বাংলা মরমী-সাহিত্যের বিশ্ব মরমী চেতনামুখী যাত্রা
বাংলা মরমী সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে এক গভীর আত্মানুসন্ধানের ঐতিহ্য বহন করে এসেছে—চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল ও সুফি সাধনা মিলিয়ে এই ধারাটি মূলত অনুভব, গান ও সাধনার ভাষা। কিন্তু এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য দীর্ঘদিন একটি সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থেকেছে ।আর তা বিশ্লেষিত হয়েছে লোকজ, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক কাঠামোর ভেতরে, বিশ্বদর্শনের এক সংহত তাত্ত্বিক ভাষা হিসেবে নয়।তারিফ হোসেনের "লালনপদের বীজতলা" এই সীমাবদ্ধতায় সুস্পষ্ট ভাঙন তৈরি করে।এই বই লালনের পদকে কেবল বাংলা মরমী সাহিত্যের সম্পদ হিসেবে নয়, বরং বিশ্ব মরমী চেতনার এক নতুন পাঠ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অনন্যপূর্ব সাহসী প্রয়াস।

লালনপদের বীজতলা (প্রথম খণ্ড) প্রকাশ করেছে পানকৌড়ি প্রকাশনী। যেখানে তারিফ হোসেন বলেছেন-লালন: লোককবি নন, চেতনার তত্ত্ব প্রণেতা।
এই গ্রন্থের মূল অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট
লালন কেবল লোককবি, বাউলগুরু, মানবতাবাদী বা ধর্মসংস্কারক নন;তিনি দেহ, চেতনা ও মহাবিশ্বের সম্পর্ক অনুধাবনকারী এক মৌলিক চিন্তক।লালনের পদ এখানে ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং আত্মার বিজ্ঞান।
তাঁর ভাষার সরলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে সাংখ্যের চেতনা-প্রকৃতি তত্ত্ব, তন্ত্রের দেহচক্র, সুফিবাদের প্রেম-আলকেমি, বৌদ্ধ শূন্যতার নিরাসক্তি এবং আধুনিক বিজ্ঞানের তরঙ্গ-চেতনা।
এই বই সেই বহুমাত্রিক গভীরতাকে প্রথমবারের মতো একটি সংহত পদ্ধতিতে পাঠযোগ্য করে তুলেছে।
একটি নতুন বিশ্ব মরমী ডিসিপ্লিনের প্রস্তাব
লালনপদের বীজতলা কেবল একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়—এটি একটি নতুন ডিসিপ্লিন নির্মাণের ঘোষণা।
এই বইয়ে লালনের পদাবলী বিশ্লেষিত হয়েছে নিম্নোক্ত আটটি আন্তঃসংলগ্ন দৃষ্টিকোণ থেকে । সেগুলো হল সাংখ্য দর্শন,তন্ত্রদর্শন,পুরাণতত্ত্ব,সুফিবাদ,বৌদ্ধ শূন্যবাদ কোয়ান্টাম সায়েন্স,মেডিকেল সায়েন্স,মিস্টিক রিয়ালিজম।
এই দৃষ্টিগুলো আলাদা তুলনা নয়; বরং একসঙ্গে মিলিত হয়ে গঠন করে চেতনার একটি সমগ্র মানচিত্র।এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে যে ক্ষেত্রটির দিকে ইঙ্গিত করে, তাকে যথার্থই বলা যায়
Mystical Interdisciplinary Studies।
দেহই পাঠ্য, শব্দই শক্তি
বাংলা মরমী সাহিত্যে দেহ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাকে বিশ্লেষণের সুসংহত ভাষা ছিল অনুপস্থিত।
এই বই সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।
চক্রতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, দেহ-ধ্যানমূলক পাঠ (somatic reading), এবং শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ও ধ্বনিতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে লালনের পদ এখানে হয়ে ওঠে শরীর–চেতনা–শব্দের এক যৌথ পাঠ্য।
“চাঁদ”, “ঘর”, “মানুষ”, “মা”এই সাধারণ শব্দগুলো বইটিতে রূপ নেয় শক্তিক্ষেত্রে, যেখানে অর্থ কেবল শুধু বাহ্যিক বোধের স্তরেই নয়,বরং গভীর অনুভূতির চেতনা ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত।
‘বীজতলা’ কেন তাৎপর্যপূর্ণ
"লালনপদের বীজতলা" নামের বইটি একটি গভীর দার্শনিক ইঙ্গিত বহন করে।এটি সেই স্তর, যেখানে চিন্তার বীজ রোপিত হয় শুধু ফলপ্রদায়করূপে নয়, সম্ভাবনার উৎসারক হিসাবেও।
লালনের পদ এখানে কোনো চূড়ান্ত দর্শন নয়; বরং এমন এক উৎস,যেখান থেকে দর্শন, বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও কাব্য একসঙ্গে অঙ্কুরিত হতে পারে।এই দৃষ্টিতে "লালনপদের বীজতলা" বাংলা মরমী সাহিত্যকে প্রথমবারের মতো বিশ্ব মরমী চেতনার তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রবেশ করায়।

বিশ্ব মরমী ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপ
এই গ্রন্থের পাঠ-পদ্ধতি লালনের আসন রচনা করে রুমির প্রেমতত্ত্ব,উপনিষদের আত্মজ্ঞান,বৌদ্ধের শূন্যতা,তান্ত্রিক শক্তিচিন্তা,আধুনিক কোয়ান্টাম চেতনা-তত্ত্বের সঙ্গে এক সারিতে।এখানে তুলনা বাহ্যিক নয়; বরং এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে লালনের পদাবলী আসলে বিশ্ব মরমী চেতনার এক স্বতন্ত্র কিন্তু সমমর্যাদাসম্পন্ন ধারা।

কাদের জন্য এই বই?
এই বই সাধারণ পাঠককে নিয়ে যায় অন্তরসংগীতের দিকে,অনুসন্ধানী পাঠককে দেয় নতুন চিন্তার দরজা,গবেষকের সামনে খুলে দেয় এক নতুন ডিসিপ্লিনের সম্ভাবনা,বিজ্ঞানমনস্ক পাঠককে যুক্ত করে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে,
সাহিত্যপ্রেমীকে পরিচয় করায় কবিতার অন্তর্গত বিজ্ঞানের সঙ্গে।সবচেয়ে বড় কথা এই বই পাঠককে পাঠক থেকে অংশগ্রহণকারী চেতনাতে রূপান্তরিত করে।

উপসংহার
"লালনপদের বীজতলা" বিশ্ব মরমী চেতনার নতুন পাঠ।এটি কেবল একটি গ্রন্থ নয়,একটি দৃষ্টিভঙ্গির সূচনাও বটে ।যেখানে লালন আর কেবল অতীতের লোকসাধক নন,তিনি হয়ে ওঠেন চেতনার তত্ত্বজ্ঞ, দেহতত্ত্বের রূপকার, এবং বিশ্ব মরমী সাহিত্যের এক আধুনিক ক্লাসিক কণ্ঠস্বর।বাংলা মরমী সাহিত্যের ইতিহাসে এই গ্রন্থ নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক,
এবং ভবিষ্যতের বিশ্ব মরমী সাহিত্য ও দর্শন গবেষণার জন্য এক উর্বর বীজতলা।

