ফিকিরচাঁদের ফকিরি
-ড. অখিল পোদ্দার-
তিনি নাম ধরেছিলেন ফিকিরচাঁদ; পরিকল্পিত শাস্ত্রীয়চর্চা কিংবা গুরুপাক-পরম্পরার অভিঘাতে তাঁর গানের জন্ম নয়| অন্যদের যেমনটি হয়, তারচেয়ে ব্যতিক্রম কিন্তু গভীর আবেগের ¯^তঃস্ফূর্ত প্রকাশ ছিল সে সুরের নেপথ্যের অনুসঙ্গ| আশপাশে বাউল-ˆবষ্ণবদের আড্ডা, দেহতাত্ত্বিক আলাপন আর বিপ্লবী ব্যাকুলতার মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল ফিকিরচাঁদ ঘরানার| অসুরের বিরুদ্ধে সুর ক্রমশ প্রধান হয়ে উঠেছিল উনিশ শতকের শেষভাগে| পেছনে ছিল একদল সৃষ্টিশীল মানবের আড্ডা আর সমাজ-সংশ্লিষ্টতার অমোঘ আলেখ্য| এ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয়, সাহিত্যিক জলধর সেন এবং কাঙাল হরিনাথ মজুমদার নিজে| আধ্যাত্মিক চেতনার ইতিহাসে তাই কাঙাল হরিনাথ এবং তাঁর প্রবর্তিত ‘ফিকিরচাঁদ’ বাউলদলের উত্থান এক অভাবনীয় ও ˆবপ্লবিক বিন্যাস বটে|
নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার কুমারখালী তখন নিছক জনপদ| ঊনবিংশ শতাব্দীতে এ স্থানের নাম বেশ আলোচিত কলকাতার সর্বস্তরে| আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক পিঠস্থান হিসেবে ক্রমশ কুমারখালী তখন প্রখ্যাত হতে চলেছে| এ মাটির এক প্রান্তে মহাত্মা লালন ফকিরের বাস, অপরপাশে সমাজ-সšি^ষ্ট কলমযোদ্ধা কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের পর্ণ কুটির| দ্বিজ মহাপ্রাণের মহামিলন কেবল গানের ধারায় নয় মরমী দেহতত্ত্ব আর দায়বদ্ধতার নিরিখে সামাজিক সংস্কার এক ঐতিহাসিক ঘনঘটায় রূপ পেয়েছিল| ‘ফিকিরচাঁদ’ বাউলদলের উৎপত্তি মূলত: প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল এমন আবহ থেকেই| নিভৃত পল্লীর তপ্ত দ্বিপ্রহরে মায়াবি সেই সুরের বীজ উপ্ত হয়েছিল কুমারখালী থেকে| ফিকিরচাঁদের বাউলবাদ পরবর্তীতে হয়ে ওঠে আশাজাগানিয়া এক মতবাদ| সমগ্র বাংলার জনমানসকে প্লাবিত করেছিল সে সুর| বুকের কম্পনে নদীয়াজুড়ে ধাবমান ছিল সে আন্দোলন| বাউলের মূর্ছনা আর বেদনার তীব্রতা মিলে মরমী এক বিপ্লব দানা বাঁধে জনে-জনতায়-সাধারণে|
কালজয়ী এই আন্দোলনের সূচনালগ্ন অত্যন্ত প্রদীপ্ত| কুমারখালী শহর সংলগ্ন হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র কার্যালয় ছিল তাঁদের চণ্ডীমণ্ডপের একটি কক্ষে| এক গ্রীষ্মের দুপুরে অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয়, জলধর সেন, প্রসন্নচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আর ছাপাখানার কর্মীরা মিলে মত্ত হয়েছিলেন গান-বিপ্লবের আলাপনে| তাতে প্রধান হয়ে ওঠে মহাত্মা লালন ফকিরের মানবিক ব্যঞ্জনা| আগে থেকেই সাঁইজির গান উপস্থিতির মনে মরমে পরশ দিয়েছিল| লালনের অতীন্দ্রিয় দর্শনের প্রভাব থেকেই অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয় হঠাৎ বাউল দল গড়ার প্রস্তাব দেন| কিন্তু গান গাইতে হলে নতুন রচনার প্রয়োজন| তো কে করবেন কাজটা! পরীক্ষামূলক অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয় নিজেই কলম ধরলেন| লিখলেন বিখ্যাত সেই পঙক্তি ‘‘সত্য পথের সেই ভাবনা/ ভাব মন দিবানিশি..’’|
