রোববার,

০৮ মার্চ ২০২৬

|

ফাল্গুন ২৩ ১৪৩২

XFilesBd

প্রবন্ধ পাঠ করেন আমীন আল রশীদ

জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা ও সমকালীন সংকট: এক দূরদর্শী কবির দুশ্চিন্তা-আলোচনায় বক্তারা

নিজস্ব সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৪:১৮, ৮ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০৪:৫২, ৮ মার্চ ২০২৬

জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা ও সমকালীন সংকট: এক দূরদর্শী কবির দুশ্চিন্তা-আলোচনায় বক্তারা

বাংলা কবিতার নিঃশব্দ অরণ্যে যদি কেউ একাকী হেঁটে যান, হঠাৎই যেন কুয়াশা ভেজা পথের ধারে দেখা মেলে এক অনন্য স্বরের। সেই স্বর জীবনানন্দ দাসের। তাঁর কবিতায় ধানসিঁড়ি নদীর জল যেমন নিঃশব্দে বয়ে যায়, তেমনি মানুষের অন্তর্গত এক গভীর বিষণ্নতা ও স্বপ্নের আলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। তিনি বাংলার প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের মনের ভেতরের গোপন অনুভূতিগুলোকে ভিন্ন এক ভাষায় রূপ দিয়েছেন, যা একই সঙ্গে নীরব, স্বপ্নময় এবং রহস্যে আবৃত। রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে জীবনানন্দ দাস আজও পাঠকের কাছে ফিরে আসেন ধূসর পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টে, কুয়াশাভেজা মাঠের ভোরে, কিংবা কোনো এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যার নরম অন্ধকারে। তাঁর কবিতা যেন সময়ের ভেতর দিয়ে চলা এক অন্তহীন যাত্রা। যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও স্মৃতিরা এক হয়ে যায় এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্যে। আর স্নিগ্ধ সেই সৌন্দর্যই সন্ধ্যারাতে আলো ছড়ালো সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন এন্ড প্র্যাকটিসেস-সিডিপ এর অডিটরিয়ামে। রাজধানীর আদাবর শেখেরটেকে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় উন্মোচিত হয় কবির ভাষার ভিন্নতা নিয়ে। আর প্রবন্ধকার ‘ভাষার লড়াইয়ে জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা’ শিরোনামে আলোচনা করতে গিয়ে জীবনানন্দের বাংলা ব্যবহারের শঙ্কা ও সংকট এবং ভাষা আন্দোলনে কবির অবদানকেও প্রোজ্জ্বলিত করেন।

অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি  আমীন আল রশিদ। বিষয়ের ওপর আলোচনা করেন কবি, গবেষক ও চিন্তক সৈকত হাবিব, গবেষক ও সাংবাদিক ড. কাজল রশীদ শাহীন। সৈকত হাবিবের আলাদা আরেকটি পরিচয় রয়েছে এবং ডাকা হয় জীবনানন্দ গবেষক।

তাঁর একটি গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে এবং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে তা অধিভূক্তও বটে। কাজল রশীদ শাহীন হালফিলের শুদ্ধতম সমালোচক ও লেখক। কথা বলেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক খান মো. রবিউল আলম, শিক্ষালোকের নির্বাহী সম্পাদক আলমগীর খান।

জীবনানন্দের ভাষার ব্যবহার ও ভাষাচিন্তা নিয়ে ‍মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার, ইসহাক খান, কবি কামরুল হাসান, শিল্পী শিশির মল্লিক, লেখক আবদুল হালিম খান, সিদিপ কর্মকর্তা মাহবুবুল আলমসহ অন্যরা।   

 

প্রবন্ধকার আমীন আল রশীদ বলেন, অনুষ্ঠানের আলোচ্য বিষয়: জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা। আমি এটাকে বলতে চাই জীবনানন্দের ভাষাচিন্তা দুশ্চিন্তা কারণ তিনি বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে যা চিন্তা করেছেন, সেটি আসলে দুশ্চিন্তা এই দুশ্চিন্তা এসেছে মূলত বাংলা ভাষার প্রতি তার অনিঃশেষ প্রেম থেকে

