নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরেই অস্ত্র উদ্ধারের পরিসংখ্যান, অস্ত্রবাজি, গুলি ছোড়া কিংবা অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন এই অর্থে যে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধার অভিযান বা সমন্বিত বিশেষ অপারেশনের খবর তুলনামূলকভাবে কম চোখে পড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উদ্ধার হওয়া অবৈধ অস্ত্রের সংখ্যা আগের নির্বাচন-পূর্ব সময়ের তুলনায় কম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে আলাদা কোনো ‘জিরো টলারেন্স’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়নি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অস্ত্র নিজে থেকে সহিংসতা তৈরি করে না, কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে এটি সহিংসতাকে দ্রুত, ভয়াবহ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অপরাধতত্ত্ব গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধারে ঢিলেমি মানে হলো সম্ভাব্য সংঘাতের উপকরণ মাঠে রেখে দেওয়া। ভোটের দিন কিংবা তার আগে-পরে যখন পক্ষগুলো মুখোমুখি হয়, তখন এই অস্ত্র মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।”
মাঠপর্যায়ের তথ্যও এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। কয়েকটি জেলায় স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে দেশীয় অস্ত্র বহনের গুজব যেমন আছে, তেমনি কিছু এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রাখার কথাও শোনা যাচ্ছে। যদিও এসব তথ্য যাচাই করা কঠিন, তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে সেগুলো কোনো না কোনো সময় ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশেষ করে কেন্দ্র দখল, ভোটারকে ভয় দেখানো, বিরোধী কর্মীদের তাড়ানো কিংবা ভোট গণনার সময় চাপ তৈরির মতো পরিস্থিতিতে এসব অস্ত্র কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনের সহিংসতায় ব্যবহৃত অস্ত্রের বড় একটি অংশ আগেই অবৈধভাবে মজুত করা থাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর প্রকাশিত কয়েকটি মানবাধিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, অনেক সহিংস ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র নির্বাচন-পূর্ব বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করা গেলে পরিস্থিতি হয়তো এতটা ভয়াবহ হতো না। একইভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও দেখা গেছে, ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে ব্যাপক অস্ত্র উদ্ধার হলে সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
সরকারি মহলের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “আমাদের নজরদারি আছে, প্রয়োজন হলে অভিযান হবে।” তবে ‘নজরদারি আছে’ আর দৃশ্যমান ও ব্যাপক অস্ত্র উদ্ধার—এই দুইয়ের মধ্যে যে বাস্তব পার্থক্য রয়েছে, তা ভোটের মাঠে সরাসরি প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি রাষ্ট্র নির্বাচনকে সত্যিই সহিংসতামুক্ত রাখতে চায়, তবে অস্ত্র উদ্ধারের প্রশ্নে নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা দেখানো অত্যন্ত জরুরি। নইলে একটি পক্ষ মনে করতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকবে, আর সেই ধারণাই সহিংস আচরণে উৎসাহ জোগাতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। অবৈধ অস্ত্র শুধু ব্যবহার হলেই ক্ষতি করে না, এর অস্তিত্বের খবরও ভয় তৈরি করে। ভোটাররা যদি মনে করেন এলাকায় অস্ত্র আছে, কিন্তু তা উদ্ধারে রাষ্ট্র সক্রিয় নয়, তাহলে তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে ভোটের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগ পাচ্ছে না—এমন অভিযোগ তুলতে পারে।

সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরকারের মনোযোগের ঘাটতি সরাসরি ও পরোক্ষ—দুইভাবেই ভোটের পরিবেশ অস্থির করতে প্রভাব ফেলতে পারে। এই অস্ত্র হয়তো প্রতিটি কেন্দ্রে ব্যবহার হবে না, কিন্তু কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হলেই তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে শুধু ভোটের দিন নিরাপত্তা জোরদার করলেই হবে না; তার আগেই অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ অভিযান চালানো জরুরি। নইলে এই অস্ত্রগুলো নীরবে অপেক্ষা করবে, আর উপযুক্ত মুহূর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অস্থির করার শক্তি হিসেবে সামনে আসবে।
