার অন্তর্লীন প্রাণচাঞ্চল্য, সুপ্ত বেদনা ও গোপন প্রস্তুতিকে অনুভব করতে পারে।
কবিতার সূচনাতেই প্রকৃতির এক গভীর জাগরণ ধরা পড়ে—
“যেম্নি মা গো গুরু গুরু
মেঘের পেলে সাড়া
যেম্নি এল আষাঢ় মাসে
বৃষ্টিজলের ধারা”
মেঘের গুরুগম্ভীর ডাক, আষাঢ়ের বর্ষণ এবং পূবালী হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ যেন প্রকৃতির সুপ্ত স্তরগুলিকে জাগিয়ে তোলে। বাঁশবনের মধ্যে হাওয়ার প্রবাহ কেবল শব্দ সৃষ্টি করে না; তা যেন কোনো অদৃশ্য আহ্বানের বাহক হয়ে ওঠে—
“পুবে হাওয়া মাঠ পেরিয়ে
যেম্নি পড়ল আসি
বাঁশ-বাগানে সোঁ সোঁ ক’রে
বাজিয়ে দিয়ে বাঁশি”
এই আহ্বানের পরেই মাটির নিচ থেকে রাশি রাশি ফুলের উত্থান ঘটে। ফুলের এই প্রস্ফুটন নিছক ঋতুচক্রের ফল নয়; বরং সুপ্ত প্রাণের প্রকাশ। তাই খোকা মাকে সতর্ক করে বলে—
“তুই যে ভাবিস ওরা কেবল
অম্নি যেন ফুল
আমার মনে হয় মা, তোদের
সেটা ভারি ভুল।”
ফুল এখানে কেবল ফুল নয়; তারা যেন সুপ্ত চেতনার প্রতীক। মাটির নিচে তাদের অবস্থান কোনো নিস্তব্ধ অন্ধকার নয়; বরং এক গোপন শিক্ষালয়—
“ওরা সব ইস্কুলের ছেলে
পুঁথি-পত্র কাঁখে
মাটির নীচে ওরা ওদের
পাঠশালাতে থাকে।”
এই “পাঠশালা” প্রকৃতির অন্তর্গত প্রস্তুতির ক্ষেত্র। সেখানে তারা নিভৃতে শিক্ষা গ্রহণ করে। তাদের বিদ্যা প্রকাশ্য নয়; তা গোপন সাধনার মতো। তাই কবি বলেন—
“ওরা পড়া করে
দুয়োর-বন্ধ ঘরে
খেলতে চাইলে গুরুমশায়
দাঁড় করিয়ে রাখে।”
এখানে “গুরুমশায়” যেন সেই নিয়ামক শক্তি, যিনি সময়ের পূর্ণতা না আসা পর্যন্ত প্রকাশকে অপেক্ষা করান। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির আগে যেমন নীরব প্রস্তুতি থাকে, তেমনি ফুলের প্রস্ফুটনের আগেও রয়েছে অন্তর্লীন সাধনা।
কবিতায় সময়ও প্রতীকী রূপ ধারণ করেছে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রুক্ষ গ্রীষ্মকে ফুলেরা “দুপুরবেলা” বলে, কারণ তখন মাটিতে রসের সঞ্চার নেই। আর আষাঢ়ের বর্ষা এলে তাদের “বিকেল” হয়—
“বোশেখ-জষ্টি মাসকে ওরা
দুপুর বেলা কয়
আষাঢ় হলে আঁধার ক’রে
বিকেল ওদের হয়।”
বর্ষার মেঘ, বনভূমির শব্দ এবং প্রকৃতির সজীবতা তখন তাদের জন্য মুক্তির আহ্বান হয়ে ওঠে—
“ডালপালারা শব্দ করে
ঘনবনের মাঝে
মেঘের ডাকে তখন ওদের
সাড়ে চারটে বাজে।”
এই “সাড়ে চারটে” প্রকৃতির ছুটির ঘণ্টা। মাটির নিচের শিক্ষার্থীরা তখন ধেয়ে আসে নানা রঙের সাজে—
“অমনি ছুটি পেয়ে
আসে সবাই ধেয়ে
হলদে রাঙা সবুজ সাদা
কত রকম সাজে।”
ফুলের এই বহুরূপী প্রকাশ প্রকৃতির আনন্দ ও বৈচিত্র্যের প্রতীক। কিন্তু তাদের চূড়ান্ত অভিমুখ মাটির দিকে নয়; আকাশের দিকে। তাই খোকা অনুভব করে—
“জানিস মা গো, ওদের যেন
আকাশেতেই বাড়ি
রাত্রে যেথায় তারাগুলি
দাঁড়ায় সারি সারি।”
আকাশ এখানে এক মহাজাগতিক আশ্রয়, যেখানে সমস্ত সত্তা শেষ পর্যন্ত মিলিত হতে চায়। ফুলেরা মাটি ভেদ করে উঠে এলেও তাদের গভীর আকাঙ্ক্ষা সেই অসীমের দিকে। তাই তাদের মধ্যে এত তাড়াহুড়ো, এত ব্যস্ততা—
“দেখিস নে মা, বাগান ছেয়ে
ব্যস্ত ওরা কত
বুঝতে পারিস কেন ওদের
তাড়াতাড়ি অত?”
এই ব্যস্ততা কেবল প্রকৃতির গতি নয়; উৎসের দিকে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তারা যেন হাত বাড়িয়ে আছে এক চূড়ান্ত আশ্রয়ের দিকে—
“জানিস কি কার কাছে
হাত বাড়িয়ে আছে
মা কি ওদের নেইকো ভাবিস
আমার মায়ের মতো?”
এখানে ব্যক্তিগত মা ধীরে ধীরে সর্বজনীন মাতৃসত্তায় রূপান্তরিত হন। ফুলেরা তখন প্রকৃতির নিছক উপাদান নয়; তারা আশ্রয়প্রার্থী প্রাণ, যারা পরম উৎসের দিকে ফিরে যেতে চায়। কবিতার শিশুসুলভ ভাষা ও সহজ চিত্রকল্পের আড়ালে তাই এক গভীর অন্তর্জাগতিক অনুভব ক্রমশ উন্মোচিত হয়। এখানে প্রকৃতি কেবল দৃশ্যমান জগত নয়; বরং সুপ্ত চেতনার এক চলমান বিদ্যালয়, যেখানে প্রতিটি প্রস্ফুটন এক অন্তর্লীন সাধনার পরিণতি।
©️ তারিফ হোসেন