গানের রচনা শেষ| ভণিতা তো লাগবে! প্রথা অনুযায়ী বাউল গানে ‘ভণিতা’ বা রচয়িতার নাম যুক্ত করার রেওয়াজ বিদ্যমান| উপস্থিত সুধীজনেরা নানা নাম প্রস্তাব করলেন| কোনোটাই যুতসই হচ্ছিল না| শেষতক অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয় ¯^কীয় ভঙ্গিতে উচ্চারণ করলেন ‘ফিকিরচাঁদ’| মজার ব্যাপার হলো, এই নামের পেছনে কোনো গভীর তাত্ত্বিক আধ্যাত্মিকতা ছিল না; বরং কোন ‘ফন্দি’ ‘ফিকির’ বা উপায়ে সময় কাটানো যায়- এমন কৌতুকবোধ থেকেই নামটির উদ্ভব| এভাবেই জন্ম হলো ‘ফিকিরচাঁদ ফকির’| যাঁর সুর পরবর্তীতে বাংলার ঘরে ঘরে সত্যের বাণী পৌঁছে দিয়েছিল| সুরকার প্রফুল্লচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের জাদুকরী ছোঁয়ায় সেই গানে এমন এক প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হলো যে, তা মুহূর্তেই সাধারণের অন্তরে স্থান করে নিল|
নতুন এই সৃজনকে নিয়ে যাওয়া হয় হরিনাথ মজুমদারের কাছে| অবতারণা হয় অভাবনীয় এক দৃশ্যের| হরিনাথ গানটি শুনেই ক্ষান্ত দিলেন না| অন্তরা শুনে ভাবলেশহীন হয়ে নৃত্য আরম্ভ করলেন| কাঙালের জীর্ণ ঘরে ˆতরি হলো অপার্থিব এক পরিবেশ| সবাই ঠোঁঠেই তখন সুর| হরিনাথ মজুমদার বুঝতে পারলেন, এ গান নিছক বিনোদন নয়| দেশ ও সমাজকে জাগিয়ে তোলার অমোঘ মন্ত্র হবে এই ব্যঞ্জনা| তিনি নিজেও তৎক্ষণাৎ অক্ষয়কুমারকে দিয়ে লিখিয়ে নিলেন তাঁর বিখ্যাত গান— ‘‘আমি কোরবো এ রাখালী কতকাল/ পালের ছ’টা গরু ছুটে কোরছে আমায় হালবেহাল’’| উল্লেখ্য গানে ষড়রিপুকে ছয়টি অবাধ্য গরুর সঙ্গে তুলনা করে তিনি জীবনদর্শনের যে মুসাবিদা করলেন তা সুফি যোগযাজ্ঞের অনন্য আধেয়|

লালন তাঁর গানে ‘পড়শি’ বা পরমাত্মার বর্ণনা দিয়েছিলেন| যাতে হাত-পা বা স্কন্ধ নেই অথচ ক্ষণেক শূন্যে আর ক্ষণেক নীড়ে বাস করার বিশুদ্ধ অতীন্দ্রিয়তা ছিল| কাঙাল হরিনাথ এ ভাবধারাকে মডিফাই করলেন ‘ফিকিরচাঁদ’ ভণিতায়| গাইলেন গান, লিখলেনও| তিনি ছিলেন মাটির মানুষের দুর্দশার নিত্য সাথী| লালন সাঁইয়ের গভীর আধ্যাত্মিকতাকে তিনি সাধারণের জীবন ও ˆনতিকতার সঙ্গে যুক্ত করার এক চমৎকার ‘ফিকির’ বা উপায় খুঁজে বের করলেন| সাঁইজির গান ছিল অন্তর্মুখী সাধনার, আর হরিনাথ চাইলেন সেই সাধনাকে বহির্মূখী করে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার বানাতে| তাই বলতেই হয়-দুই সাধকের সম্পর্কের রসায়নটি ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ ও সুফির আখলাকে ভরপুর| লালন ফকির যখন অপরাহ্ন পর্যন্ত গান গেয়ে সকলকে সতেজ করে রাখতেন, তখন কাঙাল হরিনাথ সেখানে কেবল একজন নিবিষ্ট শ্রোতাই নন| নিষ্ঠ ভক্তের মতো সেই সুরের নির্যাস গ্রহন করে তা কানে কানে বিলিয়ে দিতেন| যেখানে হরিনাথের বিশিষ্টতা রূপকধর্মী সহজবোধ্যতা আর সঞ্জিবনী সুধার চিত্রকল্প ˆতরী করা| লালন সাঁই বলতেন ‘নিগূঢ় কথা’| কাঙাল করতেন ততোধিক সহজ ও বোধেরযোগ্য| অর্থাৎ ‘রাখালি’ বা ‘ষড়রিপু’র মতো অতি পরিচিত গ্রামীণ অনুষঙ্গ দিতেন গানের ভাষা-ভাবে| ফিকিরচাঁদের বিখ্যাত গান— ‘‘আমি কোরবো এ রাখালী কতকাল / পালের ছ’টা গরু ছুটে কোরছে আমায় হালবেহাল’’ তাই অল্প সময়ে মুখে মুখে পৌঁছে যায়| লালন সাঁইজির সুফিপ্রভাবের আরেক প্রভাবক হিসেবেই ফিকিরচাঁদের সুর বেজেছে ধানের মাঠে, গঞ্জের দোকানির কণ্ঠে| কারণ এখানে ‘ছয়টি গরু’ হলো ষড়ঋপু| কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য- যা মানুষের সাধনার ফসল খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে| লালন ফকির যা শিখিয়েছিলেন নির্জনে, কাঙাল হরিনাথ তা প্রচার করলেন জনস্রোতে জনে-জনে|
