বুধবার,

০৪ মার্চ ২০২৬

|

ফাল্গুন ১৯ ১৪৩২

XFilesBd

বারুদগন্ধী ধোঁয়া ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়াচ্ছে

মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গন ও অবরুদ্ধ আকাশপথ: ভূ-রাজনীতির যাঁতাকলে বিপন্ন মানবিকতা

ড. অখিল পোদ্দার (Dr. Akhil Podder)

প্রকাশিত: ০২:৫৬, ৪ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গন ও অবরুদ্ধ আকাশপথ: ভূ-রাজনীতির যাঁতাকলে বিপন্ন মানবিকতা

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যে বারুদগন্ধী ধোঁয়া ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা কেবল একটি অঞ্চলের সংঘাত নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, সীমানা নিয়ে বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তারের এক অন্তহীন খেলা। সাম্প্রতিক সময়ে এই অস্থিরতা এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে, যার প্রভাব সুদূর আমেরিকার বোস্টন থেকে ভূমধ্যসাগরের মাল্টা বিমানবন্দর পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। সংঘাতের এই নতুন সমীকরণ কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, এমনকি শেষ বিদায়ের মানবিক প্রক্রিয়াকেও এক অনিশ্চিত গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধ। একদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের লড়াই, অন্যদিকে বিশ্বশক্তির সরাসরি বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে। লেবানন থেকে ইয়েমেন, সিরিয়া থেকে গাজা—প্রতিটি প্রান্তেই আজ যুদ্ধের দামামা। এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে সাধারণ মানুষগুলো কেবলই গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই সংঘাতের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের রুটগুলো আজ অনিরাপদ। মাল্টা বা সাইপ্রাসের মতো ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে হাজার হাজার যাত্রী ও কার্গো আটকা পড়ছে শুধু নিরাপত্তার অভাবে। এটি কেবল বাণিজ্যিক ক্ষতি নয়, বরং মানবিক বিপর্যয়ের এক চরম উদাহরণ, যেখানে একটি মরদেহ স্বদেশের মাটিতে পৌঁছাতেও যুদ্ধের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয়।

এই সংকটের আরেকটি নেপথ্য কারণ হলো জ্বালানি রাজনীতি এবং কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ। লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো এখন সামরিক মহড়ার ক্ষেত্র। যখনই কোনো পক্ষ চাপে পড়ে, তারা এই রুটগুলোকে অবরুদ্ধ করার হুমকি দেয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম থেকে শুরু করে সাধারণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং ড্রোন হামলার সংস্কৃতি এই যুদ্ধকে আরও বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন আর যুদ্ধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাইবার জগত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের আকাশপথকেও গ্রাস করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল নেভানোর জন্য যে আন্তর্জাতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার অভাব আজ স্পষ্ট। পরাশক্তিগুলো যখন নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত, তখন সংঘাতের এই আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে মহাদেশ থেকে মহাদেশে। এর ফলে মানবিক মূল্যবোধগুলো আজ ভূলুণ্ঠিত। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা কেবল রক্তক্ষরণেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সামাজিক বন্ধন এবং মানুষের শেষ বিদায়ের মতো আবেগঘন মুহূর্তগুলোকেও বিষিয়ে তোলে। যতক্ষণ পর্যন্ত না ন্যায়বিচার এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যের এই অশান্ত জলবায়ু বিশ্ব শান্তির জন্য এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন হয়েই থাকবে। এই অস্থিরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর এক প্রান্তের অন্যায় অন্য প্রান্তের মানুষের জীবনকেও কতটা দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।