বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন এক নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। যে রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ—১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং যার হাত ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, দীর্ঘ কয়েক দশক পর সেই দলটিকে ছাড়াই একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই অনুপস্থিতি বাংলাদেশের নির্বাচনী বৈধতা, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উত্তরাধিকার নিয়ে জন্ম দিয়েছে এক বিশাল বিতর্কের। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের মনে এখন একটিই বড় প্রশ্ন: স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দলটিকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত কতটুকু থাকবে?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশন আরপিও (RPO) সংশোধন ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত ও নিবন্ধন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সংস্কার’ এবং ‘ফ্যাসিবাদ মুক্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও, এর সাংবিধানিক ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সমালোচকদের মতে, একটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিচার হতে পারে, কিন্তু একটি ঐতিহাসিক ও জনভিত্তি সম্পন্ন রাজনৈতিক দলকে পুরোপুরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে—৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—আওয়ামী লীগের নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, সেখানে এই দলটির অনুপস্থিতি একটি বড় অংশের ভোটারের প্রতিনিধিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতার আত্মত্যাগ ও অবদানের কথা অনস্বীকার্য। তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতার নেতৃত্ব এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে যে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব আজ খাদের কিনারায়। আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ জনসমর্থন থাকা একটি দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা মানে হলো কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশও মনে করছে, সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বর্তমান ক্ষমতার অংশীদারদের দাবি—যে দল গত ১৫ বছরে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ‘গণহত্যার’ দায়ে অভিযুক্ত, তাদের রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার নেই।
আইনি জটিলতার পাশাপাশি রয়েছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় বর্তমানে ভোটের ময়দানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিএনপি এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে। অনেক ভোটার মনে করছেন, নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই একপাক্ষিক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা ভোটার উপস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস রয়েছে যে, যে দলটির ছায়াতলে তারা যুদ্ধ করেছিলেন, আজ সেই দলটির কোনো চিহ্ন নেই ব্যালট পেপারে। এটি কেবল একটি দলের সংকট নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত বিড়ম্বনা।
পরিশেষে, আওয়ামী লীগ ছাড়া অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ‘সংজ্ঞা’ পুনঃনির্ধারণের লড়াই। আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এই নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের গ্রহণযোগ্যতার ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বড় রাজনৈতিক পক্ষকে বাদ দিয়ে করা নির্বাচন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ’ ও নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কতটুকু এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।
