নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের জন্য এবারের ঈদযাত্রা যেন এক অন্তহীন যন্ত্রণার মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ছেড়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তের উদ্দেশ্য বের হওয়া যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। দেশের উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ এবং পূর্বাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি মহাসড়কে আজ একই চিত্র—মাইলের পর মাইল জুড়ে স্থবির হয়ে আছে শত শত যানবাহন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। প্রচণ্ড রোদ আর গরমে বাসের ভেতরে থাকা নারী ও শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। বিশেষ করে দেশের প্রবেশপথগুলোতে যানবাহনের জটলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কয়েক কিলোমিটার পথ পার হতেই সময় লাগছে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা।

এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র হলো মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান অনুপস্থিতি। যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, মোড়গুলোতে পর্যাপ্ত পুলিশি তদারকি থাকলে অন্তত যানজট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু এবার জেলা শহরগুলোর সংযোগস্থল থেকে শুরু করে আন্তঃজেলা মহাসড়কের পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের কোনো কার্যকর টহল বা তদারকি চোখে পড়েনি। এই সুযোগে অসাধু চালকরা যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা এবং উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা শুরু করায় যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জট পাকিয়ে থাকলেও তা নিরসনের জন্য কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি।

ভোগান্তির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্য। উত্তরবঙ্গগামী বাস থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের ফেরিঘাট পর্যন্ত—সবখানেই যাত্রীদের পকেট কাটা হচ্ছে দ্বিগুণ বা তিনগুণ ভাড়ার অজুহাতে। চরম অশান্তি আর ক্লান্তি নিয়ে মানুষ যখন বাড়ির পথে রওনা হচ্ছে, তখন মোড়ে মোড়ে দালালদের দৌরাত্ম্য এবং পরিবহনের অব্যবস্থাপনা তাদের এই উৎসবের আনন্দকে ফিকে করে দিচ্ছে। দেশের সব জেলার সাধারণ মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন তুলছেন—প্রতিবছর ঈদযাত্রার প্রস্তুতির কথা বলা হলেও কেন মাঠ পর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না? প্রশাসনের এমন উদাসীনতা আর বিশৃঙ্খল সড়কের কারণে একরাশ ক্ষোভ ও চরম ক্লান্তি নিয়েই শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনের কাছে ফিরছে ঘরমুখো মানুষ।