ফিকিরচাঁদের বাউলসঙ্গীতের গুরুত্ব এখানেই| এটি উচ্চমার্গের দর্শনকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে নিতে পেরেছিল| ‘বাতেনি’ ব্যাপারটি রূপকের মাধ্যমে সরলতর করেছিলেন| সাঁইয়ের মোরাকাবা, ফানার জগতকে ফিকিরচাঁদের কল্যাণে ততোধিক সহজভাবে চিনেছিল নদীয়াবাসী| কারণ এই সরল সহজ ছন্দ ও সুর সামন্ত শোষণের বিরুদ্ধে ˆশল্পিক প্রতিবাদের স্তম্ভ হয়ে উঠেছিল| যে সুরে অন্তরাত্মাকে চেনার পাশাপাশি ভেতরের অহৈতুকি চাওয়া তথা বিপ্লব ও প্রতিবাদকে উস্কে দিতো| সাঁইয়ের মর্ম বুঝতো সাঁইয়ের শিষ্যগণ| আর ফিকিরচাঁদের দর্শন বুঝতো আমজনতা| পরবর্তীতে অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয় বা জলধর সেনের মতো বিদগ্ধ ব্যক্তিরা ফিকিরচাঁদের অধ্যাত্মবাদ ও প্রতিবাদী স্মারকের সার্বক্ষণিক সাক্ষ্য হয়েছিলেন| লোকরঞ্জন ও জনসংস্কৃতির মেলবন্ধনে কীভাবে একটি সার্থক জনজাগরণ ঘটানো সম্ভব তা ফিকিরচাঁদের দলবল ভালো করেই রপ্ত করেছিল| দেড় শতাব্দী পরেও কাঙাল হরিনাথ তথা ফিকিরচাঁদের অনন্ত সুর ও দর্শন আমাদের আত্মানুসন্ধানের প্রেরণা দেয়| খোরাক জোগায় মন ও মননের অনুভূত অচিনপাখির|
ফিকিরচাঁদের দলবল গান গাইতে গিয়ে প্রায়ই সাজগোজ করতো| কৃত্রিম দাড়ি লাগিয়ে, একতারা আর খঞ্জনি নিয়ে গড়াইয়ের দু’তীর ধরে সুর ফলাতো| এমন বহু সন্ধ্যা গেছে যেখানে ‘গ্রামবার্তা’ প্রেসের কর্মীরা আলখেল্লা পরে সুফি দরবেশ সেজে ফিকিরচাঁদের গান করছেন| ১৮৮০-র দশকে নিদাঘ সন্ধ্যার সেসব গান মাতোয়ারা করেছে কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত জনপদের মানুষকে| আবালবৃদ্ধবনিতা রাস্তায় ছুটে সামিল হয়েছেন নগরকীর্তনে| ফিকিরচাঁদের ভণিতা শুনে বৃদ্ধদের চোখে নামতো জলের ধারা| দেউড়ি বেড়ার ফাঁক গলিয়ে সুরের ধ্বনি শুনতেন গৃহস্থবাড়ির মেয়েরা| কাপড়ের খুঁট খুলে নাকের জল মুছতেন বৃদ্ধা|
বাউল গানকে সাধন-ভজনের গোপন গণ্ডি থেকে বের করে শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কাঙাল হরিনাথ| কারণ তিনি ছিলেন উপমহাদেশের প্রতিবাদী সম্পাদক| তাই যে কোনো ফিকির, ফন্দি বা উপায়ে গণমানুষের মুক্তির দর্শন কান থেকে কানে পৌঁছে দেয়াটাই ছিল ‘ফিকিরচাঁদের’ চ্যালেঞ্জ|
বাউল গানের প্রথাগত ‘ভণিতা’ হিসেবে ‘ফিকিরচাঁদ’ নামটি নির্বাচনের পেছনে এক সূক্ষ্ম কৌতুক থাকলেও এর অন্তরালে ছিল জীবনের পরম ‘ফিকির’ বা উপায় খোঁজার গভীর আর্তি| ফিকির চাঁদের বাউলসঙ্গীত সাধনার নেপথ্যের ইতিহাস বলতে গিয়ে সাহিত্যিক জলধর সেন বলেছেন-‘একবার গ্রীষ্মের সময় শ্রীমান অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয় ভায়া বাড়ীতে (কুমারখালী) আসিয়াছেন| তিনি তখন বি, এল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন| আমি তখন স্কুলমাষ্টার| আমারও গ্রীষ্মাবকাশ| আমরা তখন বাড়ীতে বসিয়া কাঙ্গালের বড় সাধের গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার সম্পাদন করি, আর অবসর সময় আমোদ আহ্লাদে কাটাইয়া দিই|
এই সময়ে একদিন মধ্যাহ্নকালে গ্রীষ্মের জ্বালায় অস্থির হইয়া গ্রামবার্তার ‘কাপি’ লেখা পরিত্যাগ করিয়া আমরা হাত পা ছড়াইয়া বিশ্রাম করিতেছি| স্থান গ্রামবার্তার আফিস অর্থাৎ কাঙ্গাল হরিনাথের চন্ডীমণ্ডপের একটী কক্ষ| উপস্থিত শ্রীমান অক্ষয়কুমার, গ্রামবার্ত্তার প্রিন্টার (এক্ষণে পরলোকগত) প্রফুল্লচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, কুমারখালী বাঙ্গালা স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত প্রসন্নচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আমি এবং ছাপাখানার ভুতের দল| ভুতের দল ব্যাকরণ বা সাহিত্যে পণ্ডিত ছিল না, কিন্তু তাহারা সকলেই বেশ গান করিতে পারিত, কারণ তাহারা সকলেই কাঙ্গালের শিষ্য| চুপ করিয়া শয়ন করিয়া থাকা আমাদের কাহারও কোষ্ঠীতে লেখে না| সেই দ্বিপ্রহরে রৌদ্রের মধ্যে কি করা যায়, ইহা লইয়াই একটা তর্ক আরম্ভ হইল| তর্ক বেশ চলিতে লাগিল, কিন্তু কর্ত্তব্য স্থির হইল না; তর্কের যাহা গতি হইয়া থাকে তাহাই হইল|’
