তিনশ বছরের সুরের উত্তরাধিকার আর মাটির সোঁদা গন্ধে সিক্ত হয়ে শেষ হলো কেরাণীগঞ্জের বামনশুরের ঐতিহ্যবাহী বাউল উৎসব। ঢাকা জেলার প্রান্তঘেঁষা এই জনপদে যেন নেমে এসেছিল সুরের এক মায়াবী প্লাবন। কিংবদন্তি বাউল সাধক মালেক দেওয়ান, খালেক দেওয়ান ও আলেপ চাঁনের পবিত্র স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রতি বছরের মতো এবারও দেওয়ান বাড়ির আঙিনা হয়ে উঠেছিল মরমিয়া সাধনার মিলনক্ষেত্র। সোমবারের গোধূলি বেলায় যে সুরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বুধবারের ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও রেশ থেকে যায় আরও কিছুটা সময়। বৃহস্পতিবার ভোরে প্রথাগত 'বাল্যসেবা' তথা সেহেরির আধ্যাত্মিক আবহে পূর্ণতা পায় এই মহতী আয়োজন।
বামনশুরের এই দেওয়ান পরিবার কেবল একটি পরিবার নয়, বরং বাংলার লোকসংগীতের এক জীবন্ত ইতিহাস। দীর্ঘ তিন শতাব্দী ধরে বংশপরম্পরায় তারা লালন করে চলেছেন বাউল ও পালাগানের আদি ও অকৃত্রিম ধারা। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই বদলে গেলেও এই দেওয়ান বাড়িতে বাউলিয়ানা আজও অম্লান। বর্তমান সময়ের বিশ্ববরেণ্য শিল্পী আরিফ দেওয়ান এই সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী হয়ে এবারের উৎসবে সভাপতিত্ব করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত। বাউল গানের সেই নিগূঢ় দর্শন আর আধ্যাত্মিক আকুলতা যেন তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছিল, যা শ্রোতাদের নিয়ে গিয়েছিল এক অন্য জগতে।

উৎসবে যোগ দিতে দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সব প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন প্রায় দুই হাজার বাউল সাধক। একতারা আর দোতারার ঝংকারে, খমক আর মন্দিরায় মুখরিত ছিল পুরো বামনশুর। এই বিশাল জনসমাবেশ প্রমাণ করে দেয় যে, যান্ত্রিকতার এই যুগেও শেকড়ের টান ফুরিয়ে যায়নি। উৎসবকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী প্রাঙ্গণে বসেছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা লোকজ মেলা। নাগরদোলা, মাটির পুতুল আর মণ্ডা-মিঠাইয়ের পসরা সাজিয়ে বসা মেলাটি উৎসবের আবহে যোগ করেছিল এক বাড়তি আমেজ। সেখানে আধুনিকতার চাকচিক্য ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল প্রাণের মেলাবন্ধন।

শীতের শেষ লগ্ন আর বসন্তের আগমনি বার্তার মাঝে এই বাউল উৎসব যেন বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কেই নতুন করে চিনিয়ে দিয়ে গেল। ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে বসে যখন বাউলেরা গাইলেন বিচ্ছেদি আর দেহতত্ত্বের গান, তখন সময়ের কাঁটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। বৃহস্পতিবারের সেই পবিত্র ভোজের মধ্য দিয়ে বিদায়ের সুর বেজে উঠলেও, বামনশুরের বাতাস এখনো যেন সেই মরমী সুরের প্রতিধ্বনি বয়ে বেড়াচ্ছে। দেওয়ান বাড়ির এই আয়োজন কেবল একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের গহিনে থাকা সুরের এক আদিম ও অকৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস, যা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে শিল্পী আরিফ দেওয়ানের মতো একনিষ্ঠ সাধকদের হাত ধরে।

