রবীন্দ্রনাথের ‘মাস্টারবাবু’: এক বহুতল মিস্টিক পাঠ
- তারিফ হোসেন-
শিশু ভোলানাথ বাংলা সাহিত্যে এমন এক কাব্যগ্রন্থ, যেখানে শিশুমন কেবল সরলতার বিষয় নয়; বরং অস্তিত্বের এক আদিম ও অবিভক্ত অবস্থার প্রতীক। এখানে “শিশু” মানে সমাজপূর্ব চেতনা যে এখনও ভাষা, নৈতিকতা, প্রতিষ্ঠান, পরিচয় ও হিসাবের জগতে সম্পূর্ণ বন্দি হয়নি। শিশুর মধ্যে তাই একই সঙ্গে লীলাময় স্বাধীনতা, অজ্ঞাত গভীরতা এবং এক ধরনের প্রাক্-যুক্তিবোধ (প্রি-র্যাশনাল উইজডম) সক্রিয় থাকে।
অন্যদিকে “ভোলানাথ” নামটি সরাসরি Shiva-স্মারক হলেও রবীন্দ্রনাথের ব্যবহারে তা কেবল পৌরাণিক শিব নন। তিনি এখানে এমন এক সত্তার ইঙ্গিত, যিনি স্মৃতি, পরিচয় ও সামাজিক বিধানের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, অথচ গভীরতম অন্তর্জ্ঞান দ্বারা উজ্জ্বল। ভোলানাথ একই সঙ্গে ভোলা এবং ও অভোলা (অতলস্পর্শী চৈতন্য)। এই আপাত-বিরোধী দ্বৈততাই (প্যারাডক্স) মিস্টিক পাঠের কেন্দ্রীয় শক্তি।
এই কারণেই শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ আধ্যাত্মিক বা মিস্টিক পাঠের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এখানে শিশুর আচরণকে শুধু মনস্তত্ত্ব দিয়ে নয়, অস্তিত্বতত্ত্ব (অন্টোলজি) দিয়েও পড়া যায়। শিশুর খেলা এখানে নিছক বিনোদন নয়; বরং সত্তার স্বতঃস্ফূর্ত গতি। তার অবাধ্যতা কেবল দুষ্টুমি নয়; এটি ভাষা ও প্রতিষ্ঠানের সীমা অতিক্রম করার ইঙ্গিত।

“মাস্টারবাবু” কবিতাটি এই দ্বৈততার এক অসাধারণ উদাহরণ। বাহ্যত এটি একজন মাস্টার ও একটি বিড়ালছানার হাস্যরসাত্মক সম্পর্কের ছড়া। কিন্তু অন্তর্লোকে এটি ভাষা ও ভাষাহীনতা, শাসন ও লীলা, শিক্ষা ও সহজসত্তা, বিভাজন ও অখণ্ডতার সংঘাতকে ধারণ করে।তবে এই পাঠে একটি সূক্ষ্ম সতর্কতাও জরুরি। “মাস্টার”কে সম্পূর্ণ মিথ্যা বা “বিড়ালছানা”কে সম্পূর্ণ পরমসত্তা বলে ফেললে কবিতার মানবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। কারণ রবীন্দ্রনাথের জগতে বিভাজনও লীলার অংশ। শিক্ষা যেমন সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, তেমনি articulation বা প্রকাশের পথও তৈরি করে। ফলে এই কবিতার গভীরতা কোনো একপক্ষের বিজয় নয় বরং দুই বিপরীত সত্যের সহাবস্থানে উভয় পক্ষের উইন উইন সিচুয়েশন ।
“আমি আজ কানাই মাস্টার,
পড়ো মোর বেড়ালছানাটি।”
এখানে “কানাই মাস্টার” প্রথম স্তরে শিশুর খেলা হলেও গভীর স্তরে তিনি সেই চেতনার প্রতিনিধি, যে জগতকে নাম, নিয়ম ও শিক্ষার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করে। “মাস্টার” তাই কেবল অহং নয়; বরং মানবসভ্যতার সংগঠক নীতি (অর্গানাইজিং প্রিন্সিপল)-এর প্রতীক।