উল্লেখ্য, সাহিত্যিক জলধর সেনের পূর্বপুরুষের নিবাস উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাতে| প্রপিতামহের চাকরির সুবাদে তাঁরা কুমারখালীতে থিতু হয়েছিলেন| জলধর সেনের জন্ম কুমারখালীতে ১৮৬০ সালে| ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রেশমকুঠির দেওয়ানির চাকরি করতেন তাঁর প্রপিতামহ| এ বর্ননায় তিনি আরও উল্লেখ করেছেন- ‘অক্ষয় বলিলেন যে, ‘একটা বাউলের দল করিলে হয়না?’ এ কথাটা মনে হইবারও একটা কারণ ঘটিয়াছিল| সে দিন প্রাতঃকালে লালন ফকির নামক একজন ফকির কাঙ্গালের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন| লালন ফকির কুমারখালীর অদূরবর্তী কালীগঙ্গার তীরে একটা স্থানে থাকিতেন| তাঁহার অনেক শিষ্য ছিল| লোকটা ধর্মজগতে অনেকটা অগ্রসর হইয়াছিলেন| তিনি কোন& সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন তাহা বলা বড়ই কঠিন, কারণ তিনি সকল সম্প্রদায়ের অতীত রাজ্যে পৌঁছিয়াছিলেন| তিনি বক্তৃতা করিতেন না, ধর্মকথাও বলিতেন না| তাঁহার এক অমোঘ অস্ত্র ছিল-তাহা বাউলের গান| তিনি সেই সকল গান করিয়া লোকদিগকে মোহিত করিতেন| শুনিয়াছি কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কুটীতে লালন ফকির একবার গান করিয়া সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন| প্রাতঃকাল হইতে আরম্ভ করিয়া অপরাহ্ন তিনটা পর্যন্ত গান চলিয়াছিল; ইহার মধ্যে কেহ স্থান ত্যাগ করিতে পারেন নাই|’
জলধর সেনের বর্ননায় স্পষ্ট হয় যে, মহাত্মা লালন সাঁইজির ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়েই হরিনাথ মজুমদার কাঙাল হয়েছিলেন| পরবর্তীতে ইংরেজদের অত্যাচার হতে রেহাই পেতে ছদ্মনামে গানের ভণিতা উল্লেখ করেছিলেন-‘ফিকিরচাঁদ’| আর ‘ফিকিরচাঁদ’ বাউলদলের বিশেষত্ব ছিল এর গণমুখী চরিত্র| হরিনাথ বুঝেছিলেন-‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র মাধ্যমে শোষক নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে যে লড়াই তিনি করছেন তা সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজবোধ্য হওয়া দরকার| তাই সঙ্গীতকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সামনে নিয়ে এলেন| ‘ফিকিরচাঁদ’ ছদ্মনামে তাইতো একে একে অনেকগুলি গান লিখলেন| সে গানে যেমন ছিল দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিকতা, তেমনি অবিচারের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ কটাক্ষও বিদ্যমান| ফিকিরচাঁদের বাউল দল অল্পদিনের মধ্যে মাগুরার শ্রীপুর, ঝিনাইদহের ˆশলকুপা, ফরিদপুরের মধুখালী, রাজবাড়ির পাংশা ও পাবনা-যশোরের একাংশ ছুঁয়ে দেয়| পদ্মা-গড়াই বিধৌত মানুষের ঘুমন্ত চেতনাকে জাগ্রত করে তোলে সহজেই| ইংরেজসাহেব আর কলকাতার বাবুদের আলোচনার টেবিলে তখন কাঙালের ফন্দি-ফিকির তথা মানবতার সুরে দ্রোহজাগানিয়া সঙ্গীতের ইস্যু|