১৯৫২ সালে বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে, যখন মিছিলে গুলি হচ্ছে, জীবনানন্দ তখন কলকাতাবাসী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার এই আন্দোলন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেননি, বিচ্ছিন্ন রাখেননি কিংবা বিছিন্ন রাখতে চাননি তিনি মানসিকভাবে শরিক হয়েছিলেন জন্মভূমির এই আন্দোলনে

অনুষ্ঠানে আমীন আল রশীদ নিগুঢ়তম বিশ্বাসের সাথে বলেন  'বাংলা ভাষা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ' শিরোনামের প্রবন্ধে আমরা দেখব বাংলা ভাষা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে পঞ্চাশের দশকেই জীবনানন্দ দাশ যে কথা লিখেছেন, আজ সেটি বাস্তব সত্য দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা ভাষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন জীবনানন্দ

তিনি ভেবেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হওয়ায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তান হয়তো উর্দু ভাষার আধিপত্যবাদের শিকার হবে জীবনানন্দ ভাষার বিকাশ টিকে থাকার জন্য জোর দিচ্ছেন টেকসই সাহিত্যের ওপর কেননা একটি ভাষায় যত মানুষই কথা বলুক না কেন, সেই ভাষায় মহৎ সাহিত্যকর্ম না হলে যে সেই ভাষার টিকে থাকা কঠিন, সে কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন যে, সাহিত্যে তেমন কোনো নতুন বড়ো সূচনার লক্ষণ শিগগির দেখা দিচ্ছে না

প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব কবির বহুমাত্রিক কর্ম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশকে আমরা মূলত রূপসী বাংলার কবি হিসেবেই চিনি। কিন্তু তাঁর কবিসত্তার অন্তরালে যে এক গভীর সমাজসচেতন ও ভাষাপ্রেমিক সত্তা ছিল, তা তাঁর প্রবন্ধ ও ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায় স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে কলকাতাবাসী হওয়া সত্ত্বেও জীবনানন্দ দাশ মানসিকভাবে জন্মভূমি পূর্ব বাংলার এই স্বাধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার পর কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে এক কালজয়ী প্রবন্ধ। আজ দাঁড়িয়ে তাঁর সেই প্রবন্ধের প্রতিটি শব্দ আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে, যা একইসাথে কবির গভীর দূরদর্শিতা এবং ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর প্রবল আশঙ্কার এক জীবন্ত দলিল।

ড. কাজল রশীদ শাহীনের মতে, জীবনানন্দ দাশের ভাষাচিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অনিঃশেষ প্রেম এবং এর অস্তিত্ব নিয়ে এক ধরণের ‘দুশ্চিন্তা’। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলা ভাষা যখন একদিকে পশ্চিম বাংলায় হিন্দির চাপ এবং অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুর আধিপত্যবাদের মুখে পড়ে, তখন জীবনানন্দই প্রথম এক সংবেদনশীল হৃদয়ে সেই সংকটের পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র আলাদা হলেও বাঙালির মূল যোগসূত্র হলো তার ভাষা। প্রবন্ধটিতে তিনি সখেদে উল্লেখ করেছেন যে, দেশভাগের ফলে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট গভীরতর হয়েছে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, বাংলার বাইরে মানুষ আর বাংলা শিখতে চাইছে না এবং খোদ বাঙালির মধ্যেও নিজের ভাষা চর্চায় এক ধরণের অনীহা ও শৈথিল্য দেখা দিচ্ছে। জীবনানন্দের মতে, একটি ভাষা কেবল সংখ্যার বিচারে টিকে থাকে না, বরং সেই ভাষার মহৎ সাহিত্যকর্মই তাকে অমরত্ব দান করে। কিন্তু তাঁর সময়ে সাহিত্যে বড় ধরণের কোনো নতুন সূচনার লক্ষণ না দেখে তিনি বিচলিত হয়েছিলেন।

