শনিবার,

১৪ মার্চ ২০২৬

|

ফাল্গুন ৩০ ১৪৩২

XFilesBd

প্রলম্বিত হলে কার ক্ষতি কার লাভ

কোন পথে ইরান যুদ্ধ? বিশ্ব অর্থনীতি তছনছ হতে পারে

ড. অখিল পোদ্দার (Dr. Akhil Podder)

প্রকাশিত: ১৭:২২, ১৪ মার্চ ২০২৬

কোন পথে ইরান যুদ্ধ? বিশ্ব অর্থনীতি তছনছ হতে পারে

কোন পথে ইরান যুদ্ধ? বিশ্ব অর্থনীতি তছনছ হতে পারে

  - ড. অখিল পোদ্দার

 

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি ক্রমশ এমন এক ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা বিশ্বে। ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় সংঘাত শেষ পর্যন্ত কেবল একটি দেশের সীমারেখায় আটকে থাকে নাতার ঢেউ আঘাত করে জ্বালানি বাজারে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, সামরিক জোটের কাঠামোয় এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভারসাম্যে। ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা এখন তৈরি হয়েছে, তা এই বৃহত্তর বাস্তবতারই নতুন অধ্যায়।

দীর্ঘদিন ধরেই ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে এক ধরনের সংঘাতময় সম্পর্কের ভেতর দিয়ে চলেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্পর্ক কার্যত বৈরিতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এরপর পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনের অভিযোগসব মিলিয়ে ইরান ধীরে ধীরে একটি জটিল আন্তর্জাতিক সমীকরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাতকে তাই শুধু একটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া যুদ্ধ বলে দেখা যায় না; বরং এটি বহু বছরের জমে থাকা রাজনৈতিক উত্তেজনার বিস্ফোরণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোএই যুদ্ধ কোন পথে এগোচ্ছে। একদিকে রয়েছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা তার আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী; অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং পশ্চিমা জোটের কৌশলগত প্রভাব। ইরান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সীমিত শক্তি ব্যবহার করলেও তার প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তারপ্রক্সি নেটওয়ার্কে”—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী, ইরাক সিরিয়ার বিভিন্ন মিলিশিয়া। এই গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নানা স্থানে সক্রিয় থাকায় সংঘাতটি সহজেই একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সামরিক কৌশল সরাসরি বৃহৎ যুদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করা। এটিকে অনেকেইশ্যাডো ওয়ারবা ছায়াযুদ্ধ বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধ এড়িয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট সংঘাত, ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সমুদ্রপথে উত্তেজনা সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা। এই কৌশলের ফলে যুদ্ধটি একদিকে সীমিত থাকে, আবার অন্যদিকে ক্রমাগত উত্তেজনা বজায় রাখে।

এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো জ্বালানি রাজনীতি। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। অতীতে এমন পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সামান্য উত্তেজনাতেই তেলের দাম লাফিয়ে উঠেছে। ফলে ইরানকে ঘিরে যেকোনো যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও অস্থির করে তুলতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই নানা সংকটে রয়েছেমুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন। এর মধ্যে যদি মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে তা বৈশ্বিক বাজারে নতুন ধাক্কা দিতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে, এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ তারা অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি করে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন বৈশ্বিক জোট রাজনীতি। বিশ্ব রাজনীতি এখন ক্রমেই দুই ধরনের ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিমা মিত্ররা, অন্যদিকে রাশিয়া, চীন এবং কিছু আঞ্চলিক শক্তি। ইরান দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়া চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ইরানের সামরিক কৌশলগত সহযোগিতা আরও বেড়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

চীনও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বেইজিং একদিকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। চীনের এই ভারসাম্য নীতি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ মনে করেন সংঘাতটি সীমিত পর্যায়েই থাকবে, কারণ বড় আকারের যুদ্ধের ঝুঁকি সব পক্ষই বোঝে। একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশকে জড়িয়ে ফেলতে পারে, এমনকি বিশ্বশক্তিগুলোকেও সরাসরি সংঘাতে টেনে আনতে পারে। তাই অনেক সময় উত্তেজনা বাড়লেও শেষ পর্যন্ত তা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখা হয়।

অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পরিস্থিতি খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলোছোট একটি ঘটনা কখনো কখনো বড় যুদ্ধের সূচনা করে। একটি ড্রোন হামলা, একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত, অথবা কোনো সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ ধরনের ঘটনা মুহূর্তেই প্রতিশোধের চক্র শুরু করতে পারে। তখন সংঘাত আর কূটনীতির সীমায় আটকে থাকে না।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো পারমাণবিক ইস্যু। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় এবং ইরান মনে করে যে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তাহলে পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এই পুরো পরিস্থিতিতে কূটনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং কিছু নিরপেক্ষ দেশ প্রায়ই মধ্যস্থতার চেষ্টা করে থাকে। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আস্থার সংকট এতটাই গভীর যে আলোচনার পথ সবসময় সহজ থাকে না।

সবশেষে বলা যায়, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন এমন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের ফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এটি কেবল একটি দেশের সামরিক সংঘাত নয়; বরং এটি জ্বালানি রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি, কৌশলগত জোট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণে গঠিত একটি বৃহৎ সংকট। ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে তা নির্ভর করবে সামরিক শক্তির চেয়ে বেশি কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে তাই এখনো যুদ্ধের ছায়া ঘন। কিন্তু সেই ছায়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি বড় প্রশ্নএই সংঘাত কি আরেকটি বৈশ্বিক অস্থিরতার সূচনা করবে, নাকি কূটনীতির টেবিলে তার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশ্বের দৃষ্টি এখন সেদিকেই নিবদ্ধ