ভালো থেকো মোহাম্মদ: এস এম মতিউর রহমানের যুদ্ধস্মৃতির গল্প ও বিশ্বসাহিত্যের আয়নায় তুলনামূলক পাঠ
- ড. অখিল পোদ্দার
লে. জেনারেল এস এম মতিউর রহমানের ‘আমার সেসব দিনগুলো’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘ভালো থেকো মোহাম্মদ’ রচনাটি প্রথম দৃষ্টিতে একটি সহজ-সরল স্মৃতিচারণ। গল্পটি নিবিরভাবে পাঠ করলে মনে হয়-এটি বিশ্বসাহিত্যের একটি সুপরিচিত ও দীর্ঘজীবী ধারার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। যুদ্ধস্মৃতির সঙ্গে সন্নিষ্ট এমন সাহিত্য বা War Memoir যাকে তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্বে প্রায়ই Testimonial Literature বা সাক্ষ্যমূলক সাহিত্য বলা হয়। এই ধারার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো- লেখক নিজে যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী বা অংশগ্রহণকারী। তাঁর বর্ণনা ইতিহাস ও সাহিত্যের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফরাসি তাত্ত্বিক ফিলিপ লেজুন (Philippe Lejeune) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Le Pacte autobiographique (১৯৭৫) এ ‘autobiographical pact’ বা আত্মজৈবনিক চুক্তির কথা বলেছেন। এরমূল কথা হলো — লেখক, বর্ণনাকারী এবং প্রধান চরিত্র একই ব্যক্তি বলে পাঠকের সঙ্গে একটি অলিখিত চুক্তি স্থাপিত হয়। মতিউর রহমানের রচনায় এই চুক্তি স্পষ্ট এবং প্রতিভাত। আরও বাড়িয়ে বলবো যে এটি সহজাত ও সংস্কৃতি-পরম্পরা। কারণ লে. জেনারেল এস এম মতিউর রহমানের অগ্রজ নাসের মাহমুদ বাংলাদেশের বরেণ্য ছড়াকার। তাঁর পিতাও ছিলেন সৃজনশীল ও উন্নত চিন্তার অধিকারী এবং নিজগুণে গুণান্বিত। সামাজিক গুণপণায় তাঁদের পরিবার আজ অব্দি জনপ্রিয় এবং নমস্য। হয়তো এ কারণেই জেনারেল মতিউর রহমান গল্পগ্রন্থে নিজের নাম, সামরিক পদমর্যাদা, নির্দিষ্ট তারিখ (৬ই আগস্ট ১৯৯৫) এবং প্রকৃত ভৌগোলিক স্থান (জাগরেব, ওরাশে) উল্লেখ করে পাঠকের সঙ্গে সত্যতার অঙ্গীকার বহাল রেখেছেন আনুপূর্বিকভাবে।

জেনারেল এস এম মতিউর রহমানের রচনাশৈলীর সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো নির্মেদ, সংযত গদ্যভাষা। যেখানে আবেগের প্রাবল্য থাকলেও ভাষার আড়ম্বর নেই। সংযমী কিন্তু আভিজাপূর্ণ বর্ণনাভঙ্গি সমসাময়িক বাংলা স্মৃতিকথায় একেবারে লুপ্ত নয় তবে বিরল। যে কারণে তাঁর ‘আমার সেসব দিনগুলো’ পড়ে বারংবার মনে হয়েছে ২০০৩ সালে পড়া খুশবন্ত সিংয়ের ‘ট্রুথ লাভ এন্ড এ লিটল ম্যালিস’ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে পাওয়া এন সি চৌধুরীর আত্মজীবনী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ এ্যান আননউন ইন্ডিয়ান’ এর প্রসঙ্গ। যাপনের অতিরঞ্জনের চেয়ে যেখানে সত্য ও বাস্তবতা পাথুরে সত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শক্তিশালী ভিত্তির ওপর। সমাজ-রাষ্ট্র-সময় একসাথে আঘাত করলেও কুঠুরিবদ্ধ নীতি পিছলে পড়েনি। জেনারেল মতিউরের গল্প পড়ে অবলা সেই নিগুঢ় পরমাদী উপলব্ধী করেছি পরতে পরতে।