তবু এই পরিচয়ের মধ্যে এক সূক্ষ্ম বিদ্রূপ আছে। কারণ যে বিড়ালছানাকে সে “পড়ো” বলছে, সেই বিড়ালছানার মধ্যেই এমন এক স্বাধীনতা আছে, যা তার নিজের মধ্যে নেই।বিড়ালছানাটি এখানে একই সঙ্গে প্রাণীসত্তা, শিশুমন, স্বতঃস্ফূর্ত প্রবৃত্তি (ইনস্টিংকচুয়াল ফ্রিডম) এবং এক ধরনের আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক। তাকে সরাসরি শিব বলা যায় না; বরং বলা যায়, তার মধ্যে শিবসুলভ মুক্ত প্রকৃতি কাজ করছে।
“আমি ওকে মারি নে মা, বেত,
মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।”
এই স্তবকে শাসনের অভিনয় প্রকাশিত হয়েছে। কাঠি এখানে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কিন্তু “মিছিমিছি” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে শাসন প্রকৃত সহিংসতা নয়; বরং সামাজিক ভূমিকার অভিনয় (পারফরমেটিভ রোল)।
মিস্টিক দৃষ্টিতে মানুষের বহু ক্ষমতাই এমন অভিনয়নির্ভর। অহং নিজেকে নিয়ন্ত্রক ভাবে, অথচ অস্তিত্বের গভীর প্রবাহ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
“রোজ রোজ দেরি করে আসে,
পড়াতে দেয় না ও তো মন,”
এখানে “দেরি” কেবল সময়গত বিলম্ব নয়; বরং অস্তিত্বগত অমিল। সভ্যতার সময়রেখা সরলরৈখিক। সেখানে আগে-পরে, নিয়ম-ভঙ্গ, শৃঙ্খলা-বিশৃঙ্খলার হিসাব আছে। কিন্তু বিড়ালছানার অস্তিত্ব চক্রাকার ও প্রবৃত্তিনির্ভর। সে ঘড়ির সময় বোঝে না; সে জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দে বাস করে।
“পড়াতে দেয় না মন”—এই অংশে “মন”কে সাংখ্য দর্শনের আলোকে পড়া যায়। মন হলো সংগঠন, ধারণা ও তুলনার ক্ষেত্র। বিড়ালছানার চেতনা সেই সংগঠিত মানসিকতার অধীন হতে চায় না।তবে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, এই মনহীনতা কোনো superiority নয়; বরং ধারণাপূর্ব (প্রি-কনসেপচুয়াল) অবস্থান।
“ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই
যত আমি বলি ‘শোন্ শোন্’।”
এখানে মাস্টারের আহ্বান মনোযোগের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সভ্যতা চায় কেন্দ্রীভূত মনোযোগ; বিড়ালছানা ফিরে যায় শরীরী স্বতঃস্ফূর্ততায়।
তার হাই তোলা অলসতা যেমন হতে পারে, তেমনি মহাজাগতিক উদাসীনতার (কসমিক ইনডিফারেন্স) প্রতীকও হতে পারে। সে এই শিক্ষানাট্যকে অস্তিত্বগত গুরুত্ব দিচ্ছে না।কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিড়ালছানাকে গৌরবান্বিতও করেন না। তিনি কেবল তার স্বভাবকে স্বাধীন থাকতে দেন। এই সংযমই কবিতাটিকে গভীর করে।
“দিনরাত খেলা খেলা খেলা,
লেখায় পড়ায় ভারি হেলা।”