‘ফিকিরচাঁদ’ বাউলদলের আন্তর্জাতিকমানের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই-কারণ এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সারির এক ‘সাংস্কৃতিক প্রতিবাদী আন্দোলন’| জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনী প্রায়ই ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র কণ্ঠরোধ করতে পদক্ষেপ নিতো| ভাঙচুর করতো কাঙালের জীর্ণ কুটির| ভয় দেখাতো ছাপাখানা জ্বালিয়ে দেয়ার| ছাপা মেশিন নিয়ে রাতের বেলা পত্রিকা ছাপতে হয়েছে দূরবর্তী মাঠের আখ খেতে| এ জন্যই তিনি ভালোবেসে শিষ্যদের বলতেন ‘ছাপাখানার ভুত’| ‘ফিকিরচাঁদ’ ভণিতায় গানের দল গঠন করে এদেরই আবার সাজিয়ে দেন আল্লাখাল্লায়| যাতে সহসা কেউ চিনতে না পারে| ইংরেজ দালালদের লক্ষ্যবস্তুতে যেনো পরিণত না হয়| লালন সাঁইয়ের পরম দর্শন ধারণকারী এই ‘ভুতের দল’ সুরের মশাল জ্বেলেছিল অত্যাচারী শোষকদের শায়েস্তা করতে| ইংরেজদের লাঠিয়ালবাহিনী এসব দেখে ক্রমশ ভয় পেতে শুরু করে|
‘ফিকিরচাঁদ’ নামটি কিভাবে গ্রহন করেছিল কাঙালের দল তার সরস বর্ননা আছে জলধর সেনের লেখায়| সেদিনের স্মৃতি রোমন্থন করে প্রখ্যাত এই ভ্রমণলেখক উল্লেখ করেছেন-‘‘দ্বিপ্রহরের সেই রৌদ্রে শ্রীমান অক্ষয়ের মনে হয়ত হঠাৎ লালন ফকিরের গানের কথা উদিত হইয়াছিল; তাই সে বলিয়া বসিল ‘‘একটা বাউলের দল করিলে হয়না?” সকলেই তখন বলিয়া উঠিলেন ‘‘বেশ, বেশ|’’
‘‘বেশ, বেশ’’ বলাটা খুব সহজ; কিন্তু গান কোথায়?
বাউলের গান তখন তেমন প্রচলিত হয় নাই; কচিৎ কখনও দুই একজন ফকির বা দরবেশের মুখে এক আধটা দেহতত্ত্বের গান আমরা শুনিয়াছি| সে সকল গান কারও মনে ছিল না| পণ্ডিত প্রসন্নকুমার বলিলেন ‘‘নূতন করিয়া গান প্রস্তুত করিতে হইবে|’’ শ্রীমান অক্ষয়কুমার না পারে এমন কার্য্যই নাই| তখনও তিনি যেমন ছিলেন এখনও তাই; বয়সের পরিণতিতে সে ভাবটা এখনও যায় নাই| তিনি যাহা ধরেন তাহাই করিতে পারেন| অক্ষয়কুমার বলিলেন ‘‘তার জন্য ভয় কি? ধরত জলদী, কাগজ; বাউলের গানই লেখা যাক&|’’ আমি তখন কাগজ কলম লইয়া বসিলাম| গ্রামবার্তার কাপি লিখিবার জন্য যে কাগজ গোছাইয়া বসিয়াছিলাম, তাহারই শ্রাদ্ধ করিতে বসিলাম|’
জলধর সেনের বর্ননা থেকে বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আঠার শতকের খণ্ডিত নদীয়ার চিত্র| কুমারখালীর প্রত্যন্ত জনপদে এমন কথাবার্তা আর দৃশ্য এখনও বিদ্যমান| ‘ফিকিরচাঁদ’ নামকরণের চূড়ান্ত ইতিহাস বলতে গিয়ে জলধর সেন শেষতক বলেছেন-‘‘ পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন ‘‘কথাটা বুঝিলে না| বাউলের গানের নিয়ম হচ্ছে এই যে, গানের শেষে একটা ভণিতা দিতে হয়| কেমন?’’ অক্ষয় বলিলেন ‘‘সেই কথাই ত ভাবছি|’’ তখন এক এক জন এক একটা নাম বলিতে লাগিলেন| কিন্তু কোনটাই ‘ভোটে’ টিকিল না| আমি বলিলাম ‘‘অত গোলে কাজকি| গানটা নিয়ে কাঙ্গালের কাছে যাই, তিনি শেষ অন্তরা এবং ভণিতা ঠিক কোরে দেবেন|’’ অক্ষয় বলিলেন, ‘‘তা হবে না; তাঁকে একেবারে ংঁৎঢ়ৎরুব (অবাক&) কোরতে হবে| রও না, আমিই একটা নূতন নাম ঠিক কোরছি|’’ এই বলিয়া একটু মাথা চুল্কাইয়া বলিলেন ‘‘লেখ জলদী| ‘‘আমি কলম ধরিলাম, অক্ষয় শেষ অন্তরা বলিলেন-
ফিকিরচাঁদ ফকির কয় তাই, কি কর ভাই,
মিছামিছি কর ভাবনা
চল যাই সত্য পথে, কোন মতে,
এ যাতনা আর রবে না|
ব্যস&| গানের ভণিতা হইয়া গেল| সকলে এক বাক্যে ¯^ীকার করিলেন ফিকিরচাঁদ নামটা ঠিকই হইয়াছে| আমাদের ত আর ধর্মভাব ছিল না, কোন ফিকিরে সময় কাটানো আমাদের উদ্দেশ্য| ফিকিরচাঁদ নামের ইহাই ইতিহাস|’