বলতে বাধা কি? অনেক লেখকই তো আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে শুধু আলোকময়তাকেই আঁকড়ে থাকেন। বর্ননায় থাকে অতিনাটকীয়তা। ‘আমার সেসব দিনগুলো’ তার ধারেকাছেও নেই। তাঁর গদ্যের মধ্যে সুসংহত বেদনাবোধ (understated pathos) লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বসাহিত্যের একাধিক প্রথিতযশা যুদ্ধ-লেখকের মধ্যে এমন সাদৃশ্য মেলে। বিশেষত আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এরিখ মারিয়া রেমার্ক এবং টিম ও'ব্রায়েনের রচনার সঙ্গে এমন মেলবন্ধন রয়েছে। কাহিনির কাঠামো, চরিত্রায়ণ, প্রতীকবাদ, প্রকৃতি-চিত্রকল্প এবং ভাষাশৈলীর নিরিখের বিচারে ‘ভালো থেকো মোহাম্মদ’ গল্পটি কারুময় ও ঐশ্বর্যপূর্ণ।
তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) হিসেবে এই আলোচনার ঐহিক ভিত্তি মূলত আমেরিকান তাত্ত্বিক রেনে ওয়েলেক (René Wellek) ও অস্টিন ওয়ারেনের (Austin Warren) Theory of Literature (১৯৪৯) গ্রন্থে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণে হয়েছে। যেখানে থিম্যাটিক (বিষয়ভিত্তিক), মরফোলজিক্যাল (গঠনভিত্তিক) এবং জঁরাভিত্তিক তুলনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আমেরিকান তুলনামূলক সাহিত্যবিদ হেনরি রেমাক (Henry H. H. Remak) ১৯৬১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধে তুলনামূলক সাহিত্যকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে যে, এটি একটি জাতীয় সাহিত্যকে অন্য জাতীয় সাহিত্য বা সাহিত্যেতর অন্যান্য জ্ঞানক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কের নিরিখে অধ্যয়ন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেই আমরা লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম মতিউর রহমানের বাংলাদেশি সামরিক অভিজ্ঞতালব্ধ রচনাকে ইউরোপীয় ও আমেরিকান যুদ্ধসাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখব।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য। পাশ্চাত্যের অধিকাংশ ক্লাসিক যুদ্ধস্মৃতি লেখক নিজে যুদ্ধের সরাসরি যোদ্ধা (combatant) ছিলেন, যেখানে মতিউর রহমান জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একজন নিরস্ত্র সামরিক পর্যবেক্ষক (UNMO) হিসেবে যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন। এই অবস্থানগত পার্থক্য তাঁর বর্ণনাভঙ্গিতে একটি বিশেষ দ্বৈততা তৈরি করে। তিনি যুদ্ধের অংশ হয়েও যুদ্ধের বাইরের একজন সাক্ষী, যা তুলনামূলক সাহিত্যে ‘the witness-outsider’ বা সাক্ষী-বহিরাগত দৃষ্টিভঙ্গি নামে পরিচিত একটি বিশেষ কাঠামোর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
এরিখ মারিয়া রেমার্ক, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও জেনারেল মতিউর: প্রসঙ্গ Lost Generation-এর সংযত বেদনা
