তিস্তা অববাহিকার ধুলোবালি আর চিরচেনা কান্নার আড়ালে লুকিয়ে থাকে যে শব্দমালা, তাকেই এক সুতোয় বাঁধতে চলেছে ‘ফিরেদেখা’। আগামী ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবারের সকালটি রংপুরের মহীপুর ঘাটে কেবল সূর্যের আলো নিয়ে আসবে না, নিয়ে আসবে কবিতার তরণী। উত্তরের জনপদে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চাকা আরও সচল করতে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা— ‘তিস্তাপারে কবিতা-লিটলম্যাগ আড্ডা’। যেখানে নদীর কলতানের সাথে মিশে যাবে কবির কণ্ঠস্বর আর ছোটকাগজের দ্রোহ। এই আয়োজনের নেপথ্য কারিগর ও ফিরেদেখার সাধারণ সম্পাদক কবি সাকিল মাসুদ এক গভীর আর্তি নিয়ে এই মিলনমেলার পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর মতে, উত্তরাঞ্চলে ছোটকাগজ বা লিটলম্যাগ চর্চা এখনো যোজন যোজন দূরে পড়ে আছে। যে তিস্তা এই অঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ, সেই নদীর পাড়ের মানুষের জীবন-সংগ্রাম, তাদের আনন্দ-বেদনা আমাদের সাহিত্য, নাটক কিংবা সেলুলয়েডের ফিতায় এখনো উপেক্ষিত। সাকিল মাসুদের এই স্বপ্নের সাথে একাত্ম হয়েছেন কবি তাপস মাহমুদ, যাঁর সভাপতিত্বে দিনভর চলবে শব্দের আরাধনা।

কুয়াশাভেজা সকাল ৯টায় মহীপুর ঘাটের মুক্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের সূচনা করবেন কবি ও প্রাবন্ধিক আব্দুর রাজ্জাক, যাঁর প্রশাসনিক পরিচয়ের আড়ালে বাস করে এক সংবেদনশীল সাহিত্যিক মন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই আয়োজনে প্রাণের সঞ্চার করবেন বাংলাদেশ বেতারের রিজিওনাল ডাইরেক্টর জনাব আব্দুর রহিম। উৎসবের শুরুতেই ‘বাংলাদেশে ছোটকাগজ চর্চা ও উত্তরাঞ্চলের অবদান’ নিয়ে নিজের গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবেন কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব। এই পর্বের আলাপচারিতায় উঠে আসবে কীভাবে লিটলম্যাগ একটি অঞ্চলের চিন্তার মানচিত্র বদলে দিতে পারে। শুভেচ্ছা বক্তব্যে কবি ও ফিরেদেখার আহ্বায়ক কাইয়ুম খান এই আয়োজনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করবেন, আর স্বাগত বক্তব্যে সাকিল মাসুদ তুলে ধরবেন আগামী দিনের স্বপ্ন।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে তিস্তার পাড় মুখরিত হবে স্বরচিত কবিতার ছন্দে। সকাল ১১টায় কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠের আসরে বিভিন্ন প্রজন্মের কবিরা তাঁদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর প্রেমের পঙ্ক্তিমালা পাঠ করবেন। রোদের তেজ বাড়লে দুপুর ১২টায় শুরু হবে এক অন্যরকম সংলাপ— ‘তিস্তাপারের মানুষ ও জীবন’। এই পর্বে প্রধান আলোচক হিসেবে তিস্তা নদীকেন্দ্রিক জীবনদর্শন ও সংস্কৃতির বয়ান তুলে ধরবেন বিশিষ্ট কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক রানা মাসুদ। তাঁর সাথে আলোচনায় যোগ দেবেন গবেষক ও সাংবাদিক ড. অখিল পোদ্দার এবং কবি ও শিক্ষক মারুফ হোসেন মাহবুব। তাঁদের আলোচনায় ফুটে উঠবে কীভাবে নদী ভাঙনের হাহাকার আর চরের মানুষের টিকে থাকার লড়াই আগামীর সাহিত্যের মূল উপজীব্য হয়ে উঠতে পারে।

মহীপুর ঘাটের এই বালুচরে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল শেকড়ের টান। সেই টানেই প্রথিতযশা সম্পাদক আর কবিরা একত্রিত হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায়। বিকেলে ৩টা ৩০ মিনিটে যখন সমাপনী ঘণ্টা বাজবে, তখন হয়তো মহীপুর ঘাটে সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ফিরেদেখার এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিস্তাপারে যে সাহিত্যের বীজ বোনা হলো, তা আগামী দিনে এক বিশাল মহীরুহ হয়ে উত্তরাঞ্চলের সাহিত্যচর্চাকে বিশ্বদরবারে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে—এমনই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।
