২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ভোটকে ঘিরে একদিকে যেমন প্রশাসনিক তৎপরতা তুঙ্গে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ফুটে উঠেছে রাষ্ট্র সংস্কারের একগুচ্ছ উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি। নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পরিকল্পনায় এবার সারাদেশে প্রায় ৯ লক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ১ লক্ষ ৮ হাজার সদস্য সরাসরি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য যে, এবারই প্রথম বিশেষ আইনি ক্ষমতাবলে সেনাবাহিনী মাঠ পর্যায়ে সরাসরি আইন প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং ৫ লক্ষাধিক আনসার সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত টহল জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং সেল কাজ করছে, যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
নিরাপত্তার এই কঠোর আবহের মধ্যেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিযোগিতায় থাকা বিএনপি তাদের ইশতেহারে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ এবং ‘জনগণের ক্ষমতায়নকে’ প্রাধান্য দিয়েছে। দলটির উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের নেওয়া বিশেষ সেল গঠনের ঘোষণা এবার ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়া রাজনৈতিক দলগুলো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নির্বাচন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেছে।

মাঠ পর্যায়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আর দলগুলোর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি সত্ত্বেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। একদিকে সুশাসনের স্বপ্ন এবং দীর্ঘ বিরতির পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনা কাজ করছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য সহিংসতা ও নির্বাচনের পরবর্তী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় কাটেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার ‘শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠের উত্তাপ ও বড় একটি রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি এই নির্বাচনকে এক জটিল সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আগামীকাল সকালে ভোটকেন্দ্রের দীর্ঘ সারিই বলে দেবে দেশের মানুষ এই নিরাপত্তা ও ইশতেহারের রাজনীতিকে কতটা আস্থা বা অনাস্থার দৃষ্টিতে দেখছে।
