শুক্রবার,

০৩ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ১৮ ১৪৩৩

XFilesBd

হঠাৎ আলোচনায় কাঁটাতার

জমি বুঝিয়ে দেবে ভারত: নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ পার্ট উৎকণ্ঠায়

সুমিত নারায়ণ চৌধুরী, কলকাতা থেকে

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ১২ মে ২০২৬

আপডেট: ২৩:২১, ১২ মে ২০২৬

জমি বুঝিয়ে দেবে ভারত: নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ পার্ট উৎকণ্ঠায়

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা ও কূটনৈতিক আলোচনার আবহ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় দ্রুত জমি বুঝিয়ে দিয়ে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। দিল্লিতে সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন।

এদিকে বাংলাদেশেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত চুক্তি, আন্তর্জাতিক আইন, সীমান্তবাসীর জীবনযাপন এবং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

কী ঘটছে সীমান্তে: 

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়ার আওতায় এসেছে। তবে এখনো কিছু এলাকা রয়েছে যেখানে নদী, জনবসতি, কৃষিজমি কিংবা আইনি জটিলতার কারণে পূর্ণাঙ্গ বেড়া নির্মাণ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সীমান্তে “স্মার্ট ফেন্সিং”, নজরদারি টাওয়ার এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা জোরদার করেছে বলে সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় দ্রুত জমি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। সেই সময়সীমা নিয়েই “৪৬ দিনের পরিকল্পনা” আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ কোনো নথি প্রকাশ করেনি। ফলে প্রকল্পের প্রকৃত বিস্তৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।

জয়সওয়ালের বক্তব্যের তাৎপর্য: 

দিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়াল সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে “ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অংশ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। যদিও তিনি সরাসরি “৪৬ দিনের মধ্যে বেড়া নির্মাণ” প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলেননি, তবু তাঁর বক্তব্যকে সীমান্তে নতুন উদ্যোগের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দিল্লির এই অবস্থান মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আগামী নির্বাচনী সমীকরণের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে সীমান্ত ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

শুভেন্দুর কঠোর অবস্থান: 

পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি একাধিক সভায় বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি সীমান্তে “পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ” এবং “অনুপ্রবেশ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা” নেওয়ার দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশি বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতেই সীমান্ত ইস্যুকে সামনে আনা হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা।

বাংলাদেশের উদ্বেগ যেখানে: 

বাংলাদেশের সীমান্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন করে বেড়া নির্মাণের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাস্তবায়ন। সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই সমঝোতা রয়েছে। ফলে যেকোনো নতুন পদক্ষেপের আগে পারস্পরিক আলোচনা জরুরি। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, সীমান্তে একতরফা উদ্যোগ নেওয়া হলে তা স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী অনেকেই বলছেন, অতিরিক্ত কাঁটাতার বা নজরদারি বাড়লে তাদের দৈনন্দিন চলাচল ও কৃষিকাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সীমান্তের বহু মানুষ দুই দেশের বাজার ও সামাজিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নিরাপত্তা ও মানবিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

নিরাপত্তা নাকি রাজনৈতিক বার্তা: 

বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে নতুন বেড়া নির্মাণ কেবল নিরাপত্তা উদ্যোগ নয়; এর ভেতরে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বারবার বলছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান সম্ভব। ঢাকার একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বলেন, “সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন অনেক গভীর। তাই সীমান্ত প্রশ্নে উভয় পক্ষেরই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।”

সীমান্তপারের বাস্তবতা:

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, যশোর, সাতক্ষীরা কিংবা লালমনিরহাট—বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মানুষের জীবনযাপন অনেকটাই সীমান্তনির্ভর। সেখানে নতুন নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ মানে কেবল কাঁটাতার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমি হারানোর ভয়, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতি। স্থানীয়দের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, নতুন বেড়া নির্মাণের অজুহাতে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, কার্যকর নজরদারি বাড়লে চোরাচালান ও অপরাধ কমবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া না দেখালেও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে যেকোনো নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে যৌথ জরিপ, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত নীতিমালা মেনে চলা জরুরি। অন্যথায় এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সেই বাস্তবতায় সীমান্তে কাঁটাতারের নতুন রাজনীতি দুই দেশের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।