জার্মান লেখক এরিখ মারিয়া রেমার্কের Im Westen nichts Neues (মূল জার্মান সংস্করণ, ১৯২৮; ইংরেজি অনুবাদ All Quiet on the Western Front, ১৯২৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থগুলোর একটি। এই উপন্যাসে যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করা হয় অলংকারবিহীন, প্রায় প্রতিবেদনধর্মী ভাষায়। খাস বাংলায় বললে, অনেকটা ওয়ার জার্ণালিস্টি-এর ভাষায়। বলার গদ্য সেখানে ঝরঝরে, ক্ষিপ্র ও তরঙ্গময়। আবেগের বিস্ফোরণের বদলে এক ধরনের অবশ, অসাড় বাস্তবতাবোধ উদ্ভাসিত। রেমার্কের বর্ণনাকারী পল বাউমার তরুণ সৈনিকদের মানসিক বিচ্ছিন্নতা ও সাধারণ জীবনে ফিরে আসার অক্ষমতার কথা বলেন। মতিউর রহমানের রচনায়ও একই ধরনের সংযত বর্ণনাভঙ্গি দেখা যায়। তিনি যখন মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া শেলের শব্দ বা মর্টার আঘাতে বাড়ির ছাদ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি এই ভয়াবহ তথ্য জানার পরও নাটকীয় আতঙ্ক প্রকাশ না করে বরং জানিয়ে দেন যে আরও সাত-আট রাত তিনি সেই কক্ষেই কাটিয়েছেন। সুসংহত জীবন এখানে মিথ্যার আশ্রয় নেন নি ন্যূনতম। সংযত এবং প্রায় নিরুত্তাপ স্বীকারোক্তি রেমার্কীয় বর্ণনাশৈলীর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে মৃত্যুর নৈকট্য একটি দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়। লে. জেনারেল এস এম মতিউর রহমান লিখেছেন-
শীতের প্রকোপে প্রায় প্রতিদিনই তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে আমি রুমে চলে আসি এবং বেশি দেরি না করে স্লিপিং ব্যাগের ভিতর ঢুকে যাই। একদিন চিত হয়ে বিছানায় শায়িত অবস্থায় আমার চোখ ঘরের ছাদের একটি জায়গায় আটকে গেলো। ইউরোপের বেশির ভাগ বাড়ির ছাদের মতো এই বাড়ির ছাদও টালি দিয়ে তৈরি। দেখলাম ছাদের কিছু অংশ পলিথিন জাতীয় বস্তু দিয়ে মেরামত করা। বাইরে চাঁদের আলোর একটু আভা পলিথিন ভেদ করে দৃশ্যমান হওয়ায় ভাঙা অংশটি আমার নজরে পড়ে। রাত পার হলে পরদিন সকালে মোহাম্মদের মা ফাতেমা অর্থাৎ আমাদের বাড়িওয়ালিকে ভাঙা ছাদের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান যে, কিছুদিন আগে একটি মর্টার শেল বা বোমা বাড়ির ছাদের উপর পড়লে জায়গাটি ভেঙে যায়। সৌভাগ্যবশত তখন ঐ কক্ষে কেউ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার মতো একটি তথ্য কিন্তু আমার আর কোন উপায় ছিল না। বিষয়টি জানার পর আরও ৭-৮ রাত আমি ঐ কক্ষে কাটিয়েছি। বলাবাহুল্য, আমার জন্য প্রতিটি রাতই ছিল অস্বাভাবিক দীর্ঘ। যে কোন সময় গোলাগুলি শুরু হলে অতি দ্রুত নিচে নেমে বাংকারে যেতে হতো। শীত, রুম হিটারের হিশ হিশ শব্দ আর গোলাগুলির আশঙ্কায় প্রায়ই নির্ঘুম রাত কাটিয়ে একটি নতুন দিনের অপেক্ষায় থাকতাম আমি। (সূত্র: আমার সেসব দিনগুলো, প্রথম প্রকাশ-মার্চ ২০২৬, পৃষ্ঠা ১২ ও ১৩, নবধারা পাবলিকেশন, ঢাকা)
