মানুষের অবচেতন মনে এক ধরনের ছন্দময়তার অনুভূতি সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করে। এই ছন্দ কেবল মানসিক নয়; শরীরের প্রতিটি স্তরেই তার প্রকাশ ঘটে। হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, হরমোন নিঃসরণ এবং স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া সবই নির্দিষ্ট ছন্দ ও চক্রের অধীন। এই অর্থে মানবদেহকে প্রকৃতির বৃহত্তর ছন্দের সঙ্গে অনুরণনের উপযোগী এক জীবন্ত ব্যবস্থা বলা যায়। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে দেখা যায়, যখন মস্তিষ্কের কোনো স্নায়ুপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন বাহ্যিক ছন্দ বা সঙ্গীত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুনর্বাসনে সহায়ক হতে পারে। Rhythmic Auditory Stimulation (RAS) নামক পদ্ধতিতে বাহ্যিক ছন্দ মস্তিষ্কের বিকল্প স্নায়বিক নেটওয়ার্ককে সক্রিয় করে এবং নিউরোপ্লাস্টিসিটির মাধ্যমে নতুন কার্যকর সংযোগ গঠনে সহায়তা করে। ফলে ব্যক্তি পুনরায় চলাচল ও সমন্বয়ের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় যে মানবদেহ ও মন ছন্দের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই সাড়া দেয়। বাংলার মহান সাধক লালন ফকির তাঁর পদে মানুষের অন্তর্গত এই জাগরণকে গভীর প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

“দ্বিদলে মৃণালে সোনার মানুষ উজলে।”
এই সংক্ষিপ্ত চরণে লুকিয়ে আছে মানবচেতনার বিকাশ, আত্ম-অনুসন্ধান এবং অন্তর্গত রূপান্তরের এক বিস্ময়কর ভাষ্য।তান্ত্রিক দর্শনে ‘দ্বিদল’ বলতে সাধারণত দুই পাপড়িযুক্ত পদ্মকে বোঝানো হয়, যা আজ্ঞাচক্রের প্রতীক। এই কেন্দ্রকে অন্তর্দৃষ্টি, মনোসংযোগ এবং উচ্চতর চেতনার দ্বার হিসেবে কল্পনা করা হয়। অন্যদিকে ‘মৃণাল’ আক্ষরিক অর্থে পদ্মের ডাঁটা; রূপক অর্থে এটি মেরুদণ্ড বা সুষুম্না নাড়ির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই প্রতীকী পথে শক্তির ঊর্ধ্বগমনই তান্ত্রিক সাধনার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়।
তান্ত্রিক ব্যাখ্যানুযায়ী কুণ্ডলিনী শক্তি মূলাধার থেকে ক্রমে ঊর্ধ্বমুখে অগ্রসর হয়ে বিভিন্ন চক্র অতিক্রম করে সহস্রারে পৌঁছায়। এই যাত্রা মূলত চেতনার ক্রমোন্নয়নের প্রতীক। লালনের “সোনার মানুষ” সেই পরিশুদ্ধ, সমন্বিত ও জাগ্রত মানবসত্তার রূপক, যিনি নিজের অন্তর্লীন সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করতে সক্ষম হয়েছেন।তান্ত্রিক পরম্পরায় অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞাচক্রকে যথাক্রমে হৃদয়, কণ্ঠ এবং মস্তিষ্ককেন্দ্রিক কার্যকলাপের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, ধ্বনি, চিন্তা ও চেতনার বিভিন্ন স্তর এই প্রতীকী কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হয়। এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তি এক ধরনের অন্তর্গত সুর, স্থিতি ও ভারসাম্যের অভিজ্ঞতা লাভ করে।
আধুনিক গবেষণায় Physiological Coherence বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন কার্যকলাপ অধিকতর সমন্বিতভাবে কাজ করে। এই অবস্থায় মানসিক স্বচ্ছতা, আবেগীয় স্থিতি এবং শারীরবৃত্তীয় সমন্বয় বৃদ্ধি পেতে পারে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটি শারীরবৃত্তীয় সমন্বয়; তান্ত্রিক ভাষায় এটি অন্তর্গত শক্তির সুষম প্রবাহ; আর লালনের ভাষায় এটি “সোনার মানুষ”-এর উন্মেষ।
প্রকৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আমরা এক বিস্ময়কর সামঞ্জস্য ও অনুপাতের উপস্থিতি লক্ষ্য করি। গাছের শাখা-প্রশাখার বিস্তার, শামুকের খোলের সর্পিল গঠন, সূর্যমুখীর বীজের বিন্যাস কিংবা মানবদেহের কিছু কাঠামোতে এমন একটি বিশেষ অনুপাতের ছাপ দেখা যায়, যাকে গণিতের ভাষায় গোল্ডেন রেশিও (Golden Ratio) বা সোনালী অনুপাত বলা হয়। এই অনুপাতকে প্রকৃতির নান্দনিকতা, ভারসাম্য ও স্বাভাবিক বৃদ্ধির এক প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের অন্তর্জগতের সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশকেও এমন এক সুষম অবস্থার প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা যায়। এই প্রেক্ষাপটে লালনের “সোনার মানুষ” কেবল আধ্যাত্মিক সিদ্ধির রূপক নয়; এটি মানুষের সেই পরিপূর্ণ ও সুষম সত্তারও প্রতীক, যেখানে জীবনের বিভিন্ন শক্তি, অনুভূতি, চিন্তা ও চেতনা এক গভীর ভারসাম্যে উপনীত হয়। যেমন গোল্ডেন রেশিও প্রকৃতির বিচিত্র রূপের মধ্যে এক অন্তর্নিহিত সামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়, তেমনি লালনের “সোনার মানুষ” মানুষের অন্তর্লোকের সেই সমন্বিত ও দীপ্ত অবস্থার প্রতীক, যেখানে ব্যক্তি নিজের ছন্দকে মহাবিশ্বের বৃহত্তর ছন্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অনুভব করতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে লালনের “দ্বিদলে মৃণালে সোনার মানুষ উজলে” কেবল একটি আধ্যাত্মিক কবিতার পঙ্ক্তি নয়; এটি মানুষের চেতনা, শরীর, ছন্দ এবং আত্মবিকাশের এক প্রতীকী মানচিত্র। বিজ্ঞান, তন্ত্র এবং বাউল দর্শন তিনটি ভিন্ন জ্ঞানধারা ভিন্ন ভাষায় যেন একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে: মানুষ যখন নিজের অন্তর্গত ছন্দকে উপলব্ধি করতে শেখে, তখন তার মধ্যেই জেগে ওঠে সেই “সোনার মানুষ”যা এক সমন্বিত, সচেতন ও আলোকিত মানবসত্তা।
সম্ভবত এই কারণেই লালনের পদাবলী আজও কেবল লোকসঙ্গীতের সম্পদ নয়; বরং মানবচেতনা, আত্মপরিচয় এবং মহাজাগতিক সামঞ্জস্যের অনুসন্ধানে এক অনন্ত আহ্বান।
©️ তারিফ হোসেন