এই “খেলা” রবীন্দ্র-দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় শব্দ। এখানে খেলা মানে উদ্দেশ্যহীন প্রাণশক্তি (পারপাসলেস ভাইটালিটি)। ভারতীয় মিস্টিক ধারায় বিশ্বসৃষ্টিও এক “লীলা”যার কোনো ব্যবহারিক উদ্দেশ্য নেই; যা স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।বিড়ালছানা তাই উৎপাদনশীলতার জগতে নয়; উপস্থিতির জগতে বাস করে। “লেখাপড়া” এখানে বাস্তবতাকে প্রতীক ও বর্ণে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া। সে সেই বিভাজনের প্রতি অনাগ্রহী।
“আমি বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ’,
ও কেবল বলে ‘মিয়োঁ মিয়োঁ’।”
এটি কবিতার অন্যতম গভীর মুহূর্ত। “চ ছ জ ঝ ঞ” হলো সভ্যতার বর্ণমালা, ভাষাগত শৃঙ্খলা ও চিহ্নব্যবস্থা।অন্যদিকে “মিয়োঁ মিয়োঁ” হলো ভাষাপূর্ব ধ্বনি (প্রি-সিম্বলিক সাউন্ড)অর্থের আগের কম্পন।
এখানে “মিয়োঁ”কে অনাহত নাদের প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়। এটি এমন এক ধ্বনি, যা নির্দিষ্ট অর্থে আবদ্ধ নয়।
তবে বিড়ালছানা ভাষাহীন নয়; সে অন্য ভাষায় কথা বলে। তার ভাষা বর্ণমালার নয়, অস্তিত্বের।
“প্রথম ভাগের পাতা খুলে
আমি ওরে বোঝাই মা, কত—”
“প্রথম ভাগ” এখানে জ্ঞানের সূচনা, কিন্তু একই সঙ্গে বিভাজনেরও সূচনা। ভাষা শেখা মানে নাম শেখা, পৃথকীকরণ শেখা, বাস্তবতাকে শ্রেণীতে ভাঙা।
কিন্তু মিস্টিক চেতনা প্রায়ই সেই বিভাজনের আগের ঐক্যের দিকে ফিরে যেতে চায়।
এখানে “মা” শব্দটিও দ্ব্যর্থক। এটি যেমন বাস্তব মা, তেমনি মহামায়া বা বিশ্বপ্রকৃতিরও প্রতীক হতে পারে।
“চুরি করে খাস নে কখনো,
ভালো হোস গোপালের মতো।”
এখানে নৈতিক শিক্ষার প্রবেশ ঘটে। কিন্তু সূক্ষ্ম বিদ্রূপ হলো—যাকে “গোপালের মতো” হতে বলা হচ্ছে, সে নিজেই লীলাময় চেতনার প্রতিনিধি।
Krishna নিজেও নিয়মভঙ্গকারী divine child-এর প্রতীক। ফলে এই নৈতিক উপদেশ এক পর্যায়ে এসে নিজেই ভেঙে পড়ে।তবে এটিকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা ঠিক হবে না। কারণ মানবসভ্যতা নৈতিক ভাষা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। কবিতাটি সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই হাস্যরস তৈরি করে।
“যত বলি সব হয় মিছে,
কথা যদি একটিও শোনে—”
এখানে মাস্টারের কণ্ঠে প্রথম অস্তিত্বগত হতাশা (একজিস্টেনশিয়াল ফ্রাস্ট্রেশন) ধরা পড়ে। সে বুঝতে শুরু করে যে নির্দেশ আর রূপান্তর এক জিনিস নয়।ভাষা দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মিস্টিক ধারায় চূড়ান্ত সত্যকে তাই প্রায়ই অবর্ণনীয় বলা হয়। তার সামনে ভাষা এসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
“মাছ যদি দেখেছে কোথাও
কিছুই থাকে না আর মনে।
চড়াই পাখির দেখা পেলে
ছুটে যায় সব পড়া ফেলে।”