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের A Farewell to Arms (১৯২৯) উপন্যাসেও একই ধরনের mimimal-emotion বর্ণনারীতি লক্ষণীয়। সমালোচকরা যাকে ‘Iceberg Theory’ বলে অভিহিত করেন। হেমিংওয়ে নিজে এই তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর Death in the Afternoon (১৯৩২) গ্রন্থে। যেখানে তিনি বলেন যে, লেখক যদি জানেন তিনি কী বাদ দিচ্ছেন, তাহলে সেই বাদ দেওয়া অংশও পাঠক অনুভব করতে পারেন। ঠিক যেমন হিমশৈলের আট ভাগের এক ভাগ পানির উপরে দৃশ্যমান থাকে আর বাকিটা অদৃশ্য থেকেও তার ভার বহন করে। মতিউর রহমানের রচনায়ও এই ‘বাদ দেওয়ার শিল্প’ লক্ষণীয়। তিনি ৬ই আগস্ট ১৯৯৫ তারিখের একটি ‘অবিস্মরণীয় ঘটনা’র কথা উল্লেখ করেও তা বিস্তারিত না বলে ভবিষ্যতে পৃথক রচনায় বলার প্রতিশ্রুতি দেন। এই ইচ্ছাকৃত নিরবতা পাঠকের মনে যে কৌতূহল ও ভার তৈরি করে, তা হেমিংওয়ের হিমশৈল-তত্ত্বের একটি প্রায় নিখুঁত বাংলা প্রতিফলন। আমার মতে, এ লক্ষণ লেখকের ঐহিক পারঙ্গমতা। কারণ তিনি জানেন যে, তিনি কী বা কে! উদাহরণ দিতে উল্লেখ করতেই পারি ‘ভালো থেকো মোহাম্মদ’ গল্পের বিকিরিত ক’টি লাইন:
জাগরেব শহরে প্রাথমিকভাবে কয়েকদিন থাকার জন্য বাসা ঠিক করে রাখা হয়েছিল। ঐ সময়ে একটি বাসায় ৩-৪ জন থেকে শুরু করে ৭-৮ জন পর্যন্ত অফিসার থাকতো। জাতিসংঘের গাড়িতে চড়ে ছবির মতো সুন্দর জাগরেব শহরের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্ধারিত বাসায় এসে পৌঁছলাম। যুদ্ধের মধ্যেও একটি শহর কত সুন্দর হতে পারে জাগরেব শহর না দেখলে বুঝতে পারতাম না। সমসাময়িক কয়েকজনের সাথে একই বাসায় আমার জন্য থাকার জায়গা করা হয়েছে, সুন্দর পরিপাটি বাসা। সংক্ষিপ্ত অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের পর আমরা যার যার কক্ষে গিয়ে লম্বা সময়ের জন্য ইউরোপের একটি দেশে বসবাসের গোড়াপত্তন করলাম। পরের দিন থেকেই আমাদের Orientation Program শুরু হলো। দুই সপ্তাহের সূচি শেষে একজন একজন করে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতে শুরু করলো। কিন্তু আমি কোথাও না গিয়ে জাগরেব শহরেই থেকে গেলাম। দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে বাংলাদেশে আমি খুব ভালো গাড়ি চালাতে পারতাম। তবে ইউরোপের উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি চালানোর নিয়ম রপ্ত করে জাতিসংঘের ছাড়পত্র পেতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এই সাময়িক বিড়ম্বনা প্রকারন্তরে আমার জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা বয়ে আনলো। তাই আমি সব সময়ই বিশ্বাস করি যে আল্লাহ যা করেন তা মানুষের ভালোর জন্যই করেন।
জাগরেব শহরে প্রায় তিন মাস থাকার পর আমার বসনিয়ায় পোস্টিং হয়। ওরাশে (ইংরেজিতে বানান Orasje) নামক একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক জায়গায় বদলি হয়ে আমি জাগরেব ছেড়ে গেলাম। ঐ সময়ে রণকৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্র পোসাভিনা করিডোরের পেটের মধ্যে অবস্থিত ছিল ওরাশে টাউনশিপ। এই কুখ্যাত করিডোরের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান গ্রহণ করে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার মিলিশিয়া বাহিনী দিন রাত ভারী অস্ত্রের গোলাগুলি বিনিময় করতো। আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া