বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর প্রশাসনিক অবস্থানের মুখে জাতীয় পার্টি এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। দলটির কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা, নজরদারি এবং প্রশাসনিক চাপের ফলে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক তৎপরতা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—ইউনূস নেতৃত্বাধীন ইনটেরিম সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় পার্টি কি প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে পারবে, নাকি টিকে থাকার স্বার্থে নীরব কৌশলেই এগোবে? জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত সমঝোতা ও বাস্তববাদী অবস্থানের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে। সামরিক শাসনের উত্তরাধিকারী এই দলটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বলয়ের কাছাকাছি থেকে রাজনীতিতে টিকে থাকার কৌশল নিয়েছে। কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির সঙ্গে জোট বা সমর্থনের মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট তাদের জন্য ভিন্ন ও কঠিন। ইউনূস প্রশাসন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে জাতীয় পার্টি এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নয়, বরং সরাসরি প্রশাসনিক চাপে পড়েছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় পার্টির অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। মাঠপর্যায়ে সভা-সমাবেশ ও কর্মসূচি প্রায় বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভেতরে স্পষ্ট মতভেদ দেখা দিয়েছে। একাংশ মনে করছে, এখনই সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক আত্মঘাতের শামিল হবে। অন্য অংশের মতে, অতিরিক্ত নীরবতা দলটির অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টি যদি সরাসরি ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে, তাহলে প্রশাসনিক চাপ আরও বাড়তে পারে। গ্রেপ্তার, মামলা ও সাংগঠনিক ভাঙন ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার সম্পূর্ণ নীরব থাকাও দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। ফলে জাতীয় পার্টির সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হয়ে উঠছে কৌশলগত পুনর্গঠন ও জনসংযোগভিত্তিক রাজনীতি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রথম ধাপে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের ‘অবহেলিত ও নির্যাতিত রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারলে সহানুভূতির একটি রাজনৈতিক মূলধন তৈরি হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা গেলে কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও গতিশীলতা ফিরতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পার্টি যদি তাদের ঐতিহাসিক মধ্যপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী রাজনীতির বয়ান নতুন করে সামনে আনে, তবে তারা একটি গ্রহণযোগ্য ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করাও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় রেখে জাতীয় পার্টি যদি পরিমিত ও কৌশলগত ভাষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে, তবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংলাপ ও প্রক্রিয়ায় তারা ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতীয় পার্টির ভেতরের তরুণ নেতৃত্বও ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের বিশ্বাস, বর্তমান দমনমূলক বাস্তবতার মধ্যেও যদি দলটি সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি শক্তি হিসেবে জাতীয় পার্টির ফিরে আসা অসম্ভব নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় পার্টি এখন তার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ইউনূস প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি সোচ্চার হওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘ নীরবতাও দলটির জন্য আত্মবিনাশী হতে পারে। সঠিক কৌশল, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—জাতীয় পার্টি আবারও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতায় ফিরবে, নাকি ধীরে ধীরে ইতিহাসের প্রান্তে হারিয়ে যাবে।