‘ফিকিরচাঁদ’ ছদ্মনামে গান লিখে তা নেচে গেয়ে মানুষের ভেতর দ্রোহ জাগানো কাঙালসাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য দিক| এ আলোর অন্য প্রান্তে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা| শোষকের বিরুদ্ধে সর্বহারার মরণপণ চেষ্টা| সেখানে প্রতিনিয়ত ছাপা হয় কৃষকের আর্তনাদ| দুইয়ে মিলে হরিনাথ মজুমদার প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারাদের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন| হরিনাথ মজুমদার ও তাঁর শিষ্যরা কৃষকের বাড়িতে গিয়ে তাদের কষ্টের সাক্ষী হতেন| বলতেই হয়, এটিই ছিল বাংলার প্রথম সার্থক ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম| মানুষের নির্যাতনের চিত্র পত্রিকার পাতায় কিংবা গানের মাধ্যমে নাগরিকদের সাহসী করে তোলা হরিনাথ মজুমদার কেবল একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘পিপলস হিরো’| যাঁর সাংবাদিক সত্ত্বাকে সামনের দিকে ধাবমান করেছিল ফিকিরচাঁদের সঙ্গীত দর্শন|
নীলকরদের বিরুদ্ধে কাঙাল হরিনাথের জিহাদ ঘোষণার পর অনেকেই তখন জোটবদ্ধ হতে শুরু করেন| নদীয়া তথা কুষ্টিয়া অঞ্চলের কৃষকদের জোর করে নীল চাষে বাধ্য করা এবং অবাধ্য হলে নীলকুঠিতে আটকে মারধর করার লোমহর্ষক বর্ণনা নির্ভীকভাবে প্রকাশ করতেন ফিকিরচাঁদ| তাঁর লেখনীর চাপে ব্রিটিশ প্রশাসন তদন্ত করতে বাধ্য হতো| ইংরেজ সাহেবরাই শুধু নয়, স্থানীয় শোষক জমিদারদের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন খড়গহস্ত| জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেটের প্রজাদের ওপর নায়েব-গোমস্তাদের জুলুমের কথা তিনি গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় তুলে ধরেছিলেন| ফলত: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বের কাছেও অভিযোগ যায় এবং পরবর্তীতে জমিদারি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন ঠাকুর পরিবার| ‘ফিকিরচাঁদ’ নানান ধরণের ফন্দি এঁটে এসব খবরাখবর সংগ্রহ করতেন এবং ছাপতেন| সাংবাদিক কিংবা আধ্যাত্মিক সাধকদের যতোটা কৌশলী হতে হয় তিনিও তাই করেছিলেন! তাঁর লেখনীতে ক্ষিপ্ত হয়ে জমিদাররা বহুবার ছাপাখানা ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে| এমনও শোনা যায়, ফিকিরচাঁদকে হত্যা করতে ও মুদ্রাযন্ত্র পুড়িয়ে দিতে জমিদারদের পেটোয়াবাহিনী তৎপর হলে লালন সাঁইজির শিষ্য-অনুসারীরা কাঙালের পাশে দাঁড়ান| এমনকি প্রতিবাদী বাউলেরা ফিকিরচাঁদের পক্ষে লাঠিও ধরেন| বাঁশ-কাঠের সড়কি বানিয়ে রাতভর ছাপাখানা পাহারা দিয়েছিলেন বাউলের দল| মানবতারক্ষায় আধ্যাত্মিক সাধক ও নির্ভীক সাংবাদিকের এমন অভিন্ন কর্মসূচি তৎকালীন ইতিহাসের বিরল সাক্ষ্যও বটে| নিছক বিনোদন বস্তু থেকে বাউল গানকে গণজাগরণের রণধ্বনিতে রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন তিনি| একতারা আর খঞ্জনির শব্দে প্রথমদিকে নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতো| পরবর্তীতে সুরের সেই প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষের আকাশে-বাতাসে| তাতে সাধারণ মানুষ খুঁজে পেতেন বেঁচে থাকার নতুন বন্দোবস্ত| ততোদিনে শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উচ্চারণ ‘ফিকির’ বা উপায় ছাড়িয়ে জ্বাজল্যমান মশালে রূপ নিয়েছিল|
