ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকা—সবখানেই এখন রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে হাহাকার। যে এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকার আশেপাশে, কৃত্রিম সংকটের অজুহাতে সেই একই সিলিন্ডার এখন সাধারণ মানুষকে কিনতে হচ্ছে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকায়। রাজধানীর নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে এই অতিরিক্ত ব্যয় এখন এক মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে কাজ করছে এক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যারা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি বা ডলার সংকটের ধোঁয়া তুলে রাতারাতি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই চক্রের শিকড় এতটাই গভীরে যে, সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত এটি এক বিশাল সিন্ডিকেট। যারা এই সুবাদে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। আরও পাচারের চেষ্টা চলছে। মূলত দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই পুঁজি করেছে এই চক্র।
অনুসন্ধান বলছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের এই খেলাটি শুরু হয় আমদানিকারক পর্যায়ের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ডিলার ও স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ত্রিভুজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান পাইকারি বাজার এবং ডিলার পয়েন্টগুলোতে কৃত্রিমভাবে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করা হয়। ডিলাররা কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে গুদামজাত করে রাখেন এবং বাজারে 'সিলিন্ডার নেই' বলে একটি মিথ্যা ভীতি ছড়ান। যখন আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ হন্যে হয়ে সিলিন্ডার খুঁজতে থাকে, তখনই পর্দার আড়াল থেকে শুরু হয় দাম বাড়ানোর মহোৎসব। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তাঁরা ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনছেন, তাই তাঁদের কিছু করার নেই। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সাজানো নাটকের মতো চলে, যেখানে ডিলার ও আমদানিকারকদের একটি গোপন আঁতাত থাকে।
এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সব মোড় ও মহল্লার খুচরা বিক্রেতারাও জড়িয়ে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা স্থানীয়ভাবে এই এলপিজি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁরা নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন। বাজার তদারকি সংস্থার ঝটিকা অভিযানে মাঝেমধ্যে দু-একজন খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হলেও, পর্দার আড়ালে থাকা বড় মাছ বা গডফাদাররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। এমনকি ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে দেরি হওয়ার দোহাই দিয়ে যে পরিমাণ দাম বাড়ানো হচ্ছে, তার সাথে আমদানির প্রকৃত ব্যয়ের কোনো সংগতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৫০০ টাকার পণ্য ৩৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া কেবল মুনাফা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত লুণ্ঠন।
তদারকি সংস্থাগুলোর গাফিলতি ও উদাসীনতাকে এই সিন্ডিকেটের বড় ঢাল হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মাঝে মাঝে দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো কঠোর বাস্তবায়ন নেই। ঢাকা শহরের বাসিন্দারা বলছেন, দোকানদাররা বুক ফুলিয়ে বাড়তি দাম চাচ্ছে এবং রশিদ দিতে অস্বীকার করছে। রশিদ না দেওয়ার এই সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, এই কালোবাজারি কতটুকু বেপরোয়া। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেবল কৃত্রিম সংকটের জুজু দেখিয়ে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদি অনতিবিলম্বে ডিলার ও আমদানিকারক পর্যায়ের এই অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয় এবং গুদামগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালানো না হয়, তবে ঢাকা শহরের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর অচিরেই অচল হয়ে পড়বে। এই লাগামহীন লুটপাট বন্ধে প্রশাসনের শক্ত হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