কবির সারল্য ভাষায় স্নিগ্ধ সাহিত্যের শোভা তুলে ধরেন টেলিভিশনের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যপাঠে আমাদের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। জীবনানন্দের চিত্রকল্প চোখ খুলে দেয় অনায়াসে। আর লালন সাঁইয়ের  ভাষা অন্তর গহ্বরে তাকাতে বাধ্য করে। সুতরাং ভাষার সংকটের পেছনে জীবনানন্দ যে কারণগুলো চিহ্নিত করেছিলেন, তা সমকালের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার চাপে পড়ে ছাত্রসমাজ বাংলা ভাষাকে অবহেলার চোখে দেখছে। ইংরেজির অধ্যাপক হয়েও তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা অবশ্যই দেশজ হওয়া প্রয়োজন। আজকের প্রেক্ষাপটে যখন আমরা দেখি উচ্চশিক্ষা বা দাপ্তরিক ক্ষেত্রে বাংলা এখনো অবহেলিত, তখন কবির সেই ‘দুশ্চিন্তা’ আমাদের কাছে ধ্রুব সত্য বলে মনে হয়। জীবনানন্দ ব্যথিত হয়ে লক্ষ্য করেছিলেন যে, বাঙালি ছাত্ররা স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারলেও শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে। তাদের ভাষা ও বাকভঙ্গি হয়ে পড়ছে শিথিল ও অসংলগ্ন। এর প্রতিকারে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের মতো ধ্রুপদী লেখকদের পাঠ করার ওপর এবং নিরন্তর লিখে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।

ড. অখিল পোদ্দার আরও বলেন, ধানসিঁড়ি নদীর তীরে কিংবা কার্তিকের সেই নবান্নের দেশে জীবনানন্দ বারবার ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। এটার মধ্যে এক ধরণের মরমী সুর বিদ্যমান। বাংলা কবিতার আকাশে তিনি এসেছিলেন এক অদ্ভুত নীরবতা নিয়ে। যখন রবীন্দ্র-প্রভাবের বলয় থেকে বের হওয়া ছিল দুঃসাধ্য, ঠিক তখনই জীবনানন্দ দাশ আমাদের চেনালেন এক ভিন্নতর প্রকৃতি—যেখানে শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা নামে এবং ঘাসের সুঘ্রাণে মিশে থাকে অদ্ভুত এক মায়া। কুয়াশার কারুকাজ আর বিপন্ন মানবতার এই রূপকারকে নিয়ে তাই সাহিত্যপ্রেমীদের আগ্রহ অনবদ্য ও অবিকল। তার কবিতায় বাংলার তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসও পেয়েছে অমরত্ব।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, জীবনানন্দের ভাষাচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাহিত্যিকের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য চর্চা করে জীবিকা অর্জন করা অসম্ভব হলে মেধাবী লেখকরা এই কাজে স্থিতি হারাবেন। ১৯৫২ সালে লেখা তাঁর সেই আশঙ্কা আজও একইভাবে সত্য। অধিকাংশ সৃজনশীল লেখক আজও লিখে জীবনধারণ করতে পারছেন না, যা প্রকারান্তরে বাংলা সাহিত্যের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জীবনানন্দ মনে করতেন, ছোট দেশ বা জনপদ হয়েও কেবল উন্নত সাহিত্যের জোরেই একটি ভাষা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, যার উদাহরণ হিসেবে তিনি গ্রিস বা ইংল্যান্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। পরিশেষে, জীবনানন্দের আক্ষেপ ছিল নীতিনির্ধারকদের নিয়ে। তিনি মনে করতেন, যাঁরা দেশ পরিচালনা করেন, তাঁরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ভাষার গুরুত্ব নিয়ে যথেষ্ট সচেতন নন। কবির সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ আমাদের একাডেমিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষার সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আরও গভীর আলোচনার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যাতে তাঁর সেই প্রিয় ‘রূপসী বাংলা’র ভাষা কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং গৌরবের সাথে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় রাজত্ব করতে পারে। অনুষ্ঠানের শেষে প্রাবন্ধিক আমীন আল রশিদের জন্মদিন উপলক্ষে কেক কাটেন উপস্থিত কবি সাহিত্যিকরা।