শেল বা গোলার শব্দ আমি অনেকবার শুনেছি। ওরাশেতে আমি আড়াই মাস ছিলাম। এখানে ভিন্ন ভিন্ন ছয়টি দেশের ছয়জন মিলিটারি অবজার্ভারের সাথে আমি সহ আমরা সাত জন একটি ছোটো দোতলা বাসায় থেকেছি। বাসার একটি অংশে এক সন্তানসহ বাড়িওয়ালা নিজেই থাকতেন। আমি সবার পরে যোগদান করায় লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয় এমন একটি বিচ্ছিন্ন কক্ষে একা থাকতাম। এখানে আসার ২-৩ দিন পরই বরফ পড়তে শুরু করলো। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়ির উঠান হাঁটু সমান বরফে ঢেকে গিয়েছে। দেখলাম বাড়িওয়ালার ৬-৭ বছর বয়সের ফুটফুটে ছেলে মোহাম্মদ বরফের উপর তার সাথে খেলার জন্য একজন সাথি খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি অনভিজ্ঞ হওয়া সত্বেও বাচ্চাটিকে নিরাশ করতে পারলাম না, ওর সাথে ১০-১৫ মিনিট বরফের উপর দৌড়ঝাঁপ করতেই হলো। (সূত্র: আমার সেসব দিনগুলো, প্রথম প্রকাশ-মার্চ ২০২৬, পৃষ্ঠা ১০ ও ১১, নবধারা পাবলিকেশন, ঢাকা)

এই গল্পের বর্ননা আরও প্রাঞ্জল ও দুর্দান্ত হয়ে ওঠে যখন তিনি দৃশ্য পরিবর্তন করেন। ফ্ল্যাশব্যাকের মতো মুহুর্তে ঘুরে নতুন চিত্রকল্প সামনে আনেন। পুরো বইয়ে মতিউর রহমানের এমন মুন্সিয়ানা প্রায়শই দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
এই বাসায় আমার প্রথম রাতের শীতের কষ্ট ছিল অসহনীয়। কয়েক সেট কাপড় পড়ে স্লিপিং ব্যাগের ভিতর মাথা ব্যতিরেকে সম্পূর্ন শরীর ঢুকিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত ঐ এলাকায় তখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মারাত্বক অভাবের কারণে ঘর গরম করার সিস্টেম অকার্যকর থাকায় ঘরে বাইরে একই রকম ঠান্ডা লাগতো। পরের রাতে জাতিসংঘ থেকে সরবরাহ করা কেরোসিন তেল চালিত একটি রুম হিটারের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু সমস্যা হলো একবার পাম্প করে চালু করার ৩-৪ ঘন্টা পর আবার পাম্প না করলে আর চলে না। আর একটি সমস্যা হলো কেরোসিনের গন্ধে থাকা যায় না। এই অবস্থায় আমার দিন যায় রাত কাটে। রুম হিটার আর আমি পরস্পরের সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু। আস্তে আস্তে কেরোসিনের গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। সূত্র: আমার সেসব দিনগুলো, প্রথম প্রকাশ-মার্চ ২০২৬, পৃষ্ঠা ১২, নবধারা পাবলিকেশন, ঢাকা)
আরও একটি লক্ষণীয় সাদৃশ্য হলো-উভয় পাশ্চাত্য লেখকই যুদ্ধকে মহিমান্বিত না করে বরং তার অর্থহীনতা ও ক্লান্তিকর দৈনন্দিনতাকে তুলে ধরেছেন। রেমার্কের উপন্যাসে যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ আখ্যানের বদলে জুতা, খাবার, শীতের কষ্ট এবং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্কের খুঁটিনাটি বর্ণনা প্রাধান্য পায়। জেনারেল মতিউর রহমানের রচনাতেও যুদ্ধের কৌশলগত বিবরণের বদলে কেরোসিন হিটার, স্লিপিং ব্যাগ, ঠান্ডার কষ্ট এবং বাসার মালিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের বিবরণই মূল স্থান দখল করে আছে। ‘ভালো