আসন্ন ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন এবং একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা গণভোটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এক জটিল সন্ধিক্ষণে। রাজধানী ঢাকা বর্তমানে এক অগ্নিগর্ভ জনপদে পরিণত হয়েছে, যেখানে একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের দাবি রাজপথকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং প্রাক-নির্বাচনী সহিংসতা দেশটিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সরেজমিনে এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (HRSS) তথ্যমতে, গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সংঘাতে প্রায় ১৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই ঘটেছে প্রধান দুই রাজনৈতিক পক্ষ—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক কোন্দলে। বিশেষ করে রাজধানীর পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবারও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র সামনে ৯ম পে-স্কেলের দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীদের সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান আর লাঠিচার্জে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া শাহবাগ ও মিন্টো রোড এলাকা প্রমাণ দিচ্ছে যে, খোদ রাজধানীর কেন্দ্রস্থলেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংকুচিত হয়ে আসছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য—২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ (প্রায় ১,৩৬০টির বেশি অস্ত্র) এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অবৈধ মারণাস্ত্রগুলো এখন অপরাধী ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে থাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, নির্বাচন উপলক্ষে ৯ লাখেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে, যার মধ্যে ১ লাখ সেনাসদস্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর অধীনে কাজ করবেন। তবে মাঠপর্যায়ে পুলিশের মনোবল ও সক্রিয়তা নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সাধারণ মানুষ মনে করছেন, পুলিশ বাহিনী এখনো তাদের সংস্কার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখায় এবারের লড়াই মূলত বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের (নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক দল) মধ্যে। এই ‘বাইপোলার’ বা দ্বিমুখী লড়াই মাঠ দখলের সহিংসতাকে আরও উসকে দিয়েছে। একদিকে বিএনপি তাদের ইশতেহারে ‘জিরো টলারেন্স’ দুর্নীতির কথা বলছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও নাগরিক দল জুলাই সনদের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র আমূল পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে। ভোটারদের কাছে এবার সাদা ও গোলাপী—দুটি ব্যালট পেপার থাকবে; একটি স্থানীয় এমপি নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি সাংবিধানিক সংস্কারের গণভোটের জন্য। এই দ্বৈত নির্বাচন প্রক্রিয়া সাধারণ ভোটারদের জন্য যেমন নতুন, তেমনি নিরাপত্তার দিক থেকেও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে ঢাকার বাজারগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী, যা জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করছে। ‘পেটে নেই ভাত, মুখে কিসের উন্নয়ন’—এমন স্লোগান নিয়ে রাজপথে নামা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে ২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী ‘গণতন্ত্রের এসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখছেন। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং রাজনৈতিক দলগুলো সহনশীল না হলে, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির ভোট উৎসবের বদলে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিতে পারে। রাজধানীবাসীর চোখে এখন প্রশ্ন—এই বারুদের গন্ধ কি ব্যালটের শান্তিতে মিলিয়ে যাবে, নাকি নতুন কোনো অস্থিরতার সূচনা করবে
