অমর একুশে বইমেলা কেবল নতুন বই প্রকাশের উৎসবই নয়; এটি বাঙালির চিন্তা, কল্পনা ও অভিজ্ঞতার এক সম্মিলিত মেলবন্ধন। প্রতি বছর এই মেলায় অসংখ্য নতুন লেখকের আগমন ঘটে—কেউ কবিতার বই নিয়ে, কেউ উপন্যাস, কেউবা গল্প। এই ধারাবাহিকতায় এবারের বইমেলায় পাঠকের সামনে এসেছে শিহাব শহিদুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ “নগরঘড়ি ও সুবোধ”। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জয়তীর প্যাভিলিয়নে এক আন্তরিক ও সাহিত্যঘন পরিবেশে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের উপস্থিতিতে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। নতুন লেখকের প্রথম বই প্রকাশের সেই মুহূর্তটি ছিল এক ধরনের সম্ভাবনার ঘোষণা—যেন নতুন এক কণ্ঠস্বর বাংলা গল্পসাহিত্যের ভুবনে প্রবেশ করছে।


“নগরঘড়ি ও সুবোধ” মূলত সমকালীন নগরজীবনের গল্প। এখানে শহর আছে, মানুষের স্বপ্ন আছে, আছে প্রতারণা, ব্যর্থতা, সংগ্রাম এবং সময়ের নির্মম বাস্তবতা। এই গল্পগ্রন্থে মোট বারোটি গল্প স্থান পেয়েছে, এবং প্রতিটি গল্পই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। গল্পগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—বিশেষত সেই মানুষ, যে শহরের ভিড়ে থেকেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। শনিবার রাতে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি ছড়াকার আনজীর লিটন, বিশিষ্ট কবি সমালোচক ও প্রকাশক সৈকত হাবিব, বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার মনি হায়দার, একুশে টেলিভিশনের বিদায়ী প্রধান বার্তা সম্পাদক বিশিষ্ট কবি ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার, ছোটগল্পকার ও লেখক সংগঠক নূর কামরুন নাহার, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জয়তী’র কর্ণধার মাজেদুল হাসান নয়ন, ডিবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক তানভীর সুমনসহ অন্যরা।
শহর আসলে কেবল ইট-পাথরের জটিল স্থাপত্য নয়; শহর মানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ভাঙন, লড়াই এবং অনিশ্চয়তার গল্প। শিহাব শহিদুল সেই শহরটিকেই তার গল্পের প্রেক্ষাপটে ধরতে চেয়েছেন। “নগরঘড়ি ও সুবোধ” শিরোনামটিই যেন এক ধরনের প্রতীকী ইঙ্গিত বহন করে। এখানে “নগরঘড়ি” যেন সময়ের সেই নিরন্তর চলমান চক্র, যার ভেতরে শহরের মানুষ বন্দী; আর “সুবোধ” যেন সেই মানুষের প্রতিনিধি, যে এই সময়ের ভেতর নিজেকে খুঁজে ফেরে।

গল্পগুলোর অন্যতম শক্তি হলো নগরজীবনের বাস্তবতার প্রতি লেখকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। আধুনিক শহরের জীবন বহুমাত্রিক এবং প্রায়ই নির্মম। এই নির্মমতার ভেতরেই মানুষ তার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে, আবার সেই স্বপ্নের ভাঙনের শব্দও শোনা যায়। শিহাব শহিদুলের গল্পে সেই ভাঙনের অনুরণন স্পষ্ট। কখনো একজন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের হতাশা, কখনো মফস্বল থেকে শহরে আসা শ্রমজীবী মানুষের অদম্য স্বপ্ন, কখনোবা প্রতারণার শিকার কোনো সাধারণ মানুষের অসহায়তা—এই সবকিছু মিলেই গল্পগুলোর ভেতরে এক ধরনের সামাজিক বাস্তবতার কোলাজ তৈরি হয়েছে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, লেখক শহরের গল্প বলতে গিয়ে মফস্বলের মানুষকে ভুলে যাননি। বরং মফস্বল থেকে শহরে আসা মানুষের জীবনসংগ্রাম এই গল্পগ্রন্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। গ্রাম বা ছোট শহরের মানুষ যখন বড় শহরে আসে, তখন তার মনে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন—ভালো কাজ, ভালো জীবন, নিরাপদ ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তব শহর তাকে প্রায়ই স্বপ্নের বদলে দেয় কঠিন সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা এবং কখনো কখনো প্রতারণা। এই দ্বন্দ্বই শিহাব শহিদুলের গল্পে বারবার ফিরে আসে।
গল্পগুলোর ভাষা সহজ কিন্তু ভাবগভীর। তিনি অযথা অলঙ্কারপ্রিয়তার আশ্রয় নেননি; বরং সরল বর্ণনার ভেতরেই এক ধরনের সাহিত্যিক আবহ তৈরি করেছেন। এই ভাষা পাঠককে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, গল্প পড়তে পড়তে পাঠক যেন নিজেকেই সেই শহরের ভিড়ে খুঁজে পায়। এই সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতাই একজন গল্পকারের বড় শক্তি।
একই সঙ্গে গল্পগুলোতে সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও প্রতিফলন রয়েছে। সমাজের ভেতরে যে অসাম্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রাম—সেগুলো লেখক সূক্ষ্মভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন। কখনো সরাসরি বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, বরং চরিত্র ও ঘটনার ভেতর দিয়ে এই বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে গল্পগুলো কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান হয়ে থাকে না; বরং বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটের অংশ হয়ে ওঠে।

