শুক্রবার,

০৩ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ১৮ ১৪৩৩

XFilesBd

কেন সরতে হলো মমতাকে?

তৃণমূলের পতন ও বিজেপির উত্থান: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নয়া হাওয়া

ড. অখিল পোদ্দার (Dr. Akhil Podder)

প্রকাশিত: ০১:০৭, ৫ মে ২০২৬

তৃণমূলের পতন ও বিজেপির উত্থান: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নয়া হাওয়া

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপর্যয় এবং বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পেছনে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। নিবিড় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই পরাজয় কেবল একটি নির্বাচন হারানো নয়, বরং গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং কিছু কৌশলগত ভুলের সম্মিলিত ফল।

পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আরজি কর কাণ্ড এবং পরবর্তী জনরোষকে। দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের মনে সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে নারী নিরাপত্তার ইস্যুতে তৃণমূলের 'মহিলা ভোটব্যাংক'-এ বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। নির্যাতিতার মাকে প্রার্থী করে বিজেপি আবেগপ্রবণ ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিসহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে দলের ভাবমূর্তি আগে থেকেই ক্ষুণ্ণ ছিল, যা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বড় ভুল ছিল তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। গ্রাম বাংলায় তৃণমূল কর্মীদের 'দাদাগিরি' এবং সিন্ডিকেট রাজ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ মমতাকে পছন্দ করলেও তার স্থানীয় নেতাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিল। এছাড়া কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নির্বাচন হওয়ায় ভোটাররা ভয়মুক্ত হয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, যা প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়াকে (Anti-incumbency) পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগাতে সাহায্য করেছে।

নির্বাচনী সমীকরণে আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম সংশোধন ও বাদ পড়া। ভোটার তালিকায় এই ব্যাপক রদবদল তৃণমূলের অনেক নিশ্চিত আসনকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল। বিশেষ করে সীমান্ত জেলাগুলোতে এই প্রক্রিয়ার ফলে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকেও কিছুটা ধস নামে। অন্যদিকে, বিজেপি এবার আরও শক্তিশালী হিন্দু মেরুকরণ নিশ্চিত করতে পেরেছে এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা হিসেবে আরও আকর্ষণীয় আর্থিক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহিলাদের বড় অংশের সমর্থন আদায় করেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই এতকাল দলকে টেনে নিয়ে গেছে, কিন্তু এবার সেই 'ব্র্যান্ড দিদি'র জাদুতেও ভাটা দেখা গেছে। খোদ ভবানীপুর কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজয় প্রমাণ করে যে, নিজের দুর্গ রক্ষা করতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলের ভেতরের গোষ্ঠীকোন্দল মেটাতে না পারা ছিল তার বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভুল। সব মিলিয়ে, দুর্নীতির অভিযোগ, নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যর্থতা এবং নির্বাচনী তালিকায় আমূল পরিবর্তনই পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে।