বুধবার,

২৮ জানুয়ারি ২০২৬

|

মাঘ ১৪ ১৪৩২

XFilesBd

বর্ষপূর্তিতে কবি সাহিত্যিকদের মিলনমেলা

শিল্প সাহিত্যের নিয়মিত আড্ডায় এবার আলোচনা-কবিতার অনুবাদ: অনুবাদ কবিতা

নিজস্ব সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০২:৪৫, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ০৩:৩৮, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

শিল্প সাহিত্যের নিয়মিত আড্ডায় এবার আলোচনা-কবিতার অনুবাদ: অনুবাদ কবিতা

দেখতে দেখতে বছর পেরুলো ধানমন্ডি আড্ডা। তাই জন্মদিনের আয়োজনটা ছিল ভিন্ন আমেজের বহুমাত্রিক ও বর্নিল। রাজধানীর মেট্রো শপিং মলের ৬ তলায় অনুষ্ঠিত এ আড্ডায় উঠে আসে অনুবাদ সাহিত্যের নানান অনুসঙ্গ। স্বল্প সময়ে উপস্থিত জাঁহাবাজ সাহিত্য সমালোচকরদের সামাল দিতে বেশ বেগই পেতে হয় ধানমন্ডি আড্ডার করিৎকর্মা সভাপতি মনোচিকিৎসক ও সুসাহিত্যিক ডা. মোহিত কামালকে। আড্ডার দশভূজা হিসেবে পরিচিত সাধারণ সম্পাদক কথাসাহিত্যিক নূর কামরুন নাহার এসব ব্যাপারে বরাবরই হরফুন মৌলা। সবাইকে তুষ্ট রেখে তিনি অনুষ্ঠানের রথ চালিয়ে নেন কুরুসাহিত্যের সীমান্ত অবধি। সবমিলে অনন্য অনবদ্য এক পরিবেশে থিতু হয়েছিলেন কবি, লেখক, সমালোচক ও গল্পকারেরা।

সোমবার সন্ধ্যায় ছিল আড্ডার জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা। শিল্পসাহিত্যের নিয়মিত আয়োজন ধানমন্ডি আড্ডায় এবারের শিরোনাম—“কবিতার অনুবাদ: অনুবাদ কবিতা”। মুক্ত আলোচনায়, প্রশ্ন আর উত্তরে  সমকালীন সাহিত্যচর্চার জটিল কিন্তু অনিবার্য প্রশ্ন সামনে এনেছে অতিথিবৃন্দ। বিশ্বায়নের যুগে ভাষার সীমানা ভেঙে সাহিত্য যেভাবে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় যাত্রা করছে, তাতে অনুবাদ আর কেবল সহায়ক প্রক্রিয়া নয় অনেক ক্ষেত্রেই তা নতুন সৃষ্টির নাম। কবিতার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও সূক্ষ্মসঙ্গত কারণে প্রশ্ন -কবিতা কি আদৌ অনুবাদযোগ্য, নাকি অনুবাদমাত্রই এক ধরনের পুনর্লিখনএকটি নতুন কবিতা?

আসে ডেডলি ডুয়েলস ফরমূলা। কারণ কবিতা অনুবাদের মধ্য দিয়ে হয় কবির মৃত্যু না হয় অনুবাদকের মৃত্যু ঘটবে-এমন কথাও হাস্যরসের মধ্য দিয়ে উঠে আসে। কারণ অনুবাদ যত্নের সঙ্গে না হলে তা কতো ধরণের জটিলতার আধার হয়ে ওঠে তারই বর্ননা শোনা যায় অতিথি জুয়েল মাজহারের কণ্ঠে। যিনি টি এস এলিয়টের দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর অনুবাদ করে সুবিখ্যাত। পাশাপাশি অনুবাদ সাহিত্যে যাঁর রয়েছে ভিন্ন ধরণের দখল ও অনুধাবন।  

আড্ডা-আলোচনায় প্রথমেই উঠে আসে কবিতা অনুবাদের মৌলিক সংকট প্রসঙ্গ। গদ্যের অনুবাদে তথ্য, বক্তব্য যুক্তির স্থানান্তর সম্ভব হলেও কবিতায় ভাষার সংগীত, ছন্দ, ধ্বনি, নিরবতা, সাংস্কৃতিক ইঙ্গিতসব মিলিয়ে একটি জৈব সমগ্র কাজ করে। একটি শব্দের অর্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার ধ্বনিগত অভিঘাত, তার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক স্মৃতিও অপার এক বিষয়। ফলে কবিতার অনুবাদ মানেই শুধু শব্দান্তর নয়, বরং এক ভাষার অভিজ্ঞতাকে অন্য ভাষায় পুনর্গঠন। এই পুনর্গঠনের মুহূর্তেই অনুবাদক কবির ভূমিকায় প্রবেশ করেন। আর এই অভিজ্ঞান যিনি ধরতে পারেন তিনি সফল অনুবাদক অন্যথায় তার হাতে মৃত্যু ঘটে কবিতার আর কবিকে করেন শ্রাদ্ধ। প্রসঙ্গক্রমে অতিথিরা বলেন, কেউ একজন নোবেল পেলেন। দুদিনের মাথায় তার লেখার অনুবাদ বাজারে চলে আসে। অথচ অনুবাদক না জানেন সাহিত্যিককে, না বোঝেন লেখকের ব্যঞ্জনা ও রুচি না জানেন অনুবাদের গভীরতা।

আন্তর্জাতিক সাহিত্যতত্ত্বে এই প্রশ্ন বহুদিনের। রোমান জ্যাকবসন কবিতার অনুবাদকে ‘creative transposition’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ওয়াল্টার বেনিয়ামিন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “The Task of the Translator”- অনুবাদকে মূল রচনার অনুগত প্রতিচ্ছবি হিসেবে নয়, বরং তারপরবর্তী জীবনহিসেবে কল্পনা করেন। এই তাত্ত্বিক অবস্থান শিল্পসাহিত্যের আড্ডার আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পায়। কারণ এখানে অনুবাদকে অধস্তন কাজ হিসেবে দেখার প্রবণতার বিরোধিতা করা হয়। অনুবাদ কবিতা নিজেই একটি সাহিত্যিক ঘটনাএই উপলব্ধিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কবি ও সাহিত্যসমালোচক সৈকত হাবিব বলেন, বাংলা সাহিত্যেও কবিতার অনুবাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে মূল পাঠ থেকে সরে এসে এক নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ করেছিলেনএটি ইউরোপীয় পাঠকের কাছেরবীন্দ্রনাথনামে এক ভিন্ন কণ্ঠস্বর তৈরি করে।

কবি জীবনানন্দ দাশের ব্যাপারে একাধিক বইয়ের লেখক সৈকত হাবিব আরও বলেন, অনুবাদিত কবিতাগুলোতেও দেখা যায়, অনুবাদকরা অনেক সময় জীবনানন্দের নিঃশব্দতা বিষন্ন প্রকৃতিকে ধরতে গিয়ে নিজেদের কাব্যভাষা ব্যবহার করেছেন। আড্ডার আলোচনায় প্রশ্ন ওঠেএই অনুবাদগুলো কি জীবনানন্দের কবিতার অনুবাদ, নাকি জীবনানন্দঅনুপ্রাণিত নতুন কবিতা?

আলোচনার প্রধান অতিথি সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক জুয়েল মাজহার দীর্ঘ বক্তব্যে বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিসরে অনুবাদকের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় জাম্প করলে অনুবাদের কী ক্ষতি হয় আর কেমন সম্ভাবনা থাক তাও তুলে ধরেন। অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাঞ্জল আলোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কবি,সমালোচক ও অনুবাদক শামস আল মমীনতিনি নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন উপস্থিত কবি সাহিত্যিকদের। আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক মাসুদুল হক, ইব্রাহীম আহাদ, ফারহানা রহমান, বাবুল আনোয়ার, শামসুল বারী উৎপল, কবি সৌম্য সালেক, হেনা সুলতানা, হাসিদা মুন, মাসুদুর রহমান, পিওনা আফরোজসহ অন্যরা।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারী অনুবাদক কবিরা একটি বিষয়ে একমত হন, কবিতার অনুবাদেবিশ্বাসযোগ্যতাশব্দটির অর্থ নতুন করে ভাবতে হবে। শিল্পিত কবি সৌম্য সালেক বেশ স্পষ্ট করেই বলেন, বিশ্বাসযোগ্যতা মানে শব্দেশব্দে অনুগত থাকা নয়, বরং মূল কবিতার আবহ, দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্গত আন্দোলনকে ধরে রাখা। অনেক সময় একটি উপমা বা সাংস্কৃতিক চিহ্ন সরাসরি অনুবাদ করলে তা লক্ষ্যভাষায় অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন অনুবাদককে সমতুল্য এক অভিজ্ঞতা খুঁজে নিতে হয়। এই সৃজনশীল সিদ্ধান্তই অনুবাদ-কবিতাকে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্মে পরিণত করে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে অনুবাদ কবিতা আজ বৈশ্বিক কাব্যচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। টি এস এলিয়ট, বোদলেয়ার, পাবলো নেরুদা, রুমি, মাৎসুও বাসো, পল সেলান-এঁদের কবিতা মূল ভাষার বাইরেও যেভাবে বিশ্বব্যাপী পাঠিত, তার বড় অংশই অনুবাদের ফল। কিন্তু এই অনুবাদগুলোর মধ্যে একাধিক সংস্করণ রয়েছে, যেগুলো পরস্পরের থেকে ভিন্ন-এমন দাবি কবি আনিস রহমানের।

আলোচনায় উঠে আসে, পাঠক আসলে কোনটিকেআসলকবিতা হিসেবে পড়ছেন? হয়তো সবকটিই-কারণ প্রতিটি অনুবাদ একটি নতুন পাঠ, একটি নতুন কবিতা-বলেন নূর কামরুন নাহার।

শিল্পসাহিত্যের আড্ডায় অনুবাদ কবিতার নৈতিক দিকও আলোচিত হয়। অনুবাদক কতটা স্বাধীন হতে পারেন? মূল কবির কণ্ঠস্বর কোথায় শেষ হয়, আর অনুবাদকের কণ্ঠস্বর কোথা থেকে শুরু? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনুবাদককে আজ আর অদৃশ্য শ্রমিক হিসেবে দেখা হয় না; বরং সহ-স্রষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অনেক সাহিত্যপত্র প্রকাশনায় অনুবাদক কবির নাম সমান গুরুত্বে ছাপা হচ্ছে। এই প্রবণতা বাংলা সাহিত্যেও বাড়ছে-যা অনুবাদ চর্চার জন্য ইতিবাচক। আলোচনায় এসব বলেন বিশিষ্ট সাহিত্যসমালোচক মাসুদুল হক। তাঁর কথায় উঠে আসে বোদলেয়ার অনুবাদে বুদ্ধবে বসুর মুন্সিয়ানা ও টি এস এলিয়ট প্রসঙ্গ। 

আড্ডার আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পাঠকের ভূমিকা। অনুবাদ কবিতা পড়ার সময় পাঠককে কি মূল কবিতার কথা মাথায় রাখতে হবে? নাকি অনুবাদটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতা হিসেবে পড়াই যথার্থ? কথার মধুরিমা ছড়িয়ে এমনটা বলেন ধানমন্ডি আড্ডার সভাপতি ডা. মোহিত কামাল। ডা. মোহিত কামাল এও বলেন যে, আদর্শ পাঠক দুই স্তরে পড়তে পারেনএকদিকে অনুবাদ কবিতার নিজস্ব সৌন্দর্য শক্তি উপভোগ করাঅন্যদিকে জানার চেষ্টা করা যে, এটি কোন ভাষা সংস্কৃতি থেকে এসেছে। এই দ্বিস্তরীয় পাঠই অনুবাদ কবিতার পূর্ণ অভিজ্ঞতা দেয়।