শিহাব শহিদুল পেশাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক। অর্থনীতি ও প্রশাসনের কঠোর বাস্তবতার ভেতর দিয়ে কাজ করা একজন মানুষের সাহিত্যচর্চা অনেক সময় আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেয়। এই গল্পগ্রন্থেও সেই পর্যবেক্ষণশক্তির উপস্থিতি অনুভূত হয়। তার লেখায় শহরের জীবনকে দেখার একটি বিশ্লেষণী দৃষ্টি রয়েছে—যেন তিনি কেবল গল্প বলছেন না, বরং শহরের চলমান জীবনপ্রবাহকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারাও তার এই পর্যবেক্ষণক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা মনে করেন, শিহাব শহিদুলের লেখায় যে অনুভূতিশীলতা ও মানবিকতা রয়েছে, তা পাঠকদেরও স্পর্শ করবে। প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে “নগরঘড়ি ও সুবোধ” সেই সম্ভাবনারই একটি ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলা গল্পসাহিত্যের ইতিহাসে শহরকে কেন্দ্র করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গল্প লেখা হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সমকালীন অনেক লেখকই নগরজীবনের ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। সেই ধারাবাহিকতার ভেতরেই “নগরঘড়ি ও সুবোধ” নতুন একটি সংযোজন। যদিও এটি একজন নবীন গল্পকারের প্রথম বই, তবুও এতে একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
এই বইটির আরেকটি দিক হলো সময়ের প্রতীকী উপস্থিতি। গল্পগুলোর ভেতরে সময় যেন এক অদৃশ্য চরিত্রের মতো কাজ করে। শহরের ব্যস্ততা, মানুষের দৌড়ঝাঁপ, স্বপ্নের উত্থান-পতন—সবকিছুই যেন সময়ের ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। সেই কারণেই “নগরঘড়ি” শিরোনামটি শুধু একটি শব্দ নয়; এটি শহুরে জীবনের একটি গভীর প্রতীক।

সব মিলিয়ে “নগরঘড়ি ও সুবোধ” এমন একটি গল্পগ্রন্থ, যেখানে সমকালীন সমাজের নানা বাস্তবতা সাহিত্যিক রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এতে রয়েছে শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প, রয়েছে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাত, রয়েছে সময়ের নির্মমতা এবং মানুষের অনবরত টিকে থাকার চেষ্টা। প্রথম বই হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে একটি সম্ভাবনাময় সূচনা।
বাংলা সাহিত্যে নতুন লেখকের আগমন সবসময়ই আনন্দের বিষয়। কারণ নতুন লেখক মানে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন ভাষা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। শিহাব শহিদুলের “নগরঘড়ি ও সুবোধ” সেই নতুন সম্ভাবনারই একটি দরজা খুলে দিয়েছে। পাঠকের হাতে পৌঁছে গেলে এই গল্পগুলো হয়তো আরও নতুন অর্থ খুঁজে পাবে, আরও নতুন আলোচনার জন্ম দেবে।
এই গল্পগ্রন্থ তাই কেবল একটি বই নয়; এটি শহর, সময় এবং মানুষের গল্পের এক নীরব সাক্ষ্য। শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, অফিসের কোলাহলে, কিংবা কোনো ক্লান্ত সন্ধ্যায়—এই গল্পগুলো পাঠকের মনে হয়তো নতুন করে প্রশ্ন জাগাবে: আমরা যে শহরে বাস করি, সেই শহর আসলে আমাদের কতটা আপন, আর কতটা অচেনা।