লালন সাঁইজি না থাকলে হয়তো ‘ফিকিরচাঁদ’ বাউলের জন্ম হতো না| আবার হরিনাথ না থাকলে লালনের গান হয়তো শিক্ষিত নাগরিকদের কাছে দ্রুততম সময়ে সমাদৃত হতো না| পুরো ব্যাপারটিই একটি নিগুঢ় পরম্পরা| বিনা তারের কমিউনিকেশন যেমন- ‘শুভাশুভ যোগমতে’ তেমনই ছিল দু’জনের সম্পর্ক| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে থাকাকালীন লালন ফকির ও কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তথা ফিকিরচাঁদের সুর ও দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন| গীতাঞ্জলি, গোরা, ডাকঘরসহ আরও কতো লেখায় এর অদৃশ্য স্পর্শ প্রতিভাত| কাঙাল হরিনাথ তাঁর ফিকিরচাঁদী গানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে, আধ্যাত্মিকতা মানে সংসার ত্যাগ নয়| বরং সংসারের ‘বাঁকা পথ’ চিনে সত্যের পথে হাঁটা ও অবিচল থাকা| এভাবে সাঁইয়ের সুফিতত্ত্বকে হরিনাথ মজুমদার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কাঠামোতে দাঁড় করেছিলেন ফিকিরচাঁদী ভঙ্গিমায়|
কাঙ্গাল হরিনাথের এই বাউলসঙ্গীতের একটি বড় ˆবশিষ্ট্য হলো এর দার্শনিক গভীরতা| লালন ফকিরের সহজিয়া দর্শনের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় সংযোগ| লালনের সুরে হরিনাথ খুঁজে পেতেন অতীন্দ্রিয় শান্তি, বেঁচে থাকার বিপ্লব ও দ্রোহের সঞ্জিবনী শক্তি| হরিনাথ মজুমদার তাই মহাত্মা লালনের বিমূর্ত আধ্যাত্মিকতাকে মূর্ত সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন| লালন তাই নামে ফকির আর হরিনাথ মজুমদার হলেন জ্ঞানের কাঙাল| সর্বোপরি লালনের ফকির উপাধির ভাবব্যঞ্জনা সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল¯^রূপ হরিনাথ হলেন ‘ফিকিরচাঁদ’| বাউল ভেদাভেদতত্ত্ব খাঁচায় বন্দি না রেখে একে শোষিত মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনে নবরূপে রূপান্তর ঘটান| তাঁর গানে ‘দীনদয়াল’ বা ‘প্রভু’র কাছে যে প্রার্থনা ছিল, তা আসলে শোষণমুক্ত এক পৃথিবীর আকুতি| দেহ অভ্যন্তরের রিপুর মুক্তিকে তিনি তুলে ধরলেন ইংরেজ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঁচার লড়াই হিসেবে| লালনের সুফি-সুধা বারুদের মতো দেদীপ্য হলো ফিকিরচাঁদের দ্রোহের রসায়নে| নিদাঘ সন্ধ্যাগুলোতে কুমারখালীর পথে পথে যে গানের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, তা আজও আমাদের শেখায় কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়| চিনতে হয় অন্তরের পড়শিকে| জানতে হয় সমাজের দোসরদের| তাই ‘ফিকিরচাঁদ’ কেবল একটি ছদ্মনাম নয়- এটি বাংলার নির্যাতন ও শোষণ সংস্কৃতির অবিনাশী স্পন্দন| তাঁর কৌশলী সঙ্গীত-সুর ও সুধা বাংলার মানুষকে আত্মিক মুক্তি ও সামাজিক সাম্যের পথ দেখিয়েছিল|
১৮৬৩ সালে কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র যাত্রা শুরু| তখন বাংলার গ্রামীণ সমাজ ছিল নীলকর সাহেব এবং অত্যাচারী জমিদারদের নির্মম পেষণে পিষ্ট| হরিনাথ মজুমদারের সাংবাদিকতা ও তৎকালীন সমাজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই দুর্দিনে সবার আগে কলম ধরলেন অদম্য সাহসে| কেবল সংবাদ পরিবেশ করেই ক্ষান্ত নন তিনি| সরেজমিনে তদন্ত করে কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ| কাঙালের লেখনীর তেজে তৎকালীন প্রতাপশালী জমিদার ও নীলকররা তটস্থ থাকত| ইতিহাসের আলোচিত পাবনা কৃষক বিদ্রোহের পটভূমিতে তাঁর নির্ভীক সাংবাদিকতা ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল| গণমানুষের সাংবাদিকতা করতে গিয়ে প্রায়শই মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন তিনি| আর্থিকভাবেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন| এতো সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর প্রবল উপলব্ধি—শুধু মুদ্রিত অক্ষরের সংবাদ দিয়ে আপামর নিরক্ষর জনসাধারণের কাছে সত্যের বার্তা পৌঁছানো সম্ভব নয়| ঐতিহাসিক এ ফরমূলা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলন তথা ‘ফিকিরচাঁদ বাউল’ নামের ঘরানা|