সবশেষে আলোচনায় একটি প্রস্তাব উঠে আসেকবিতার অনুবাদকে আরদ্বিতীয় সারিরসাহিত্য হিসেবে দেখা যাবে না। অনুবাদ কবিতা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে, ভাষার মধ্যে সেতু গড়ে এবং নতুন কাব্যভাষার জন্ম দেয়। এমন কথা খুব স্পষ্টভাবে জানান দেন সাহিত্যিক ফারহানা রহমান

সমাদৃত লেখক ও গবেষক ড. তপন বাগচী বলেন, কবিতার অনুবাদ আজ আর শুধু অনুবাদের প্রশ্ন নয়, এটি কবিতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত এক মৌলিক বিতর্ক। ভাষার সীমা অতিক্রম করে কবিতা যখন নতুন ভাষায় নতুন জীবন পায়, তখন অনুবাদ কবিতা নিজেই হয়ে ওঠে এক স্বাধীন, শক্তিশালী শিল্পরূপ। শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার এই পর্ব সেই সত্যকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল। উল্লেখ্য বাংলা একাডেমীর পরিচালক ড. তপন বাগচীর বইয়ের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়েছে। এবার তিনি নতুন আঙ্গিকের উপন্যাস উপহার দিতে যাচ্ছেন। মূলত কবি হিসেবে পরিচিতি পেলেও হাল সময়ে তাঁর লেখায় গবেষণার নানান উপাত্ত প্রতিফলিত।

সাংবাদিক ও গবেষক ড. অখিল পোদ্দার দাবি করেন, শিল্প-সাহিত্যের আনন্দময় এই আড্ডা দেখিয়েছে, অনুবাদ মানে ক্ষয় নয়, বরং সম্প্রসারণলেখাকে অনবদ্য, আনন্দময় ও আন্তর্জাতিক করে তোলা। অনুবাদের কবিতা তাই ছায়া নয় বরং নতুন আলো, নতুন উদ্ভাসন। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নেন আব্দুল মান্নান, দীপা আফ্রিদী, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, সুজন বড়ুয়া, টোটন চন্দ্র দাস, মনিরা মনি, আশফাকুজ্জামান, আবদুল হালিম খান, শ্যামলী খান, শামীমা সুলতানা, শেলী সেনগুপ্তা, রেজিনা খন্দকার, আরজুমান্দ আরা বকুল, রাজিয়া সুলতানা, শামীমা আফরোজ হ্যাপি, শামীম আমিনুর রহমান, শাহনাজ পারভীন মিতা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মফিজুর রহমান, রফিকুর রহমান, মোস্তফা মোহাম্মদ, আব্দুর রাজ্জাক, শাহিদা ইসলাম, ঋজু রেজওয়ান, জাহাঙ্গীর হোসাইন, রমজান মাহমুদ, ডা. তপন বাগচী, সুমন সরদার, বরেণ্য কবি নাসির আহমেদ, এম রফিক, অসিত আচার্য, এম মোহিত, শওকত হোসেন, কামরুন নাহার, ক্ষমা মাহমুদ, ইফতেখার খালিদ, . অখিল পোদ্দার, . আনিস রহমান, নাহিদ কায়েস, সায়েদ নাঈম, তাসরিব ইব্রাহিম মাহিন, রাশেদুল ইসলাম, জাকির হোসেইন তপন, তানভিরা আহনাফ, হাসান সালেহ জয়, তাহমিনা কোরাইশী, ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহীম, সাবেরা তাবাসসুম, . নাইমা খানম, উত্তম কুমার, ফরিদুর রহমান, কে এম এডামস, নার্গিস নীলা, খালেদ চৌধুরী, সৌম্য সালেক, সৈকত হাবিব, রিয়াজুল হোসেন, সাদমান সাকিব, কবির চাঁদ, সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, ডা: তারিকুল আলম বুলবুল, পলাশ মজুমদার, বিমল চন্দ্র মন্ডল, সুমাইয়া আজিজ স্মৃতি, তাহমিনা শিল্পী, জাহিদ নূর, সৈয়দা সামিয়া রহমান, জোনাকি, শাহী, মারুফা জাহান মুক্তি, নূর কামরুন নাহার, মোহিত কামাল, রিয়াজুল হাসান কল্লোল, রূপশ্রী চক্রবর্তী প্রমুখ।