বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে একটি অংশগ্রহণমূলক ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতির দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। গত কয়েক দশকের দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক রাজনীতির চেনা ছক ছাপিয়ে এবারের নির্বাচনে জনমতের যে প্রতিফলন ঘটেছে, তার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে এবং আইনি ও রাজনৈতিক অসংখ্য চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে বিশ্লেষকরা দেখছেন আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন অধ্যায় হিসেবে। নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত নানা নাটকীয়তা, জোটবদ্ধ রাজনীতির সমীকরণ এবং রাজপথের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে জনতা যে রায় দিয়েছে, তাতে স্পষ্টতই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভ্যন্তরীণ তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এবং সুশীল সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য পক্ষ স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের আশায় পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, যার সুফল সরাসরি ঘরে তুলেছে বিএনপি ও তার মিত্ররা।
তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীত্বের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলের পুনর্গঠন। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলেও প্রযুক্তির সহায়তায় দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং রাজপথের আন্দোলনে দূরদর্শী নির্দেশনা দলকে একীভূত রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের ইশতেহারে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ এবং ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ’—এর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এই পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। আইনি জটিলতা, দণ্ডাদেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে তাঁকে এই অবস্থানে আসতে হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের পর বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে ইতিবাচক বার্তা আসছে, তা তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্বের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা ক্ষমতারোহণের পথকে আরও সুগম করেছে।
এখন দেশজুড়ে সবচেয়ে বড় কৌতূহল হলো, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম পদক্ষেপ কী হবে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, তারেক রহমান প্রথমেই গুরুত্ব দেবেন ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর। তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিহিংসার রাজনীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনই হবে তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধে তিনি কতটা কঠোর হতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করবে তাঁর সরকারের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য। চ্যালেঞ্জের এই নির্বাচনে জয়লাভের পর তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে নতুন এক নেতৃত্বের দিকে, যা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিশ্চিত করবে।