কুমারখালীর মজুমদার বাড়ির সেই জীর্ণ চণ্ডীমণ্ডপে অক্ষয়কুমার ˆমত্রেয়, জলধর সেন ও প্রসন্নচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মেধাবীদের সাথী করে কাঙাল হরিনাথ যে গানের দল গড়েছিলেন তার মূল লক্ষ্য ছিল দুটি| প্রথমত: আত্মিক পরিশুদ্ধি ও দ্বিতীয়ত: সমাজের নবজাগরণ| ফিকিরচাঁদ বাউলদলের উত্থানের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল এক অনন্য গণযোগাযোগ কৌশল| সাংবাদিকতা করতে গিয়েই হয়তো ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট জার্ণালিজম’ এর ব্যতিক্রমী সত্তা রপ্ত করেছিলেন তিনি|
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, ইউরোপে যখন রেনেসাঁ পরবর্তী লোকজ সংস্কৃতিকে জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল, সমসাময়িক কাঙাল হরিনাথ বাংলার এক অজপাড়াগাঁ থেকে লোকসঙ্গীতকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন| তাঁর সাংবাদিকতায় যা ছিল তথ্যের লড়াই, বাউল গানে তা হয়ে উঠল সুরের সংগ্রাম| তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি গানের সুর যতটা দ্রুত মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে, হাজারটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ হয়তো ততটা পারে না| তাই তিনি তাঁর ছাপখানার কর্মীদের নিয়ে গঠন করলেন এমন এক ‘সাংস্কৃতিক ব্রিগেড’| আলখেল্লা পরিহিত এই দল হাতে একতারা, খঞ্জনি আর করতাল নিয়ে গাঁয়ের রাস্তায় গান করেছেন| পাড়ার মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তখন এই ব্রিগেডের পিছু নিয়েছে| বল্যা অত্যাবশ্যক যে, ফিকিরচাঁদের এই ফন্দি ছিল বাংলার প্রথম সারির ‘স্ট্রিট থিয়েটার’ বা পথনাটকের আরেক ফরম্যাট|
তাই কাঙ্গাল হরিনাথ তথা ফিকিরচাঁদের বাউলসঙ্গীত কেবল এক অতীত স্মৃতি নয়, বরং এটি এক চিরন্তন রাজনৈতিক মানবদর্শন| সাংবাদিক হরিনাথ যখন শোষকের দুর্গে আঘাত হানতেন, তখন তাঁর কলম ছিল তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ; আবার সাধক হরিনাথ যখন একতারা হাতে গান ধরতেন তখন তাঁর কণ্ঠ ছিল বসন্ত বাতাসের মতো স্নিগ্ধ| এই কঠোর ও কোমলের সংমিশ্রণই ফিকিরচাঁদ তৎকালীন সমাজে হয়ে উঠেছিলন অনন্য, অনবদ্য এবং শ^াশত| ফিকিরচাঁদ নামের আড়ালে তিনি যে সত্যের মশাল জ্বেলেছিলেন, তা আজও বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের আকাশে নীল নক্ষত্রের মতো ধ্রুব এবং প্রোজ্জ্বলিত| তাঁর এই প্রয়াস শিল্প ও সংবাদের কুশীলবদের গণমানুষের কাছে আনতে চৌম্বকের মতো আন্তরিকভাবে আশা জাগায়|
কাঙালের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ যেমন শোষকদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, তেমনি ফিকিরচাঁদের গান সাধারণ মানুষকে দিয়েছিল আত্মমর্যাদার শিক্ষা| তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ নিরক্ষর কৃষক-সবাই এই গানে সমানভাবে আপ্লুত হয়েছেন| এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হরিনাথের এই নির্ভীক চরিত্র এবং বাউল দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে গেছেন|
[ড. অখিল পোদ্দার, বিশিষ্ট গণমাধ্যমব্যক্তিত্ত্ব, একুশে টেলিভিশনের প্রাক্তন প্রধান বার্তা সম্পাদক}