থেকো মোহাম্মদ’ এর মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাড়িমালিকের দৈন্য, সন্দেহজনক মুখ, পরিশ্রমী কিন্তু চিন্তাক্লিষ্ট অবয়ব ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অপত্য স্নেহ প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দূর দেশে। এই ‘domestic realism amid war’ বা যুদ্ধের মধ্যে গার্হস্থ্য বাস্তবতার চিত্রণ তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্বে যুদ্ধসাহিত্যের একটি স্বীকৃত উপ-ধারা, যাকে সমালোচক পল ফাসেল (Paul Fussell) তাঁর The Great War and Modern Memory (১৯৭৫) গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ফাসেল দেখিয়েছেন কীভাবে যুদ্ধস্মৃতি সাহিত্যে দৈনন্দিন খুঁটিনাটি বিবরণ আসলে যুদ্ধের বিশালতা ও অমানবিকতাকে মানবিক পরিসরে বোধগম্য করে তোলার একটি কৌশল। মতিউর রহমান যখন কেরোসিন হিটারকে ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন, তখন তিনি অজান্তেই এই একই সাহিত্যিক কৌশল প্রয়োগ করেন। গন্ধটি তাঁর পরিচিত। বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার নিভৃত পল্লী ভাতশালা গ্রামের ছোটবেলায় পাওয়া ঘ্রাণে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি। যখন ভাতশালা গাঁয়ে বিদ্যুত ছিল না। রাস্তা ছিল ছিল কর্দমাক্ত ও ধুলোয় ধুসর। প্রতি সন্ধ্যায় টেবিলে বসার আগে কুপি ধরাতেন বাড়ির জ্যেষ্ঠরা। তখন কেরোসিনের এমন ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো। দীর্ঘ বছর পর, মাতৃভূমি থেকে যোজন যোজন দূরে আবার তিনি ফিরেছেন সে নস্টালজিয়ায়। মিষ্টি ঘ্রাণ সেখানে বস্তুর সঙ্গে বিষয়বৈচিত্র্য হয়ে সঙ্কটকালীন যাপনের অন্যতম আধেয় হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি নির্জীব বস্তুকে মানবিক সম্পর্কের মর্যাদা দিয়ে যুদ্ধের নিঃসঙ্গতাকে সহনীয় করে তোলাতেই লেখকের মুন্সিয়ানা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও বেশ লক্ষণীয়। রেমার্ক ও হেমিংওয়ে উভয়েই লেখেন যুদ্ধ-পরবর্তী এক ধরনের গভীর মোহভঙ্গ ও অস্তিত্বসংকটের প্রেক্ষাপটে। যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপীয় প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। যাকে গারট্রুড স্টাইন ‘Lost Generation’ নামে অভিহিত করেছিলেন এবং হেমিংওয়ে তাঁর The Sun Also Rises (১৯২৬) গ্রন্থের ভূমিকায় এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। জেনারেল মতিউর রহমানের রচনায় এ ধরনের গভীর অস্তিত্বসংকট বা মোহভঙ্গ নেই। বরং তাঁর রচনার শেষে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসের একটি স্থিতিশীল ভিত্তি লক্ষণীয়। যা তাঁর বর্ণনাকে একটি ভিন্ন আধ্যাত্মিক মাত্রা জুড়ে দেয়। পাশ্চাত্য সেক্যুলার যুদ্ধসাহিত্যে এই ধারাটি অবশ্য অনুপস্থিত বললেই চলে। সেদিক থেকে লেখক অন্যদের চেয়ে অনন্য এবং অনবদ্য। (চলবে)
[লেখক: ডক্টর অখিল পোদ্দার, বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, কবি ও সমালোচক]
