শুক্রবার,

০৩ জুলাই ২০২৬

|

আষাঢ় ১৮ ১৪৩৩

XFilesBd

ঐকমত্য কী উপর উপর নাকি গভীরের

নির্বাচনের পর কোন পথে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক? নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাড়ছে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ

ড. অখিল পোদ্দার (Dr. Akhil Podder)

প্রকাশিত: ০৩:৪৩, ১৯ মে ২০২৬

নির্বাচনের পর কোন পথে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক? নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাড়ছে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি, সংযোগ ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানা প্রশ্নে দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে—নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে এগোবে? একদিকে ভারতে আবারও ক্ষমতায় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), অন্যদিকে বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। আদর্শিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের বাস্তব কূটনীতি এখন কোন সমীকরণে দাঁড়াবে, তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লির কাছে বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী নয়; বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল এবং চীনা প্রভাব মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। গত এক দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ আমদানি ও আঞ্চলিক সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। ফলে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের বড় অংশের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগই ভারতের জন্য সবচেয়ে ‘কমফোর্টেবল’ রাজনৈতিক অংশীদার। কিন্তু বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দিল্লি এখন নতুন হিসাব কষছে। বিএনপি অতীতে ভারতবিরোধী জাতীয়তাবাদী অবস্থানের অভিযোগে সমালোচিত হলেও দলটির বর্তমান নেতৃত্ব প্রকাশ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলছে। বিএনপির কূটনৈতিক বার্তায় এখন “সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব” নীতিকে সামনে আনা হচ্ছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন, ভারতের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্ক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি সরকারেরও বাস্তবতা বিবেচনা করতে হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দিল্লিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে বাধ্য করছে। ফলে রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ থাকলেও দিল্লি প্রকাশ্যে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছে।

তবে এর মধ্যেও কয়েকটি স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে চলে এসেছে। সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ, বিএসএফের গুলি, তিস্তার পানিবণ্টন এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি সরকারের ভেতরে এমন একটি অংশ রয়েছে যারা মনে করে, অতীতে ভারতের সঙ্গে অনেক বিষয়ে বাংলাদেশ “অতিরিক্ত ছাড়” দিয়েছে। ফলে নতুন সরকার কিছু ক্ষেত্রে আরও কঠোর দরকষাকষির পথে যেতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এখন আবার আলোচনার কেন্দ্রে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই ইস্যুতে বাংলাদেশে জনমত অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিএনপি সরকার চাইবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে অন্তত দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতি দেখাতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বিজেপির অভ্যন্তরীণ হিসাবের কারণে দিল্লির পক্ষে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সহজ হবে না। অর্থনৈতিক সম্পর্কও এখন নতুন পরীক্ষার মুখে। বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার হলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের পক্ষে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করে, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। অন্যদিকে ভারত চায় বাংলাদেশ হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরও সহজ ট্রানজিট ও সংযোগ সুবিধা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী মাসগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক “আবেগ” নয়, বরং “বাস্তব স্বার্থ”-এর ভিত্তিতে এগোবে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির মতো ক্ষেত্রগুলোতে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে রাজনৈতিক ভাষ্য ও জনমতের কারণে প্রকাশ্য কূটনীতিতে কিছুটা দূরত্ব দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও সতর্কতা কাজ করছে। তারা দেখছে, বিএনপি সরকার কতটা স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান নেয় এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক কোন মাত্রায় বাড়ায়। একইভাবে ঢাকাও পর্যবেক্ষণ করছে, বিজেপি সরকার বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখবে নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করবে। সব মিলিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সম্পর্কের ভিত এখনও শক্তিশালী, কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশকে কাছাকাছি থাকতে বাধ্য করে। কিন্তু আগের মতো একমুখী রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বদলে এখন সম্পর্ক পরিচালিত হবে বেশি দরকষাকষি, কৌশল ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।