এখানে প্রবৃত্তি ও স্বতঃস্ফূর্ত মনোযোগের শক্তি প্রকাশিত হয়েছে। বিড়ালছানা নিয়ন্ত্রিত মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না; সে জীবনের তাৎক্ষণিক আহ্বানে সাড়া দেয়।মিস্টিক দৃষ্টিতে এটি এমন এক অবস্থার প্রতীক, যেখানে সত্তা ধারণাগত জগৎ ছেড়ে জীবনের কাঁচা প্রত্যক্ষতার (র’ ইমিডিয়েসি) দিকে ফিরে যায়।
“যত বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ’,
দুষ্টুমি ক'রে বলে ‘মিয়োঁ’।”
এখানে “দুষ্টুমি” নিছক অবাধ্যতা নয়; বরং লীলাময় এড়িয়ে যাওয়া। বিড়ালছানা যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই ভাষাকে ফাঁকি দিচ্ছে। যেন সে জানে—অস্তিত্বকে পুরোপুরি অক্ষরে বন্দি করা যায় না।
“আমি ওরে বলি বার বার,
‘পড়ার সময় তুমি পড়ো
তার পরে ছুটি হয়ে গেলে
খেলার সময় খেলা কোরো।’”
এখানে সভ্যতার মূল দ্বৈততা ধরা পড়েছে। কাজ ও খেলা, কর্তব্য ও স্বাধীনতা—এগুলোকে আলাদা compartments-এ ভাগ করা হয়েছে।কিন্তু বিড়ালছানার কাছে জীবন অবিভক্ত। তার কাছে খেলা ও অস্তিত্ব আলাদা নয়। এইখানে কবিতাটি গভীরভাবে যান্ত্রিক সভ্যতার (অ্যান্টি-মেকানিক্যাল) সমালোচনায় পৌঁছে যায়।
“ভালোমানুষের মতো থাকে,
আড়ে আড়ে চায় মুখপানে,”
এখানে বিড়ালছানা সাময়িকভাবে সামাজিকতার অভিনয়ে অংশ নেয়। সে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সীমা ও অসীমের মাঝখানে দুলতে থাকে।
তার তাকানোয় একই সঙ্গে কৌতূহল, স্নেহ ও এক ধরনের রহস্যময় দূরত্ব আছে।
“এম্নি সে ভান করে যেন
যা বলি বুঝেছে তার মানে।”
এখানে “ভান” শব্দটি অত্যন্ত গভীর। সে বুঝেছে কি বোঝেনি তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু সে বোঝার অভিনয় তৈরি করে।
এইখানেই মিস্টিক paradox। অসীম চাইলে সীমার খেলায় অংশ নিতে পারে, কিন্তু কখনো সম্পূর্ণ আবদ্ধ হয় না।
“একটু সুযোগ বোঝে যেই
কোথা যায় আর দেখা নেই।”
এখানে বিড়ালছানার অন্তর্ধান মুক্ত সত্তার চূড়ান্ত লক্ষণ। যে প্রকৃতিগতভাবে উন্মুক্ত, তাকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
সে ধরা দেয়, আবার মিলিয়ে যায়। ঠিক যেমন ধ্যানের মুহূর্তে মানুষ কখনও গভীর চেতনার ঝলক পায়, কিন্তু তাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারে না।
“আমি বলি ‘চ ছ জ ঝ ঞ’,
ও কেবল বলে
‘মিয়োঁ মিয়োঁ’।”
কবিতার শেষ তাই কোনো সরল পরাজয় নয়; বরং দুই ভিন্ন সত্যের অসম্পূর্ণ সহাবস্থান।মাস্টার এখনও ভাষা শেখাতে চায়। বিড়ালছানা এখনও ভাষাতীত সুরে সাড়া দেয়।মানুষ ভাষা ছাড়া বাঁচতে পারে না, কিন্তু ভাষাই চূড়ান্ত সত্য নয়।
এই “মিয়োঁ মিয়োঁ” তাই শেষ পর্যন্ত এক আদিম আহ্বান—নামের আগে, বিভাজনের আগে, শিক্ষার আগে, সেই অনির্বচনীয় জীবন্ত কম্পনের দিকে।
